November 13, 2018

কত পিটার বাংলাদেশে? যা করছেন তারা এই দেশে?

এটিএম কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকদের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার দুষ্কর্মে গ্রেপ্তার পোল্যান্ডের নাগরিক পিটারের মতো আরো কতজন আছে এ দেশে? আমরা জানি না। আমাদের জানানোও হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কোনো মন্ত্রণালয় বা সরকারের কোনো বিভাগ আজ পর্যন্ত এ হিসাব দেয়নি। যদিও এ হিসাব থাকার কথা সুনির্দিষ্ট কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের।

বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে আসার ভিসা দেয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা দেশে কোথায়, কত দিন থাকছে, যাচ্ছে, কী করছে এসব দেখার এখতিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। বাংলাদেশে তাদের ওয়ার্ক পারমিট নিতে হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বিনিয়োগ বোর্ড থেকে। আর কর্মক্ষেত্রে তাদের সুযোগ-সুবিধা দেখার যথাযথ কর্তৃপক্ষ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। আর এ দেশে কাজ করে উপার্জিত অর্থ থেকে আয়কর আদায় করে রাখার দায়িত্ব অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবি আর)। অথচ বাংলাদেশে কতজন বিদেশি বা প্রবাসী রয়েছে, সে তথ্য জানাচ্ছে না এসব মন্ত্রণালয় কিংবা বোর্ডের কেউই। পোল্যান্ডের নাগরিক থমাস পিটার তেমনই সংখ্যা না-জানাদেরই একজন। এটিএম বুথ থেকে তার টাকা চুরি ধরা না পড়লে এটি আলোচনার বিষয়ই হতো না।
একদিকে আমাদের গরিব বলে তাচ্ছিল্য, অন্যদিকে আরাম-আয়েশ, কামাই-রোজগারের জন্য বহু ভিনদেশি প্রবাস কাটায় এই গরিব দেশেই। বাংলাদেশে আসতে, থাকতে কোনো ঝামেলা হয় না তাদের। বিশ্বের আর কোনো দেশে তাদের এত যতœআত্তি নেই। পদে পদে পরম শান্তিতেই থাকে সব বিদেশি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি প্রবাসীদের যে হাড়ভাঙা শ্রমে অর্থকড়ি কামাতে হয়, এ দেশে বিদেশিদের এর ছিটেফোঁটাও করতে হয় না। এ সুযোগে বিভিন্ন দেশ থেকে নিয়মিত এবং অনায়াসে অনেকেই আসছে এ দেশে; থাকছে বছরের পর বছর। বাংলাদেশে কম্পোজিট টেক্সটাইল, ওভেন ও নিটওয়্যার, সোয়েটার, বায়িং হাউস, মার্চেন্ডাইজিংসহ গার্মেন্ট সেক্টরে কাজ করছে বিদেশিরা।

এ ছাড়া বহুজাতিক কোম্পানি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল পাওয়ার স্টেশন, আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, ফ্যাশন হাউস, মোবাইল ফোন কোম্পানি, বিজ্ঞাপনী কিছু প্রতিষ্ঠানেও সম্পৃক্ত বহু বিদেশি। সংখ্যায় এদের বেশির ভাগই ভারতীয়। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ইউরোপ-আমেরিকানও কম নয়। একই কাজে তাদের বেতন-ভাতা বাংলাদেশের কর্মীদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।

বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে বিদেশি সংখ্যা নিয়ে তথ্য থাকলেও তাঁরা তা দেন না। যদিও তাঁদের কারো কারো কাছে বিদেশি কর্মী, কর্মকর্তা রাখা ফ্যাশন বা স্ট্যাটাস। কখনো কখনো বায়ারদের তুষ্ট রাখতেও বিদেশিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিতে হয়। আবার অনেক সময় উপযুক্ত দেশি নাগরিক না পাওয়ায় কারখানার মালিকরা বিদেশি নিয়োগ দিতে বাধ্য হন। কিন্তু তালিকা বা সংখ্যা দিতে চান না তাঁরা। বিনিয়োগ বোর্ডের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করা বিদেশির সংখ্যা ১২ হাজারের বেশি হবে না। কিন্তু অবৈধভাবে রয়েছে ১০ লাখের মতো বিদেশি। এদের অনেকেই একবার অনুমতি নিয়ে আর নবায়ন করেনি। অভিযোগ রয়েছে, তালিকাভুক্তরাও ঠিকমতো আয়কর দেয় না। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে কেউ কেউ নামকাওয়াস্তে একটি আয়কর রিটার্ন দাখিল করে মাত্র। বাকিরা কর দেওয়ার ধারে কাছেও নেই।
আবার কেউ কেউ বেড়ানোর নাম করে এসে কাজে লেগে গেছেন। আবার অনেক ভারতীয় নাগরিক আছে, যারা এ দেশে আসার আগে ভিসাই নেয়নি। আবার কেউ কেউ বেড়াতে আসার নাম করে যে কাজে লেগেছে আর ভিসা নবায়নের নামগন্ধও নেই। বাংলাদেশে অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশিদের ওপর নজরদারি না থাকায় তাদের কেউ কেউ বেপরোয়া হয়ে উঠছে, জড়িয়ে পড়ছে ভয়ংকর অপরাধে। মাঝে মধ্যে কোনো অঘটনে পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও জামিনে বেরিয়ে যায় সহজেই। চাকরি ও ব্যবসার কাগজপত্র নিয়ে বৈধভাবে বাংলাদেশে আসার পর পিটারের মতো কোনো কোনো বিদেশি বেছে নিয়েছে অনৈতিক নানা কাজ।

পুলিশের কাছে নাইজেরিয়া, ঘানা, কঙ্গো, ফিলিপাইন, উগান্ডা, শ্রীলঙ্কার বেশ কিছু প্রবাসীর বিরুদ্ধে প্রচুর অভিযোগ রয়েছে। তাদের কেউ কেউ উত্তরা, গুলশান, বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় অফিস খুলে উন্নত দেশে চাকরি, লেখাপড়ায় ভিসা দেওয়ার পাশাপাশি নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভনে মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বিভিন্ন দেশের মুদ্রা জালিয়াতিসহ ভয়ংকর অপরাধেও এদের কেউ কেউ জড়িত। দেশের কিছু অসাধু ব্যক্তি এসব বিদেশি নাগরিককে ব্যবহার করে প্রতারণার ফাঁদ পাতে। তরুণ-তরুণীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে টাকা-পয়সা হাতিয়ে চম্পট দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও পুলিশ অঘোষিতভাবে বিদেশিদের ঘাঁটাতে যায় না। এর পরও বড় রকমের ঘটনায় মাঝে মধ্যে পিটারের মতো দু-একজন ধরা পড়ে। আবার ছাড়াও পেয়ে যায় দ্রুত। একে সুযোগ হিসেবেই নিচ্ছে ধূর্ত মানসিকতার বিদেশিরা। এর পরও ঘটনা-দুর্ঘটনাচক্রে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে প্রবাসীদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু কখনোই তার কোনোটি আলোর মুখ দেখে না। পিটারের ঘটনায় সম্প্রতি আবারো এ নিয়ে তোড়জোর চলছে। শেষ পর্যন্ত এবারও আমরা সেই সংখ্যা জানতে পারব কি না, জানা নেই।

Related posts