November 21, 2018

কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে এরা কারা?

392

অজিত কুমার দাশ
কক্সবাজার থেকেঃ
অপরিচিত ও সন্দেহভাজন লোকদের আনা গোনা। বিভিন্ন হত্যা মামলার আসামীদের নিয়ে দহরম মহরম। সরকারী ছুটির দিনে গোপন বৈঠক করে সরকার বিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা এবং হিযবুত তাহেরী সহ নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কয়েকজন শীর্ষনেতা কর্মরত থাকায় জঙ্গিদের ঘাটিতে পরিনত হয়েছে কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (সিবিআইইউ)। এমনই তথ্য বেরিয়ে এসেছে সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনের তথ্য মতে, চট্টগ্রাম বিভাগে জঙ্গী তৎপরতা ও সরকার বিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা হয় বেসরকারি ওই ইউনিভার্সিটি থেকে। হিযবুত তাহেরী ও আর্ন্তজাতিক জঙ্গি সংগঠনের কয়েকজন শীর্ষনেতা কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত রয়েছেন। এদের মদদ ও পৃষ্ঠপোষকতায় ইউনিভার্সিটিতেই সপ্তাহে দুদিন গোপন বৈঠক চলে। যেখান থেকে সরকারি বিরোধী নানা কর্মকান্ড পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়।

কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডে সেক্রেটারি হিসেবে রয়েছেন চট্টগ্রাম কলেজের সাবেক শিবির ক্যাডার লায়ন মুজিব।

এক সময়ের চট্টগ্রাম মহানগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি বদিউল আলম বর্তমানে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী স্টাডি ও দাওরা বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ তিনি এখনো ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক। এছাড়া তার বিরুদ্ধে রয়েছে ৪টি হত্যা মামলা সহ ২৪ টি মামলা। তাছাড়া তার সাথে আর্ন্তজাতিক জঙ্গি সংগঠনের যোগযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই নেতা এখন তার বিভাগে প্রতিসপ্তাহে শুক্র ও শনিবার গোপন বৈঠক করেন। তাকে আটক করতে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ কয়েকদফা অভিযানও পরিচালনা করেছেন।

এরপরও ওই জঙ্গি নেতার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেননি ইউনিভার্সিটি পরিচালনা পরিষদ। এছাড়া ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন নাশকতা মামলার আসামী জেলা শিবিরের সাবেক সভাপতি দরবেশ আলী মো. আরমান।

তাকে ২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে পুলিশের গাড়িতে হামলা করে পালিয়ে যাওয়ার সময় আটক করে পুলিশ। জামিনে বের হবার পর থেকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে তার কোন পদবী না থাকলেও তিনি শিক্ষার্থী সংগ্রহের জন্য কাজ করেন। বিশেষ করে ইসলামী ষ্টাড়ি বিভাগের শিক্ষার্থী যোগাড় করাই তার কাজ।

গেলো বছর ৯ মে রাত সাড়ে ৯ টায় চট্টগ্রামের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার ১৩ নং রোডে বি ব্লকের ৩১২ নম্বর বাড়ি থেকে কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাবেক প্রভাষক শরফুল আউয়ালকে জঙ্গি বই সহ আটক করে পুলিশ। তিনি নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গী সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সংগঠক । তিনি এখনো কারাগারে রয়েছেন।

এদিকে ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থী নাম না প্রকাশ করার শর্তে জানান, শুক্রবার ও শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ডিপার্টমেন্ট বন্ধ থাকে। কিন্তু সেদিন ইসলামী স্টাডি ও দাওয়া বিভাগ খোলা থাকে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি গ্রুপ বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের ৩য় তলায় গোপন বৈঠক করেন। ওখান থেকে সরকার বিরোধী নানা ধরনের ষড়যন্ত্র হয়।

কক্সবাজার সদর থানার ওসি (তদন্ত) বখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী জানান, ইউনিভার্সিটির কয়েকজন শিক্ষক , কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা সহ সরকার বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এ কারনে কয়েকদফা পুলিশ ওই ইউনিভার্সিটিতে অভিযান পরিচালনা করেছেন। তিনি আরো জানান, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

তবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করে কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সেক্রেটারি লায়ন মুজিব জানান, একটি মহল ইউনিভার্সিটির অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে এহেন দুর্নাম রটাচ্ছে।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন আহমেদ সিআইপি।

কক্সবাজার জুড়ে চলছে মালিক-ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ

কক্সবাজার জেলা জুড়ে শুরু হয়েছে পুলিশ প্রশাসনের বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ অভিযান। দীর্ঘদিন পর হলেও জেলায় বসবাসরত মালিক ও ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহের নির্দেশনা প্রদান করায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে সাধুবাদ জানিয়েছেন জেলার সচেতন মহল। দেশে সহিংসতা, জঙ্গী তৎপরতা, বোমা হামলা, পুরোহিত ও বৌদ্ধ ভিক্ষু হত্যা সহ বিদেশী হত্যায় শংকিত হয়ে উঠে দেশবাসী। পাশাপাশি এর প্রভাব পড়ে কক্সবাজার জেলায়ও। শংকিত হয়ে উঠে জেলাবাসী।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ স্বাক্ষরিত প্রেরিত তথ্যে জানা গেছে, জেলার বাড়ির মালিক তাহাদের বাসা/বাড়ি ভাড়াটিয়াদের নিকট ভাড়া দিয়েছেন উক্ত বাড়ির মালিক এবং ভাড়াটিয়াদের সম্পর্কে তথ্য যথা নাম, ঠিকানা, ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র/জন্ম সনদ, মোবাইল নম্বর, পাসপোর্ট নং ইত্যাদি থানা কর্তৃক সরবরাহকৃত নির্ধারিত “ছক” মোতাবেক পূরণ করে আগামী ২৭ জুলাই এর মধ্যে থানায় জমা দেয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেন। উক্ত সময়ের মধ্যে তথ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হইলে বাড়ির মালিকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয়।

তবে সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিক, ভাড়াটিয়া ও জেলার সচেতন মহল দাবি করেন, প্রকৃতপক্ষে জেলায় বসবাসরত ভাড়াটিয়াদের সঠিক তথ্য নেই বললেই চলে। বসবাসকারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ভাড়াটিয়াদের নিজ নিজ সম্পূর্ণ তথ্য তদারকির প্রয়োজন হলেও প্রকৃতপক্ষে তা নাথাকায় চরম নিরাপত্তাহীনতা বোধ করেন অনেকে। যার কারণে সুযোগ সন্ধানী ভাড়াটিয়ারা বাসা, মেস কিংবা ব্যাচেলর রুম নিয়ে বিভিন্ন অপরাধ কর্মকান্ড চালানোর আশংকা করা হয়। সংশ্লিষ্ট থানা কর্তৃক বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের তথ্য প্রদান কার্যক্রম জেলাবাসীকে নিরাপত্তাহীনতার হাত থেকে কিছুটা হলেও প্রশমিত করবে।

মালিকপক্ষের অনেকে জানিয়েছেন, সম্প্রতি জঙ্গী তৎপরতা নিয়ে বাড়ির মালিকরা চিন্তিত। দেশের বিভিন্ন জায়গায় হামলাকারীরা ব্যাচেলর বাসা ভাড়া নিয়ে জঙ্গী তৎপরতা ও হামলার পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। বিভিন্ন অপরাধ কার্যক্রমের পরে অনেক হামলাকারী ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। মালিকী বাসা, হোটেল-মোটেলের রুম, মেস কিংবা ব্যাচেলর বাসা ভাড়া নেয়ার সময় ভাড়াটিয়াদের প্রত্যেকের ছবি, আই.ডি কার্ড, জন্ম নিবন্ধন কপি, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সঠিক তথ্য, প্রবাসীদের পরিবারকে ভাড়া দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট তথ্য ও প্রবাসীদের পাসপোর্ট কপি সহ পরিপূর্ণ তথ্য মালিক কিংবা সংশ্লিষ্ট আইন-শৃংখলা বাহিনীর কাছে জমা দিয়ে ভাড়া প্রদান করা জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আইন-শৃংখলা বাহিনীর এব্যাপারে নির্দেশনার বিষয়টি অনেক মালিকের অজানা। বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রচার-প্রচারণা যথাযথ চালালে ভালো হতো।

ভাড়াটিয়াদের মতে, দেশের সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে ভাড়াটিয়ারাও খুবই উদ্বিগ্ন। প্রকৃতপক্ষে কার বাড়িতে কে থাকছে, কে কি করছে তার কোন তথ্য নেই সংশ্লিষ্ট দফ্তরের। অনেক সময় দেখা যায়, অনেক মালিকই তাদের ভাড়াটিয়াদের চিনেন না। কোন কোন মালিকই তারা নিজেরাই বাসায় থাকেন না। ভাড়াটিয়াদের ভাড়া পরিশোধ করতে বলা হয় নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে। এক্ষেত্রে অনেক সুযোগ সন্ধানী ভাড়াটিয়া সাময়িকের জন্য বাসা বা মেস কিংবা হোটেল-মোটেলের ফ্ল্যাট রুম নিয়ে অপকর্ম চালানোর আশংকা থাকে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রত্যেক ভাড়াটিয়াদের ডাটা সংরক্ষণ করা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞ আইনজীবীদের মতে, মালিকী বাসা, হোটেল-মোটেলের ফ্ল্যাট রুম, মেস কিংবা ব্যাচেলর বাসা ভাড়া নিয়ে কোন ভাড়াটিয়া অপরাধ কার্য সংঘটিত করলে ফৌজদারি দন্ডবিধি মতে বাড়ি, হোটেল-মোটেল, মেস’র মালিককে সহযোগী হিসেবে আসামী করার আইন রয়েছে। এতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় উল্লেখিত মতে মালিক পক্ষকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হতে পারে এবং অর্থদন্ডেও জরিমানা করার বিধান রয়েছে।

শহরে অবস্থানরত ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহে কক্সবাজার পৌরসভার কোন ধরণের উদ্যোগ কিংবা দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে কিনা জানতে চাইলে কক্সবাজার পৌরসভার সচিব মোঃ সামছুদ্দিন জানান, এধরণের কোন উদ্যোগ পৌরসভার নাই। এব্যাপারে কক্সবাজার পৌরসভাকে কোন ধরণের দায়িত্ব দেয়া হয়নি।

জানতে চাইলে কক্সবাজার সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আসলাম হোসেন জানান, ‘ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহে প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ভাড়াটিয়াদের তথ্য অন্তর্ভূক্তকরণের নির্দিষ্ট ফরমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাড়ির মালিকদের তাহাদের ভাড়াটিয়াদের সম্পর্কে তথ্য “ছক” মোতাবেক পূরণ করে আগামী ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে থানায় জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মালিক ও ভাড়াটিয়ারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফরম জমা না দিলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts