November 17, 2018

ঐশীর মায়ের একটি অলৌকিক চিঠি!

সাবিনা শারমিন

‘আমি ঐশীর মা বলছি। হ্যাঁ আমি আমার গর্ভজাত কন্যা ঐশীর হাতে হত্যাচেষ্টার সময় কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে যাওয়া একজন ব্যর্থ এবং অপারগ মা। অনেক কষ্ট, ক্ষোভ, বঞ্চনা, যন্ত্রণা, ক্ষত-বিক্ষত শরীর আর মন নিয়ে আমি আজ আমার মেয়ের জীবন ভিক্ষা চাইবার জন্যেই বেঁচে আছি। আজ আপনাদের কাছে আমার হৃদয় উজাড় করে সমস্ত অপারগতার কথা স্বীকার করে চিৎকার করে অনেক কাঁদতে ইচ্ছে করছে। যেন আমাকে দেখে পৃথিবীর সকল মা তাদের সন্তানদের হৃদয়ের গভীর ক্ষত বোঝার চেষ্টা করেন।

দেশবাসীর কাছে আমার একটি অনুরোধ যেন আমার সন্তানের মতো মাদকাসক্ত সন্তান বাংলাদেশে আর কারো ঘরে তৈরি না হয়। প্রতিটি বাবা মা যেন তাঁর সন্তানের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে সন্তানের গোপন ব্যথাটি জেনে নিতে পারে। কোনো মায়ের বুক ছিন্নভিন্ন করে, রক্তাক্ত করে কোনো ঐশী যেন আর ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত না হয়। দেশবাসীর কাছেও অনুরোধ যেন কোনো অসাধু মাদক ব্যবসায়ী ডিলার আমাদের কোমলমতি শিশুদের হাতে মাদক তুলে দিতে না পারে। আপনারা যদি ভেবে থাকেন ওর মতো সন্তান শুধু আমার একারই তবে মস্ত বড় এক ভুল হবে। যে ভুলের মাসুল গুণতে একটি সুখী পরিবার মুহূর্তের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

একটিবার ভেবে দেখেছেন কি আমি এবং আপনারা যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি, ন্যায়বিচার আশা করি, আইনের স্বচ্ছতা চাই, তাদের পরিবারেও তৈরি হতে পারে এমন একজন ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত ঐশী ? কক্ষনো কল্পনায়ও ভেবে উঠতে পারিনি, বুঝতে পারিনি যে সন্তানের মনের গহীনে বিশাল এক গোপন বেদনা বাসা বেঁধেছে। জানার চেষ্টাও করিনি কখনো। আজ ন্যায়বিচারের জন্য আপনারা যারা আস্ফালন করে বিচার চাচ্ছেন তাদের পরিবারেও দু’একজন মাদকাসক্ত কিশোর কিশোরী খুঁজে পাওয়া একবারেই অস্বাভাবিক নয়। নিজের পরিবারে খুঁজে না পেলেও প্রতিবেশির উঠতি বয়সী মেধাবী কিশোর ছেলেটিকে একটু খেয়াল করে দেখুন না কেন তার বাবা মায়ের সাথে প্রতিদিন চিৎকার চেঁচামেচি করে ঘরের আসবাবপত্র ভাংচুর করছে? কেন এরা ক্ষণে ক্ষণে টাকার জন্য বায়না ধরে?

এদের এই পরিণতির জন্য আমাদের, আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশিদের কি কোনোই দায়-দায়িত্ব নেই? আমাদের আদরের ধনকে দূরে সরিয়ে রেখে আমাদের সকলের দায়িত্ব হীনতার দায় তাদের কাঁধে নিয়ে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলে রক্তাক্ত হবে আমাদের অতি আদরের বুকের ধন? আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা, ঐশীতো ইয়াবা উৎপাদনকারী বা সরবরাহকারী নয়, সে ইয়াবার ভিক্টিম। তবে একথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, সন্তানের মানসিক বিকাশের জন্য, নৈতিকতা এবং পারিবারিক মূল্যবোধ গঠনের জন্য যতটুকু কোয়ালিটি টাইম তাকে দেয়া উচিৎ ছিল তা আমি আমার সন্তানকে দিতে ব্যর্থ হয়েছি।

আসলে আমি এবং আপনি আমাদের সন্তানদের পেছনে কতোটুকু সময় ব্যয় করি? দয়া করে একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন আপনাদের চারপাশেও এরকম হাজারো ঐশী আছে, যারা অনেক কিছু থেকেও শুধু স্নেহ আর মনোযোগের অভাবে চরম হতাশাগ্রস্ত, অবহেলিত এবং নিগৃহীত কিনা? খুব দ্রুত অর্থ বৈভবের মালিক হবার জন্যে আমার এবং আপনার পরিচিত মাদক ব্যবসায়ীদেরকে সনাক্ত করার পরেও শুধু ঝামেলা এড়ানোর জন্য ইচ্ছে করেই আমরা আইনের হাতে কেন সোপর্দ করছি না? আপনাদের সবার কাছে আমার শেষ আকুল আবেদন, আমার ভুলপথে হাঁটা মেয়েকে আপনারা সংশোধিত হবার শেষ সুযোগ করে দিয়ে ছোট শিশু ভাইটির কাছে ফিরিয়ে দিন। তার ভাইটি তার বোনের প্রতীক্ষায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে বসে আছে। এই কঠিন পৃথিবীতে বোন ছাড়া তার আর কেউ নেই’-

খুব স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন এসে যায় যে, এ আবার কোন পাগলের প্রলাপ? ঐশীর মা আবার কোথা হতে আসলো? আর এই আহাজারি আর আর্তনাদ কি একজন ব্যর্থ মায়ের মুখে মানাচ্ছে? আসলে এই আর্তনাদ একান্তই আমার নিজের। ঐশীর মায়ের স্থানে নিজেকে বসিয়ে এ আমার একান্তই কল্পনাপ্রসূত মুখনিঃসৃত স্বগতোক্তি।

হ্যাঁ এই মুহূর্তে আমার শুধু এটিই মনে হচ্ছে যে এই দুরাবস্থা আমারও হতে পারতো। হতে পারতো আরও অনেকেরই। আর ঠিক এমনটিও ঘটেও যেতে পারতো যে ঐশীর মা কোনো না কোনোভাবে মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে গেছেন। আর তাই যদি হতো, তাহলে ঐশীর কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে তিনি কি কন্যার জীবন ভিক্ষা চাইতেন না? সন্তান লালন করার অপারগতার কথা স্বীকার করে তিনি কি সরকারের কাছে, রাষ্ট্রপতির কাছে ঐশীর প্রাণভিক্ষা চাইতেন না? সংশোধনাগারে পাঠাতে চাইতেন না? নাকি স্বামী হত্যার জন্যে নিজ কন্যার ফাঁসির দাবি করতেন? এর উত্তর হচ্ছে ‘চাইতেন।’ অবশ্যই তিনি ঐশীর জন্য প্রাণভিক্ষা চাইতেন। আর এটিই স্বাভাবিক। কারণ এর দায় তার নিজের যেমন তেমনি পরিবেশ, সমাজ, সংসার এবং সর্বোপরি আমাদের সবার।

ধরা যাক ঘটনার দিন ঐশীর বয়স পূর্ণ বয়স্ক হতে মাত্র চারদিন বাকী ছিল, তাহলে শুধু ঐ চারদিনের জন্যে তার গুরু দণ্ড কি বিশেষ বিবেচনায় কি লঘু হতো না? আর একজন মানুষ শারীরিকভাবে পূর্ণ বয়স্ক হলেই কি একই সাথে মানসিকভাবেও সে পূর্ণবয়স্ক হয়? তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ব্যক্তির সুচিকিৎসা না হলেও মানসিক ভারসাম্যহীনতা, সিজোফ্রেনিয়া এবং বাইপোলার ডিজঅর্ডার দেখা দিতে পারে। যার জন্য দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন।

পৃথিবীতে বাবা মায়ের চাইতে আপন আর কি কেউ হতে পারে? সেই বাবা মাকেই যখন কেউ নিজ হাতে পরিকল্পিতভাবে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে, তখন খুব স্বাভাবিক ভাবেই তার মানসিক সুস্থতার বিষয়টির ব্যাপারে সকলের করুণা আর মানবিক বোধের জন্ম দেয়। আর সে যদি হয় কোমলমতি কোনো শিশু-কিশোর তবে আমাদের সমস্ত যুক্তি বুদ্ধি আর শিক্ষা পরাজিত হয়ে করুণা, ভালোবাসা আর মাতৃত্বই যেন জেগে ওঠে। অপরাধের কঠিন দায় নিজের কাঁধে তুলে তখন কোনো দ্বিধাই আর প্রশ্রয় পায় না। কারণ আমরা মানুষ। মানুষ হয়ে মানবিক গুণাবলীই আমাদের অমূল্য সম্পদ।

আজ ঐশীর মা বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে সন্দেহাতীতভাবেই তিনি তার সন্তানের হয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ ভিক্ষার আবেদন জানাতেন। আর তাই বাংলাদেশের সকল বাবা মায়ের পক্ষ থেকে আমি সম্পূর্ণ সজ্ঞানে, আত্মবিশ্বাসের সাথে, আইনের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল হয়ে কিশোরী ঐশীর স্পর্শকাতর বয়সটি বিবেচনায় এনে তাকে সংশোধনের জন্য বাংলাদেশের মাননীয় বিচারপতি, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে ঐশীর প্রাণ ভিক্ষা চাইছি। তার শাস্তি লঘু করার আবেদন জানাচ্ছি।

জানি আইন স্বাভাবিক ভাবেই তার নিজস্ব গতিতেই চলবে, যেখানে ধনী দরিদ্র সকলেই সমান এবং যেখানে কোনো আবেগেরও একেবারেই প্রশ্রয় নেই। অপরাধী সে যেই হোক, আর অপরাধ লঘু হোক আর গুরুই হোক, অপরাধের যথোপযুক্ত শাস্তিতো অপরাধীকে পেতেই হয়, অন্যথায় সমাজে কখনোই আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না, হতে পারে না। আর হত্যার শাস্তি অবশ্যই অত্যন্ত গুরুতর ।

খুব মনে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে লেখাপড়া করতে যাওয়া নাফিস নামের মাত্র একুশ বছর বয়সের ছেলেটির পরিবারের কথা, তার বাবার মৃত্যুর মুখে ঢলে পরার কথা, ছেলেটির জঙ্গি হয়ে ওঠার কথা। নাফিসের বাবা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি তার সন্তান কখন এবং কিভাবে জঙ্গি হয়ে উঠেছে। তিনি স্বপ্নেও ভেবে উঠতে পারেননি যে অতি সন্তর্পণে, চোখের আড়ালে তার সন্তান হয়ে উঠছে একজন জঙ্গি। তবে প্রথমে তার বাবা আশা করেছিলো যে তার ছেলে একেবারেই নির্দোষ এবং সে কারণেই অবশ্যই সে ন্যায়বিচার পাবে। কিন্তু সবকিছু ভুল প্রমাণিত হয়ে ত্রিশ বছরের শাস্তি হলো নাফিসের। তার বাবা খুব সম্ভবত কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করতেন। সন্তানের জঙ্গি হয়ে ওঠার কারণে কর্মস্থল তাকে অগ্রিম অবসর প্রদান করলো।

সে সময় নিয়মিত ছেলেটির পরিবারের বিষয়গুলো খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তাম। তার বাবাও খুব আত্মবিশ্বাসের সাথেই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েও সাক্ষাৎকারও দিতেন, কারণ তার বিশ্বাস ছিল তার সন্তান নিরপরাধ। কিন্তু সবকিছু ভুল প্রমাণিত করলো নাফিস নিজেই। উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতীয়মান হল যে নাফিস দোষী। জঙ্গি হওয়ার দায় স্বীকার করলো সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের নিষ্পাপ চেহারার সেই ছেলেটি। কিছুদিন পর জানতে পারলাম নাফিসের বাবা এই ঘটনা মেনে নিতে না পেরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন ।

আমরা বিশ্বাস করি রাষ্ট্র পরিবার থেকে অনেক বৃহৎ এবং ন্যায়পরায়ণ। আর তারই নজির দেখেছি আমরা শিশু রাজন আর রাকিবের দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। তবে এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে রাকিব এবং রাজনের এই বিচারিক প্রক্রিয়া অবশ্যই ত্বরান্বিত করেছে বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক। বাংলাদেশের এমন কোনো মানুষ নেই যে রাজন আর রাকিবের জন্য অশ্রুসিক্ত হননি। আমাদের সবার প্রিয় আবৃত্তি শিল্পী শিমুল মুস্তাফা তার ফেসবুকে ঘোষণা দিলেন রাজনের হত্যাকারীর শাস্তি না হলে তিনি আর কবিতা পড়বেন না। আর তাই দেখা যাচ্ছে সচেতন নাগরিক কোনো শিশুর ওপর অন্যায় কোনোভাবেই যেন মেনে নিতে পারে না।

তবে এখানে রাজন, রাকিব আর ঐশীর বিষয়টি একদিকে যেমন বিপরীত, আবার মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঐশী তার পিতামাতা হত্যাকারী হলেও তার স্পর্শকাতর বয়স এবং মাদকাসক্ত জীবন খুব সহজেই আমাদের মতো সাধারণ মানুষের হৃদয় বিদীর্ণ করে আবেগাপ্লুতো করে । সেইসাথে আমরা এটিও বলতে পারি যে তার বাবা মা তার হাতে ভিক্টিম এবং ঐশী ভিক্টিম সহজলভ্য মাদকের কাছে। অপরদিকে রাজন রাকিবের হত্যাকারীরা ভিক্টিম বা প্ররোচিত নয়। তারা সম্পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক এবং সুস্থ।

আর অন্যদিকে ঐশীর প্রয়াত বাবা মায়ের হত্যাকারী সে নিজে এবং ভিক্টিম হচ্ছে তার পিতামাতা। আর তাইতো ঐশী হত্যাকারী হলেও আমাদের হৃদয় হাহাকার করে ঐশীর মাঝে নিজ সন্তানের প্রতিচ্ছবি দেখে। যে হৃদয় ‘মাদকাসক্তি’ সুস্থতা এবং প্রাপ্তবয়স্ক হলে কখনোই হয়তো কাঁদতো না। আর তাই এই সকল বিষয়গুলি বিবেচনা করে তার গুরুদণ্ড লঘু করে আজীবন কারাদণ্ড দিয়ে যদি জেলখানার ভেতরে লেখাপড়া করিয়ে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে এর চাইতে বড় অর্জন আর কী হতে পারে?

বাংলাদেশের সকল বাবা মায়ের চেতনা ফিরে পাবার জন্য ‘ইয়াবা ঐশী’যেন সজোরে একটি ঝাঁকুনি। সেইসাথে এটিও মনে করছি যে প্রতিটি বাবা মায়ের এখন সচেতন হবার সময় চলে এসেছে। আর এই ঐশীর `ইয়াবা ঐশী` হয়ে ওঠার দায় কি শুধু একা ঐশীর পরিবারের? ঐশীর নামের সাথে ইয়াবা টাইটেল হিসেবে যুক্ত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই ইয়াবার সরবরাহ ঐশী কোথায় পেলো? কারা এই ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত? আমাদের সমাজ কি বাবা মায়ের একমাত্র আদরের কন্যা সন্তান ঐশীকে ‘ইয়াবা ঐশী’ হতে প্ররোচিত করেনি?

এটিও কি নিশ্চিত করে বলা যায়, যে ভবিষ্যতে এরকম ঐশী আর তৈরি হবে না? এই ইয়াবার শেকড় কোথায়? গাছের গোড়া কেটে পাতায় পানি ঢেলে কয়েকজন ঐশীকে ফাঁসি দিলেই কি সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে? যদি প্রতিটি পরিবারের কোমলমতি শিশুরা তেরো চৌদ্দ বছর বয়স থেকেই হাতের নাগালের কাছে ইয়াবা পেয়ে যায়, আর তারা সেই মরণ নেশার কবল থেকে বের হয়ে আসতে তাদের ছয় সাত বছর লেগে যায়, তাহলে এরকম ঐশী প্রতিটি ঘরে ঘরেই তৈরি হবে এবং মাদক নিরাময় কেন্দ্রে অথবা কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানোর আগেই হয়তো অনেক পিতামাতাকেই জীবন দিতে হতে পারে মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে।

যারা চলে গেছেন তারাতো একেবারেই গেছেন, ঐশীকে ফাঁসি দিলেও তারা আর কোনো দিনই ফিরে আসবেন না। আর ঐশীর ফাঁসি হলে সবচাইতে ক্ষতি হবে কার? বাবা-মা হারা চাচা আর দাদীর কাছে লালিত-পালিত হওয়া একমাত্র শিশু ছোট ভাইটির। যে বাবা-মা আর একমাত্র বোন, সবই হারালো !

একটি বার খোঁজ নিয়ে দেখুন না আপনার সন্তান কাদের সাথে মিশছে, গাড়ী হাঁকিয়ে কোথায় যাচ্ছে, কী খাচ্ছে, তার সহপাঠী কারা? সহপাঠীর পিতামাতার উপার্জনের উৎস কি? আপনার পাশের বাড়ীর ছেলেটির বাবা-মা সন্তানকে একা রেখে কেন এতো রাত করে বাড়ি ফেরে? কেন ছেলেটির দিন রাত একাকী কাটে? কাজের বুয়ার কাছে সে কি শিখছে? বয়ঃসন্ধিকালের সমস্যাগুলো কি? এই প্রশ্নের উত্তরগুলো বাবা-মা হয়ে কখনো কি জানতে চেয়েছিলেন?

আজ আমরা সবাই মিলে ঐশীর গলায় ফাঁসির জন্য অপেক্ষা করবো, কিন্তু একটিবারের জন্যও ভাববো না যে ঐশী আমাদের সমাজ ব্যবস্থারই তৈরি প্রডাক্ট। এই খুনের দায় তার একার নয়। এই দায় আমাদের সকলের। আমাদের সকল পিতামাতার। ঐশী আমাদের অবহেলার ফসল। সমাজের অসাধু মাদক ব্যবসায়ীর দুর্নীতির পরিণতি। পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষা বঞ্চিত এক অবহেলিত কিশোরী।

চারদিকে একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখতে পাবেন যে বর্তমান সময়ের আলোচিত বর্বরোচিত ঘটনাগুলো যারা প্ররোচিত হয়ে ঘটাচ্ছে তাদের গড় বয়স কত? যারা খুনের মতো জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে তাদের বয়সই বা কতো? এই খুন আর হত্যার দায় কি শুধুই তাদের? পরিবেশ, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা, মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব,পাড়া প্রতিবেশী কারো কি কোনো দায়িত্বই নেই?

‘এডোলিসেন্স’ বয়সটি একজন মানুষের জীবনে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি সময়। এ সময়টি না শিশুতোষ না এডাল্টহুড। শরীর ও মনোজগতে এই বয়সটিতে কিশোর কিশোরীর অনেক পরিবর্তন ঘটে, যা সকল শিশুর ক্ষেত্রে একরকম নয়। উন্নত দেশে এ সময় বাচ্চাদের একা রাখা আইনত দণ্ডনীয়। কারণ এ সময় অনেকের মধ্যে ডিপ্রেশন এবং আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা দেয়। তাই এ সময়ে সন্তানের মনোজগতকে শক্ত হাতে হাল ধরে রাখতে না পারলে অনেক শিশুর জীবনেই অনেক ধরনের নেতিবাচক পরিণতি হতে পারে। আমরা বাবা-মায়েরা কোমল মনের বাচ্চাদের বয়ো:সন্ধিকালের পরিবর্তনের সময় কতজন পিতামাতা শক্তহাতে তাদের হাল ধরে তাদের মনের ক্ষতটি বোঝার চেষ্টা করি?

একটু খেয়াল করে দেখুনতো আপনার চারপাশে আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশিদের মধ্যে, এমনকি আপনার নিজের কিশোর কিশোরী সন্তানটি বন্ধুদের প্ররোচনায় মাদকের করাল গ্রাসে পা বাড়িয়েছে কিনা? আর ঐশীর জীবনের এই করুণ পরিণতির দণ্ড আমরা সবাই কি কাঁধে নিতে পারিনা? আমরা সবাই মিলে মহামান্য আদালতের কাছে তার বয়সের স্পর্শকাতর মনোবিকারের অবস্থানটি বিবেচনায় এনে তার শাস্তির দণ্ড লঘু করার আবেদন কি জানাতে পারিনা?

ঐশীকে সুস্থ করে তুলে যথাযোগ্য শিক্ষার মাধ্যমে একজন যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে আমরা সবাই তার এই শাস্তি মাথা পেতে নেবো- যা একটি দেশের সাফল্যে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত জ্বলজ্বল করবে। এমন চিন্তা কি নিতান্তই স্বপ্ন?

লেখকঃ আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স এর প্রশিক্ষক উইমেন চ্যাপ্টার

Related posts