September 22, 2018

ঐক্য পরিষদের গরু জবাই বন্ধ দাবির পোস্টমর্টেমঃপূর্ব কল্পিত না অন্য কিছু?

oikko_news

সুব্রত বিশ্বাস, নিউইয়র্ক থেকেঃ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ গঠিত হওয়ার পর থেকে এটি একটি সাম্প্রদায়িক সংগঠন বলে অনেকেরই ধারনা। ধারনাটি সত্য নয় ধরে নিলেও বিভিন্ন সময় ঐক্য পরিষদের কিছু ব্যক্তি এবং বিভিন্ন শাখার ধর্মাশ্রয়ী উগ্র বক্তব্য ও কার্যকলাপ সাম্প্রদায়িক বদনামের ধারনাকে বদ্ধমূল করতে সাহায্য করেছে। এ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা ও পরামর্শমূলক লেখা অনেকে এবং আমিও লিখেছি। ধারণা করি ঐক্য পরিষদ নিয়ে আমি যত লেখা লিখেছি সম্ভবত আর কেউ এত লেখা লেখেননি। কিন্তু সবই দেখা গেছে ঐ প্রবাদ বাক্যের ন্যায়, ’পাঠায় শুনেনা ধর্মের কাহিনী।’
২৬শে ফেব্রুয়ারী জ্যাকসন হাইটসে বাজার করতে যেয়ে পালকি রেস্টুরেন্টে এক বন্ধুকে নিয়ে চা খাচ্ছিলাম। পাশে বসা জনৈক সাংবাদিক বন্ধু কথা প্রসঙ্গে জানালেন, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও সম্প্রতি পঞ্চগড়ে একজন পুরোহিত হত্যার প্রতিবাদে আজ এখানে (পালকি পার্টি সেন্টারে) এবং জ্যামাইকায় ঐক্য পরিষদের দু’টি গ্রুপের দু’টি সাংবাদিক সম্মেলন হবে। শুনে বিষয়টি জরুরী এবং অবশ্য কর্তব্য মনে হলেও সংবাদটি আমার কাছে গুরুত্ব বহন করেনি। কারণ ঐক্য পরিষদ যে একটি নপুংসক সংগঠন জনাব গাফফার চৌধুরী অনেক আগেই এ তগ্মায় ভূষিত করেছেন। তারপর আবার একই দাবিতে দু’টি গ্রুপের দু’টি সাংবাদিক সম্মেলন।

কিন্তু পরদিন পাল্কি পার্টি সেন্টারে অনুষ্ঠিত অংশের সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশে গরু জবাই বন্ধের দাবি সম্বলিত খবর দেশে ও প্রবাসের পত্রপত্রিকায় ফলাও করে প্রকাশিত হওয়া দেখে আতঙ্কিত হয়েছি।তবে বিস্মিত হইনি। অতীতের ঘটনা স্মরণ করে ভেবে আশঙ্কিত হয়েছি, প গড়ের পুরোহিত হত্যার প্রতিবাদ এবং বিচার চাওয়ার সাথে বাংলাদেশে গো-হত্যা বন্ধের যোগসূত্র আবিস্কার এবং দাবি তোলা নিয়ে। আশঙ্কিত হচ্ছি, সংখ্যালঘু সমস্যার নামে এদের ধর্মান্ধ উগ্র সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির হটকারী কার্যকলাপ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে আরো গভীর সংকটে নিপতিত করার অশুভ অপপ্রয়াস দেখে।

বিস্মিত হইনি কারণ আমার ধারনা এটি পূর্ব পরিকল্পিত ব্যাপার হতে পারে। সেজন্য এর বিষদ বিশ্লেষণ এবং অতীত ইতিহাস তুলে ধরা অপরিহার্য মনে করি। তারই প্রেক্ষিতে বলার অপেক্ষা রাখেনা, অতীতে সংখ্যালঘু নির্যাতনের নামে প্রতিবাদ সভায় একই গ্রুপ ও নেতাদের অনুরূপ উগ্র সাম্প্রদায়িক উস্কানির ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবাদে স্থানীয় সত্যনারায়ণ মন্দিরে ঐক্য পরিষদের একটি প্রতিবাদ সভা ছিল। সভায় আমি, আওয়ামী লীগ সেক্রেটারী আব্দুস সালাম, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সউদ চৌধুরী সহ কমিউনিটির অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। সেই প্রতিবাদ সভায় আজকের পালকি পার্টি সেন্টারের নেতারাই ভারতীয় বি জে পি’র কিছু উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসেন। নারিন্দার ঠাকুর নামে এক বি জে পি সে সভায় সংখ্যালঘু নির্যাতনের নানা সাম্প্রদায়িক উস্কানীর বক্তব্য দিয়ে বলেন, ’আজকের বাংলাদেশ ও ভারতে যারা মুসলিম তারা এক সময় হিন্দু ছিলেন। এখন সময় এসেছে আবার সকলকে হিন্দু ধর্মে ফিরে আসার।’ এই বক্তব্যের পর সমগ্র কমিউনিটিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। পত্রপত্রিকায় তীব্র সমালোচনা হয়। সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রতিবাদের গুরুত্ব ভেস্তে যায়।

দ্বিতীয় ঘটনা, ঐ সময়ের সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা সম্বলিত একটি বিরাট বই প্রকাশ করা হয়। সেই বইয়ের প্রকাশনা উৎসব ছিল কুইন্স বুলোবার্ডের মৌরিয়া রেস্টুরেন্টে। প্রকাশনা সভায় প্রবাসের সর্বস্তরের বিশিষ্টজন এবং সকল পত্রপত্রিকার সাংবাদিক ও সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন। সেদিনও এই একই গ্রুপের নেতা দ্বিজেনবাবু বায়না ধরেন বি জে পি’র কলকাতার জনৈক মুখার্জিকে বক্তৃতার সুযোগ দেওয়ার জন্য। কিন্তু সত্যনারায়ণ মন্দিরের ঘটনার কথা চিন্তা করে অনেকে তাকে বক্তৃতা দিতে আপত্তি জানান। কিন্তু নেতার গো ধরা একগুয়েমীতে বৃহত্তর ঐক্যের কথা বিবেচনা করে নেতৃবৃন্দ বাধ্য হন মুখার্জিকে বক্তৃতা দিতে। নারিন্দর ঠাকুরের ন্যায় মুখার্জিও নির্যাতনের ঘটনা শুরু করেন ’৪৬ সালে কলকাতায় সোহরাওর্দি ও শেখ মুজিবের মুসলিম দাঙ্গার মাধ্যমে কিভাবে হিন্দুদের হত্যা করা হয় এবং কিভাবে স্বাধীনতার পর রমনা কালী মন্দির দখলের ঘটনা ঘটে। তার পুরো বক্তৃতায় তাৎক্ষণিক সভায় বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এতে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা সম্বলিত প্রথম বই প্রকাশ নিয়ে যে আলোড়ন তৈরি হয়, এবং প্রকাশনা সভার মাধ্যমে সংখ্যালঘু নির্যাতনের একটি চিত্র তুলে ধরে জনমত তৈরির যে পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য ছিল সবই ভেস্তে যায়। অধিকন্তু উল্টো সমগ্র কমিউনিটি এবং দেশে বিদেশে পত্রপত্রিকায় ঐক্য পরিষদের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে। তার চেয়েও বড় কথা এসব ঘটনার পর সংখ্যাগুরু নেতারা পরবর্তীতে ঐক্য পরিষদের সভা সমিতিতে যোগদান করতে অনীহা প্রকাশ করেন।

এসব ঘটনার কারণে এবং কেন্দ্রের আন্দোলন বিমুখ আপোষকামী সুবিধাবাদী ও স্বার্থলোভী নেতৃত্বের কারণে নিউইয়ক ঐক্য পরিষদ দু’টি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। সেই থেকে দীর্ঘদিন ধরে দ্বিজেনবাবু-রূপকুমার অন্যদিকে রতন বড়–য়া নবেন্দু-শিতাংশ এই দুই গ্রুপের অস্তিত্ব চলে আসছিল। আজকে কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনিন্দ্র নাথ দ্বিজেনবাবুদের সমালোচনা করছেন বটে, অথচ তারাই আজ তাদের কথায় বিতর্কিত দ্বিজেনবাবুর কমিটিকেই এতদিন অনুমোদন দিয়ে আসছিলেন। যদিও কার্যত অননুমোদিত রতন বড়–য়া, নবেন্দু দত্ত, শিতাংশু গুহরাই আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন। একই সাথে আন্দোলন এবং সংখ্যালঘু স্বার্থে কেন্দ্রের সাথে ঐক্যের জন্য দেনদরবার করছিলেন। তাদেরই চাপের মুখে এক পর্যায় বছর দু’য়েক আগে উভয় গ্রুপকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য অনুমোদিত দ্বিজেনবাবুদের কমিটির বিলুপ্তি ঘোষণা করে কেন্দ্র। এটর্নি অশোক কর্মকারকে আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় একটি আহ্বায়ক কমিটি। ছয় মাসের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। কিন্তু অশোক কর্মকারকে আহ্বায়ক হিসেবে অনেকেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তাদের মতে তারা অশোক কর্মকারকে আহ্বায়কের যোগ্য মনে করেননি। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্র বিবদমান কোন গ্রুপের সাথে আলাপ আলোচনা ছাড়া কেবল নবেন্দ্র দত্তের প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে তাকে আহ্বায়ক করা হয়। ফলে কোন্দলের জেরে বিভক্ত থাকা বিবদমান গ্রুপগুলোর অবস্থানের সুযোগে ধান্দাবাজ সুবিধাবাদী কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সাথে নেতৃত্বলোভী অশোক কর্মকারের একটি সম্পর্কের নৈকট্য তৈরি হয়। অশোক কর্মকার নিজেই নেতৃত্ব দখলের উদ্দেশ্যে প্রয়াস শুরু করেন। নেতৃত্বের লোভ দেখিয়ে বিবদমান গ্রুপ থেকে তৃতীয় শ্রেণীর নেতা ও কর্মীদের বাগিয়ে নিয়ে দল ভারী করতে সমর্থ হন। এমতাবস্থায় কেন্দ্রও চাচ্ছিল তাকে রেখে আন্দোলনবিমূখ আজ্ঞাবহু একটি কমিটি গঠন করে রাখা। ফলে অশোক কর্মকারের কেন্দ্রের সুসম্পর্কের কারণে নবেন্দু-শিতাংশু এবং দ্বিজেনবাবু এই উভয় গ্রুপই কেন্দ্রের বিরাগ ভাজনে পরিগণিত হন। সম্মেলন প্রস্তুতির জন্য কেন্দ্র অশোক কর্মকারকে নির্দেশ দেয়। সম্মেলনে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত উপস্থিত থাকবেন বলে জানানো হয়। আরো জানানো হয় তিনি সকল গ্রুপের সাথে আলাপ আলোচনা করে একটি সর্বসম্মত কমিটি গঠন করার লক্ষ্য নিয়েই আসছেন।

সেক্রেটারী রানা দাশগুপ্তের আসাকে কেন্দ্র করে অশোক কর্মকারের সাথে নেতৃত্বের টানাহেছড়ায় জড়িত নবেন্দ্র-শিতাংশু এবং দ্বিজেনবাবুদের গ্রুপ নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের প্রস্তুতি শুরু করে। এতে উভয় গ্রুপে ভাঙ্গাভাঙ্গি এবং দল পরিবর্তনের একটি হিড়িক লক্ষ্য করা যায়। এমনি অবস্থায় একটি মন্দিরে গ্রুপছুট এবং গ্রুপ বহির্ভূত ধর্মীয় উগ্রবাদী কিছু ব্যক্তির সমন্বয়ে তৃতীয় আরেকটি গ্রুপের জন্মের কথা শোনা যায়। কেন্দ্রীয় নেতার আসাকে উপেক্ষা করে সম্মেলনের আগেই এই গ্রুপটি সম্মেলন করে একট্ িকমিটি গঠনের ঘোষণার কথাও শোনা যায়। এ নিয়ে তখন স্থানীয়  আজকাল পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। ”

সংবাদটির অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরা হলো-আজকাল রিপোর্ট: যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের বিভক্তিতে হিন্দু সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গুটিকয়েক ব্যক্তির স্বার্থে নিউইয়র্কে ঐক্য পরিষদের বিভক্তি সংগঠনটিকে তার আদর্শ-উদ্দেশ্য থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। সংখ্যালঘুর স্বার্থ সংরক্ষণে কার্যকর কোন ভূমিকাই রাখতে পারছে না সংগঠনটি। বরং সংখ্যালঘুদের উপকারের পরিবর্তে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে বহুধাবিভক্ত সংগঠনটি। সাম্পতিক কর্মকা-ে এমনটিই মনে করছেন নিউইয়র্ক প্রবাসী সাধারণ হিন্দুরা। তারা অভিযোগ করেন, সংখ্যালঘুদের উপকার তো দূরের কথা ঐক্য পরিষদের পলিটিক্স এখন মন্দিরে অনুপ্রবেশ করছে। যদিও তারা ভিন্ন ভিন্ন ব্যানারে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবাদে নানা কর্মসূচি পালন করছে।

এদিকে রানা দাশগুপ্ত ঐক্যবদ্ধ কমিটি করতে ব্যর্থ হয়ে অশোক কর্মকারকে নিয়েই সম্মেলন করেন। পরবর্তীতে তার কমিটিকেই বৈধতা এবং অনুমোদন দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে কেন্দ্র এবং সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ থাকলেও বস্তুত অশোক কর্মকারের কমিটিই এখন কেন্দ্রের অনুমোদিত কমিটি। আর দ্বিজেনবাবুর নেতৃত্বে পালকি পার্টি সেন্টারের বিতর্কিত গ্রুপ এখন প্রতিপক্ষ বা বিরোধী গ্রুপ। এমতাবস্থায় বিবদমান গ্রুপগুলোর নেতৃত্বে নতুন করে পলারাইজেশন ঘটে। নবেন্দ্র-শিতাংশ গ্রুপ কেন্দ্রীয় সেক্রেটারীর সাথে দেনদরবার করে শেষ পর্যন্ত হাতে পায়ে ধরেও যখন কমিটিতে স্থান পাওয়া যায়নি, তার চলে যাওয়ার পর গায়ে পড়ে অশোক কর্মকারের সাথে আপোষে ভাগ বাটোয়ারা করে দু’একটি পদ পেয়ে তার সাথে যুক্ত আছেন। অন্যদিকে মন্দিরে জন্ম নেওয়া উগ্রবাদী তৃতীয় গ্রুপটি শুনেছি দ্বিজেনবাবুর গ্রুপের সাথে একাত্ম হয়ে গেছে। তার সাথে বাড়তি হিসেবে নবেন্দ্র-শিতাংশু গ্রুপ থেকে যুক্ত হয়েছেন টমাস দুলু রায়, প্রদীপ দাস ও প্রদীপ মালাকার। এছাড়া গৌরাঙ্গ কুন্ডু, শ্যামল চক্রবর্তী ও তার ভাই ধ্রুব চক্রবর্তী প্রমূখরা। অন্যদিকে সেক্রেটারী পদের লোভ দেখিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বিজেনবাবু গ্রুপের স্বপন দাসকে অশোক কর্মকার বাগিয়ে নিতে সক্ষম হন। তবে এসব পলারাইজেশনের পেছনে সংখ্যালঘু স্বার্থ কিংবা আন্দোলন-নির্যাতনের কোন সম্পর্ক মনে করার কারন নেই। ¯্রফে সংকীর্ণ নেতৃত্ব ভাগবাটোয়ারার স্বার্থ।

এবার আসা যাক পূর্ব পরিকল্পিত ধারনা নিয়ে। কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের আসাকে কেন্দ্র করে যখন বিভিন্ন উপদলের সৃষ্টি হয় এবং তাদের সভা সমিতি অনুষ্ঠিত হচ্ছিল তখন কেন্দ্র ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তৃতীয় একটি গ্রুপ কট্টর অবস্থান নিতে দেখা যায়। শোনা যায় এই গ্রুপটি নাকি তখনই বাংলাদেশে গরু জবাই বন্ধের দাবি তুলতে চেয়েছিল। যেকোন কারণে তখন আর দাবিটি তোলা হয়নি। আরো শোনা যায় মন্দিরে যে তৃতীয় গ্রুপটির জন্ম হয় এটিই সেই গ্রুপ যেটি এখন দ্বিজেনবাবুর গ্রুপের সাথে একাত্ম হয়ে গেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভারতে তখন গরু জবাই বন্ধে সাম্প্রদায়িক আর এস এস ও বি জে পির’র চরম সহিংসতা চলছে। ফ্রিজে গরুর মাংস রাখার অপরাধে আহমদাবাদে আখলাক নামে জনৈক মুসলিমকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। এ নিয়ে স্বানীয় বর্ণমালা পত্রিকায় আমি একটি প্রতিবেদন লিখি।

প্রতিবেদনের দীর্ঘ আলোচনায় লিখেছিলাম, হিন্দুত্বের দোহাই দিয়ে আজকে যারা কে কি খাবে নির্ধারণ করে দিতে চাচ্ছে কিংবা গো-হত্যা বন্ধের দাবি তুলছেন এক সময় তারাও গো-মাংস খেতেন। শুধু খেতেন না গো-মাংস ছিল বহু ধর্মীয় অনুষ্ঠানে খাবার হিসেবে পরিবেশনের প্রধান ও বিশেষ খাদ্য। বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ধর্মপুস্তক মনু সংহিতা, রামায়ণ, মহাভারত এবং স্বামী বিবেকানন্দের এ সম্পর্কীয় উদ্ধৃতি ও প্রমাণাদি তুলে ধরি। এ নিয়ে আমেরিকান হিন্দু ফাউন্ডেশন, একটি মন্দির এবং আজকের পালকি সেন্টারে সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত বাংলাদেশে গো-হত্যা বন্ধে দাবি উত্তাপনকারীদের অনেকেই আমার কঠোর সমালোচনা করেন বলেন বলে শুনেছি। আমার বিরুদ্ধে আমার ব্যক্তিগত বিষয় ও ব্যাপার নিয়ে আক্রমণ করারও পরিকল্পনা নাকি হয়। এমনকি দু-একজন আমার সাথে কথা বলে জিজ্ঞেস করেন, দাদা আপনি যেসব লিখেছেন এগুলো কি আদৌ সত্য? তাদের বলেছি সব রেফারেন্স ও প্রমাণাদি তো লেখার সাথে দেওয়াই আছে। তখন তারা বলেন, তারপরও তো দাদা এসব জানাজানি হলে অন্যদের কাছে আমাদের লজ্জার বিষয় না? বলেছিলাম, লজ্জার বিষয় যদি হয় তবে অন্যরা খায় বলে তাকে হত্যা করতে যাবেন কেন? তখন আর তাদের কোন উত্তর ছিলনা। সুতরাং পালকি সেন্টারে গো-হত্যা বন্ধের দাবি যে হঠাৎ মুখ ফুসকে বেরিয়ে যাওয়া বক্তব্য কিংবা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়া অথবা বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপকৌশল বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে করিনা।

এবার আসা যাক মূল ঘটানার ব্যাপারে। প্রতিবেদনটি লিখার আগে ঘটনাটি জানার জন্য বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ঘাটাঘাটি করেছি। উভয় গ্রুপের কয়েকজন নেতার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছি। ঘটনাটি নিয়ে এখন দু-গ্রুপের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং বিবৃতি চলছে। পাশাপাশি দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকায় বক্তব্যের প্রতিবাদে খবর প্রকাশিত হচ্ছে। পত্রিকা ও ফেসবুকে দেখেছি ঐক্য পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মণীন্দ্র কুমার নাথ নিউইয়র্কে অনুমোদিত কমিটির উদ্দেশ্যে এক বিবৃতিতে বলছেন, ”আমরা ইতিমধ্যে আমাদের অনুমোদিত বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টান ঐক্য পরিষদ ইউ এস এ ইনক এর নেতৃবৃন্দকে এই অবৈধ সংগঠন ও তার উস্কানিদাতাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি। একই সাথে কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদিত জ্যামাইকায় অনুষ্ঠিত শিতাংশু-নবেন্দ্র-অশোক কর্মকার গ্রুপ গো-হত্যা বন্ধের বক্তব্যের সাথে একমত নন বলে বিবৃতি দিয়েছেন।

অপরদিকে পালকি সেন্টারে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত নেতৃবৃন্দের বক্তব্য বিবৃতি পত্রপত্রিকায় দেখেছি। একই সাথে ইউ টিউবে জীবন্ত শুনেছি। দেখা যাচ্ছে বক্তব্যটি উপস্থাপিত হয়েছে তাদের অনুষ্ঠান থেকে। তাই অভিযোগটিও তাদেরই বিরুদ্ধে। যদিও এখন তারা অস্বীকার করছেন। বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বলে বক্তব্য বিবৃতিও দিচ্ছেন। পক্ষে বিপক্ষে কথাবার্তাও উঠছে। তবে তারা অস্বীকার করলেও গরু-জবাই বন্ধে শ্যামল চক্রবর্তী যে বক্তব্য দিয়েছেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং ইউটিউবে প্রকাশিত খবর ও ছবি দেখে তাদের কথায় বিভ্রান্তি সুষ্টির যৌক্তিকতা প্রমাণ করেনা। অনুষ্ঠানের আয়োজকরা বক্তব্যটি অস্বীকার করছেন বটে তবে বিষয়টি ঘোলাটে করতে যেয়ে নিজেরাই সত্য প্রমাণ করে দিচ্ছেন। কেউ বলছেন, শ্যামল চক্রবর্তী সামনে থেকে কথাগুলো বলেননি। দর্শক সারি থেকে বলেছেন। প্রথমে ঐক্য পরিষদ নেতা দ্বিজেনবাবু এবং সেক্রেটারী প্রদীপ দাস ব্যাপারটি অস্বীকার করেন। বলা হচ্ছে তিনি তাদের কেউ নন। ঐক্য পরিষদের ডাইরেক্টরও নন। অথচ দেখা যাচ্ছে সামনে তিনি অতিথিদের সারিতেই বসা। ইউ টিউবে দেখা যাচ্ছে সেক্রেটারী প্রদীপ দাস তাকে বক্তব্য দিতে আহ্বান করছেন। এবং সামনে বসেই শ্যামল চক্রবর্তী বক্তব্য রাখছেন। কেন্দ্রীয় কমিটি ও অপরপক্ষের বক্তৃতা বিবৃতিতে দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদনের জন্য যে তালিকা পাঠানো হয়েছে তাতে ১০ নম্বর ডাইরেক্টর হিসেবে শ্যামল চক্রবর্তীর নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিষয়টি আরো বিষদভাবে জানার ও বুঝার জন্য কথা বলার চেষ্টা করেছি সভাপতি টমাস দুলু রায় ও সদস্য সচিব প্রদীপ মালাকারের সাথে। টমাস দুলু বলেছেন শ্যামল চক্রবর্তী এখন ডাইরেক্ট্রর নন তবে আমেরিকান হিন্দু ফাউন্ডেশনের সভাপতি হিসেবে তাকে ডাইরেক্টর করা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি আরো বলেন, সেক্রেটারী প্রদীপ দাসই নাকি অন্যান্য অতিথিদের ন্যায় শ্যামল চক্রবর্তীকে আহ্বান করে সামনে নিয়ে আসেন। জিজ্ঞেস করেছিলাম, গরু-জবাই বন্ধের দাবি তো সংখ্যালঘুদের দাবি বা সমস্যা নয়, তাছাড়া বলছেন আপনারা তার বক্তব্যের সাথে একমত নন, তাহলে ঐক্য পরিষদ তার বক্তব্য এনডোর্স করেনা- একথা বলেননি কেন? জানিয়েছেন, সভার পক্ষ থেকে বলা হয়নি তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিকদের বিষয়টি না লিখতে অনুরোধ রেখেছেন। প্রদীপ মালাকার বলেছেন, শ্যামল চক্রবর্তীর বক্তব্য মানবজমিনের সাংবাদিক টুইস্ট করে ছাপিয়েছেন। বলেছিলাম, টাইম টিউবে তো পুরো বক্তব্য ও ছবি জীবন্ত তুলে দিয়েছে। তাছাড়া বাংলা পত্রিকায় আরো বিস্তারিতভাবে ছাপা হয়েছে। সুতরাং সবাই মিথ্যা এবং টুইস্ট করেছে অস্বীকার করবেন কিভাবে? তারপর যদি টুইস্ট করাই হয় পরের দিনই আবার সাংবাদিক সম্মেলন করলেন না কেন? বলেছেন, বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, প্রয়োজনে সাংবাদিক সম্মেলন করা হবে।

শ্যামল চক্রবর্তী ডাইরেক্টর নন না আগন্তুক দর্শক ছিলেন। দর্শক সারিতে ছিলেন না সামনে ছিলেন।সামনে থেকে না দর্শক সারি থেকে বক্তব্য দিয়েছেন এসব মারপেচে এবং নেতাদের বক্তব্য ও পত্রপত্রিকার রিপোর্ট এবং ছবি বিবেচনায় নিলে শ্যামল চক্রবর্তী যে বক্তব্য দিয়েছেন এবং সেটি সামনে থেকেই দিয়েছেন বলার ও প্রমাণের অপেক্ষা রাখেনা। শ্যামল চক্রবর্তী ডাইরেক্টর নন কিংবা তাদের কেউ নন এসবই সত্যের অপলাপ মাত্র। শ্যামল চক্রবর্তীর সাথে দ্বিজেনবাবুদের সম্পর্ক সেই নব্বই-এর দশক থেকেই দেখে আসছি। পূজা সমিতি, হিন্দু মন্দির গঠনের প্রাক্কালে শ্যামল চক্রবর্তী ও তার ভাই দ্রুব চক্রবর্তী বলা চলে দ্বিজেনবাবুর পক্ষে ঠেঙ্গাল বাহিনীর ভূমিকা পালন করতেন। দু’ভাইয়ের উগ্র কথাবার্তা ও আচরণ অত্যন্ত অমার্জিত অশোভনীয় বলে অনেকেই তাদেরকে এড়িয়ে চলতে দেখা যায়। সেদিনের পালকি পার্টি সেন্টারের বক্তৃতায় তার বডি লেঙ্গুয়েজও অত্যন্ত উগ্র ও আক্রমণাত্মক দেখা গেছে। এসব দেখে শুনে কেউ যদি প্রশ্ন করেন দাবিটি উত্তাপন ছিল পূর্ব পরিকল্পিত অস্বীকার করা যাবে? সুতরাং উচিত হবে ব্যাপারটি আরো ঘোলাটে করার আগে বিষয়টি স্বীকার করে শ্যামল চক্রবর্তীকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া উচিত। একই সাথে অনুষ্ঠান আয়োজক ঐক্য পরিষদকেও পত্রপত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে ভুল স্বীকার করা উচিত।

পরিশেষে, ঐক্য পরিষদ দু’গ্রুপে বিভক্ত না বহুধা বিভক্ত সেটা বড় কথা নয়। আমার প্রশ্নও নয়। নেতৃত্ব ও স্বার্থের কুৎসিৎ উদ্দেশ্যে একটি না পাঁচটি গ্রুপে ঐক্য পরিষদ বিভক্ত থাক তাতেও আপত্তি নেই। সংখ্যালঘুদের দাবি নিয়ে কিংবা প গড়ের পুরোহিত হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকারও নিশ্চয় ঐক্য পরিষদের রয়েছে। যদিও ন-পুংসক ঐক্য পরিষদের এসব প্রতিবাদ আদৌ কোন গুরুত্ব বহন করেনা। কিন্তু সংখ্যালঘু সমস্যার নামে গো-হত্যা বন্ধের দাবি তুলে সমগ্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বিপদে ফেলার অধিকার নিশ্চয় সংখ্যালঘুরা তথা কথিত ঐক্য পরিষদের কোন অংশ বা কোন অর্বাচীনকে দেয় নাই। এখানেই আমার প্রশ্ন। আশা করি শুভবুদ্ধির উদয় হবে। ঘটনা বিস্তৃতির পরিসমাপ্তি ঘটবে।

সুব্রত বিশ্বাস, লেখক ও সমাজকর্মী।

( মুক্তমত লেখকের নিজস্ব মতামত, এতে আমাদের প্রকাশনা নীতির বহিঃ প্রকাশ ঘটে না )

Related posts