November 19, 2018

এ কেমন আষাঢ়?

ঢাকাঃ  রমজান মাস। ক্যালেন্ডার বলছে আষাঢ়। রোদের খরোতাপ। প্রকৃতির যেন রুদ্রমূর্তি। রোদের তেজ মনে করাচ্ছে চৈত্রের কথা! দেশের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলমান রোজা রাখছেন। দিনভর পানাহার থেকে বিরত থেকে সন্ধ্যায় ইফতার করেন। কিন্তু দিন-রাত প্রচ- ভ্যাপসা গরম। রোজদারদের ত্রাহি অবস্থা। বেলা হতেই ঠা ঠা রোদ। পথে-প্রান্তরে ঘাম ঝরছে খেটে খাওয়া মানুষের। ঘরের ভেতরেও প্রচ- গরম। কর্মজীবী তথা চাকরিজীবীদের পথে বের হলেই গলদঘর্ম অবস্থা। সর্বত্রই বৃষ্টির জন্য হা-হুতাশ। দে বৃষ্টি দে! মাসের পর মাস গরমের দাপটে নাজেহাল বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ! এ কেমন অপরিচিত আষাঢ়? আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ পরিবেশবিদ ড. আতিক রহমান মনে করেন, প্রকৃতি তথা আষাঢ়ের এই রুদ্রমূর্তির জন্য দায়ী মানুষ। মনুষ্য সৃষ্ট পরিবেশ দূষণের কারণে বর্ষায় ঋতুর কদম ফুল ফুটলেও বৃষ্টির দেখা মেলে না। শুধু শিল্পোন্নত দেশগুলোই নয়, পরিবেশের এই বিপর্যয়ের জন্য আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ কম দায়ী নয়।

‘আষাঢ় মাসে নামছে ঢল/চলছে পানি ছলাৎছল’ কবির এই উপলব্ধি যেন সুদূর অতীত। গাছে গাছে কদম ফুল ফুটেছে ঠিকই; কিন্তু কাকভেঁজা রিমঝিম বৃষ্টির দেখা নেই। বর্ষাকালেও এখন সকাল আসছে না সতেজ হয়ে; রিমঝিম বৃষ্টি ঝিরি হাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে শাল-মহুয়া এক পায়ে দাঁড়িয়ে তমাল তরু। কিন্তু আষাঢ়ের বৃষ্টির মাতলামি নেই। হে বৃষ্টি! তুমি শান্তির পরশ দাও!! তোমার জন্য কাঁদে কিশোরের দল; পানি-কাদায় মাখামাখি হবে পাড়া-মহল্লার রাস্তাঘাটে-ফুটবল মাঠে। তোমার অপেক্ষায় কাঁপে মানকচু ছাতা গেঁয়োবধূ হলুদ শাড়ির আঁচল। কৃষক তার খর শুকাতে দখিনের মাঠভরা পানিতে হবে স্নান সাঁতারের ঠাঁট। এই আষাঢ়ে বুনো ফুল কদম্ব হিজল পথে ভাসাবে। বাউল রাত নামুক আষাঢ়। নদ-নদীর দুয়ার খোলা অথচ তীর ভাঙা ঢেউয়ের নাচন নেই।

একদা আষাঢ়ে বিকেল বেলা মেঘ গুড়গুড় বাদলা দিনে রঙধনু মেঘ বিজলী বাতির খেলা ছিল; তখন তরুণ-তরুণীর হৃদয়ের ভেতর নদীর জোয়ারের ঢেউ উঠত। আর কপোত-কপোতির তো কথাই নেই। এখন প্রখর রোদে আকাশ পোড়া রঙ পুড়ে পুড়ে খাক হচ্ছে লোহিত রঙিন। কবি জীবনানন্দ দাশ কবিতায় লিখেছেন, ‘হায় পাখি, একদিন কালীদহে ছিলে না কি-দহের বাতাসে/আষাঢ়ের দু’-পহরে কলরব করনি কি এই বাংলায়!/আজ সারাদিন এই বাদলের কোলাহলে মেঘের ছায়ায়/চাঁদ সদাগর : তার মধুকর ডিঙাটির কথা মনে আসে’। রুপসী বাংলার এই কবির মতোই যেন এখন বলতে হয় ‘হায় পাখি, একদিন আষাঢ়ে ছিলা না কি ঝুম ঝুম বৃষ্টি/ আজ কেন দেখা নেই তার’। ভরা বর্ষা ঋতুর মাঝ আষাঢ়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে দাবদাহ চলছে। কর্মব্যস্ত রাজধানীর মানুষ। শহরের প্রধান প্রধান সড়কে যানবাহন ও মানুষের দীর্ঘ জটলা। হর্ন বাজে গাড়ি নড়ে না। দুর্বিষহ অবস্থা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে বাস-রিকশা, প্রাইভেট কার। মাথার ওপর সূর্য ছড়াচ্ছে আগুনের গোলা। ভ্যাপসা গরমে রোজাদার মানুষগুলো হাঁসফাঁস করেন।

বৃষ্টির দেখা নেই। সরকার প্রতিদিন দাবি করছে রেকর্ড পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু মানুষ পাচ্ছেন না সুফল। মানুষ মনে করে সরকারের এ হিসাব যেন ‘কাজীর গরুর কেতাবে আছে গোয়ালে নেই’ প্রবাদের মতোই। গরমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। এই আছে এই নেই। শহরে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ যায়। আর গ্রামে এখনো মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ আসে। গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রোগ ও রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বড়দের পাশাপাশি শিশুরাও নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আষাঢ়ের এই ভ্যাপসা গরমে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। রিকশাওয়ালা, মাঠের ক্ষেতমজুর, মিল-কারখানার শ্রমিকের শরীর থেকে ঝরছে কেজি কেজি ঘাম। মাঝ আষাঢ়েও তাপমাত্রা এবং বৃষ্টির ভালো খবর দিতে পারছে না আবহাওয়া  অধিদপ্তর। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পালিত আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ইচ্ছেমতো আবহাওয়ার বার্তা দিচ্ছেন। ভ্যাপসা গরম আর খাঁ খাঁ রোদে পুড়ছে দেশের শহর-গ্রাম, মাঠ-ঘাট। গরম হাওয়া যেন আগুনের ফুলকি হয়ে ফুটছে মানবদেহে। স্বস্তি নেই ঘরে, উপায় নেই তপ্ত পিচের রাস্তায় পা ফেলার।

শিশুদের কি নিদারুণ কষ্ট। কাঠফাটা রোদে চিল-চাতকের মতো হাঁসফাঁসে ওষ্ঠাগত রোজাদারদের জীবন। সিয়াম সাধনারত তৌহিদী জনতা খুঁজে ফেরে ঠান্ডা বাতাস। প্রকৃতির এই বৈরিতায় বিপর্যস্ত খেটে খাওয়া শ্রমজীবীরা চাতক পাখির মতো থাকেন বৃষ্টির অপেক্ষায়। মাঝে মধ্যে বৃষ্টি প্রখর রোদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে ঠিকই; কিন্তু সেটা যেন ভ্যাপসা গরমকে উসকে দেয়। মনুষ্য সৃষ্ট প্রকৃতি ধ্বংসের কারণে চিরচেনা আষাঢ় যেন হারিয়ে গেল! আষাঢের বৃষ্টি আসে নতুনত্ব নিয়ে। চৈত্র-বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের প্রখর তাপদাহ থেকে শীতলতা দিতে নিয়ে আসে শান্তির বৃষ্টি। সেই অনন্তকাল থেকেই আষাঢের এই রূপ বাংলা প্রকৃতির কাছে চিরচেনা। তুমুল বৃষ্টিধারা, নদীমাতৃক দেশের নদীর পূর্ণ যৌবন, নদ-নদীর ভাঙা-গড়া সবই বাংলাদেশের মানুষের রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। আষাঢ় হলো এই রোদ, এই মেঘ, এই বৃষ্টি। কখনো পূর্বাকাশ লাল করে ঝরে রোদের কিরণ। খানিক পরেই মেঘের গর্জন। অন্ধকার হয়ে আসে আকাশ। ধান, চাল, খর আর শুকাতে দেয়া কাপড় গোছাতে ব্যস্ত হয় গৃহিণী। হঠাৎ বৃষ্টিতে কিছু শুকনো থাকলেও কিছু ভিজে যায় অকস্মাৎ।

রাখাল বালক ব্যস্ত মাঠের গরু-ছাগল নিয়ে। আর রাস্তার পথচারীরা মেলেন ছাতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আষাঢ় কবিতায় লিখেছেন, ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে/ ওগো, আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে’। কবি আল মাহমুদ লিখেছেন- ‘বই খুলে সে কাল পেয়েছে কেয়া ফুলের নাম/বর্ষা ঋতুর ফুল নাকি গো গন্ধে মাতায় গ্রাম/ ফুলটাও চাই গন্ধ ওচাই এইতো আষাঢ মাস/শহরটাকে গ্রাম করে দাও সিমেন্ট ভেঙে ঘাস।’ কত কবি যে আষাঢ় নিয়ে কবিতা লিখেছেন তার পরিসংখ্যান করা কঠিন। প্রকৃতি এখন রুক্ষ। ভ্যাপসা গরমে তাপদাহ। রোজাদারদের জীবন দুর্বিষহ। গরম আর পিপাসায় ওষ্ঠাগত মানুষ চায় স্বস্তি। বৃষ্টি ভালোবাসে না এমন লোক পাওয়া মুশকিল। আষাঢ়ের বৃষ্টিতে ভিজে আবেগে মথিত হয় হৃদয়। শরীর হয় পুলকিত। বৃষ্টি নিয়ে কত শত স্মৃতির জমিন তৈরি হয়েছে তার হিসাব নেই। সেই আষাঢ়ে বৃষ্টির বদলে ভ্যাপসা গরম। এ যেন অচেনা আষাঢ়। জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের ‘এ কোন সকাল/রাতের চেয়েও অন্ধকার’ গানের মতোই আষাঢ়ের অচেনা রূপ দেখে বলতে হয় ‘এ কোন আষাঢ়/চৈত্রের চেয়ে প্রখর’।ইনকিলাব

Related posts