September 21, 2018

এরশাদকে রওশনের চ্যালেঞ্জ

336
ঢাকাঃ   জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছেন বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ। তিনি বলেছেন, দলের কো-চেয়ারম্যান করা ও মহাসচিব পদে পরিবর্তনের যে সিদ্ধান্ত এরশাদ নিয়েছেন, তা নীতিসিদ্ধ নয় ও অগণতান্ত্রিক। এরশাদ এই দুটি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন রওশন। গতকাল সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে রওশন এ কথা বলেন। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার প্যাডে তার তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মামুন হাসান স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি একটি সু-প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল। এমন একটি দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সংসদীয় দল ও প্রেসিডিয়াম সভার আলোচনা ছাড়াই কো-চেয়ারম্যান ও মহাসচিব পদে পরিবর্তন এনেছেন। যা রাজনৈতিক দলের নীতিসিদ্ধ নয় ও অগণতান্ত্রিক। একই সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিয়ে পার্টিতে যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে, সেটি সঠিক নয় বলে দাবি করেন রওশন।

তিনি বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিয়ে যৌথসভায় কোন আলোচনা হয়নি। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দলের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে নেতৃত্ব পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং পরিমার্জন করার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বিভিন্ন কমিটির সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে করবেন। রওশন আশা প্রকাশ করে বলেন, জাতীয় পার্টির বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে এবং এ দলকে ভবিষ্যতে আরও সুসংগঠিত ও সুসংহত করার লক্ষ্যে পার্টির চেয়ারম্যান এই দুটি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন।রওশনের বিবৃতির বিষয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, আমার সিদ্ধান্তের কোন পরিবর্তন হবে না।

গত রোববার রংপুর সফরে থাকা অবস্থায় এরশাদ তার ছোটভাই ও প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে জিএম কাদেরকে দলের ভবিষ্যৎ চেয়ারম্যান বলেও ঘোষণা দেন এরশাদ। এরপরের দিনই দলীয় পরিচয়ে মন্ত্রী-এমপি হওয়া কয়েকজন নেতা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। রওশন এরশাদের সঙ্গে বৈঠক করে তাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার ঘোষণা দেন জিয়াউদ্দিন বাবলু। পরের দিন ঢাকায় ফিরে এরশাদ জিয়াউদ্দিন বাবলুকে সরিয়ে দলের মহাসচিব হিসেবে এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে নিয়োগ দেন। রওশনপন্থি নেতারা শুরু থেকেই বলে আসছেন, বিরোধীদলীয় নেতা এরশাদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন যদিও রওশন গণমাধ্যমের সঙ্গে এ নিয়ে সরাসরি কোন কথা বলেননি। গত সোমবার পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠকে এরশাদের সিদ্ধান্তের বাইরে মত দেননি রওশন। পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক থেকে বেরিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এরশাদের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন এমপিরা। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তাজুল তার কথা অস্বীকার করেন। এদিকে এরশাদ গত কয়েকদিন থেকে বলে আসছেন আমৃত্যু তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল থাকবেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে পদ ছাড়তে চান এরশাদ ক’দিন আগেই দলের নিয়ন্ত্রণ শক্তহাতে নিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। দলে তার কথাই শেষ কথা বলে হুঙ্কারও দিয়েছেন তিনি। কিন্তু এক সপ্তাহ না পেরোতেই দলের মধ্যে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকার বিষয়টি ফুটে উঠেছে এরশাদের বক্তব্যে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের পদ ছাড়তে তার সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে জানিয়েছেন এরশাদ। গতকাল জাপা চেয়ারম্যানের বনানীর কার্যালয়ে এক অনির্ধারিত সভায় এরশাদ জানান, জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদের পদত্যাগের বিষয়টি নির্ভর করে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের ওপর। এছাড়া, আওয়ামী লীগ নিজেদের প্রয়োজনে জাতীয় পার্টি শক্তিশালী করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এরশাদ বলেন, আমার দলের মন্ত্রীরা আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভায় আছেন। চাইলেই হুট করে সরে আসা যায় না। তাছাড়া, প্রধানমন্ত্রী আমাকে সম্মান করে বিশেষ দূতের পদটি দিয়েছেন। আমি কি উনার সঙ্গে কথা না বলে এই পদ ছেড়ে দিতে পারি? জোরজবরদস্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হবে না। যা করতে হবে আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে।

এরশাদ বলেন, জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এটা প্রধানমন্ত্রী উপলব্ধি করবেন। তিনি নিশ্চয়ই বুঝবেন- জাপাকে শক্তিশালী করতে হলে মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তার সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে মন্ত্রীদের বেরিয়ে আসার বিষয়টি। আমরা দেখি- উনি (প্রধানমন্ত্রী) কি  ধরনের সিদ্ধান্ত নেন। নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। বিএনপির অনেকেই আমাদের সঙ্গে যোগ দিবে। আগামীতে আমরা ছাড়া কোনো বিরোধী দল নেই। আওয়ামী লীগ নিজেদের প্রয়োজনে জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী করবে। সরকারের পক্ষে আমাদেরকে ছাড়া নির্বাচন করা সম্ভব নয়। আগামী নির্বাচনের প্রয়োজনেই তারা জাপাকে শক্তিশালী করবে। এরশাদ আরও বলেন, আমরা কখনই বলবো না মধ্যবর্তী নির্বাচন হোক। আমরা আগামী নির্বাচন পর্যন্ত দলকে শক্তিশালী করতে কাজ করবো। এই ৩ বছরে আমাদের সাংগঠনিক অবস্থান শক্ত করতে হবে। এসময় নিজ দলের সমালোচনা করে সাবেক এই প্রেসিডেন্ট বলেন, জাতীয় পার্টির রাজনীতি পরিষ্কার নয়। আমাদের রাজনীতি পরিষ্কার করতে হবে।

আমাদের এমপিরা সরকারের এত প্রশংসা করে যে, উনারাই (সরকার) লজ্জা পায়। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের একতা অনেক বেশি প্রয়োজন। আমাদেরকে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। এটা ঠিক আমরা আওয়ামী লীগের মতো শক্তিশালী নই। তাদের অর্থ ও সংগঠন অনেক বেশি মজবুত। আমাদের সেটা নেই। তবুও আমরা যদি নির্বাচন করি দল একটা ভালো জায়গায় যাবে। হয়তো আমরা ক্ষমতায় যেতে পারবো না। কিন্তু আমাদের একটা অবস্থান তৈরি হবে। তবুও আমি চেষ্টা করবো দলকে ক্ষমতায় নিয়ে যেতে।  এজন্য আমাদের রাজনীতি ঠিক করতে হবে। তিনি বলেন, কুয়াশা কেটে সূর্য উঠবেই। আমাদের আর জয়বাংলা স্লোগান দিতে হবে না। আমরা আমাদের ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগানই দেবো। জিয়াউদ্দিন বাবলুকে মহাসচিব পদ থেকে অপসারণের বিষয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৪ বছরের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে বাবলুকে দায়িত্ব দিয়েছি। সে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। সমাবেশে দশ লাখ লোক আনবে বলে দশ হাজারও আনতে পারেনি। অথচ হাওলাদার পঁচাত্তর হাজার লোক জড়ো করেছিলো এক সমাবেশে।

এ সময় জিএম কাদের প্রসঙ্গে এরশাদ বলেন, আমি তাকে উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় পাঠিয়েছি। দেখলাম- মানুষ আমার চেয়ে তাকে বেশি গ্রহণ করেছে। আমি না থাকলে সে দলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। আমি আমার ছোটভাইকে নিয়ে গর্ব করি। সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের, মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য এমএ মান্নান, গোলাম হাবীব দুলাল, গোলাম কিবরিয়া টিপু, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা, এসএম ফয়সাল চিশতী, জাতীয় মহিলা পার্টির সাধারণ সম্পাদক অনন্যা হোসেন মৌসুমী, সহ-সভাপতি শাহাজাদী নাহিনা নুর, বিরোধী দলের হুইপ শওকত চৌধুরী, সংসদ সদস্য মো. নোমান মিয়া, নুরুল ইসলাম তালুকদার, রত্না হাওলাদার প্রমুখ।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts