November 18, 2018

এবার নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ইসি!

ঢাকাঃ  সারাদেশের জেলা, উপজেলা ও আঞ্চলিক সার্ভার স্টেশনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ জন্য ১০টি আঞ্চলিক, ৬৪টি জেলা ও ৫১৪টি উপজেলা/থানা সার্ভার স্টেশনের নিরাপত্তা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সাংবিধানি এ প্রতিষ্ঠানটি।

এসব সার্ভার স্টেশনের বেশ কয়েকটি সরকারী কোর কমপ্লেক্সে হওয়ায় মন্ত্রিপরিষদের অনুমতি নিতে বুধবার চিঠি পাঠিয়েছে ইসি। মন্ত্রিপরিষদ সচিবে কাছে ইসির উপ সচিব মোহা. ইসরাইল হোসেন স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে মুল্যবান মালামাল ও জাতীয় পরিচয়পত্রের সেবা প্রদানে মূল্যবান মালামাল এসব সার্ভার স্টেশনে রক্ষিত আছে। এছাড়া বিভিন্ন নির্বাচনের সময় সন্ত্রাসীদের হামলায় বেশ কয়েকটি সার্ভার স্টেশনের ক্ষতিসাধিত হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে বাউন্ডারিসহ কাঁটা তারের বেষ্টনী তৈরি করা প্রয়োজন। বাউন্ডরিসহ কাটা তারের বেষ্টনী নির্মিত হলে এসব অফিসের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

সম্প্রতি ইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এসব সার্ভার স্টেশনে একটি গাড়ি রাখার গ্যারেজ ও সকল অফিসে একজন করে নৈশ প্রহরী নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ‘কনস্ট্রাকশন অব উপজেলা এন্ড রিজিওনাল সার্ভার স্টেশন ফর ইলেক্ট্ররাল ডাটাবেইজ’ (সিএসএসইডি) প্রকল্পের আর্থিক সহায়তায় তা বাস্তবায়ন করা হবে।

সম্প্রতি মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সুপারদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ঢাকার বাইরে রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম, -এ নয়টি আঞ্চলিক সার্ভার স্টেশন, ৩৮টি জেলা নির্বাচন অফিস ও ৪১০টি থানা/উপজেলা সার্ভার স্টেশন নতুন ভবনে স্থানান্তর হয়েছে। পাশাপাশি এসব ভবনগুলোতে ভোটার তালিকা হালনাগাদসহ ইসির সব ধরনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এসব কাজে যথাযথ নিরাপত্তা দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলা হয়েছে।

ইসি কর্মকর্তারা জানায়, ভোটার তালিকার প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ এবং ভোটারের বায়োমেট্রিক ডাটাসহ ৪১টি তথ্য সম্বলিত ডাটাবেইজের সফটকপি, ইলেক্ট্রিক যন্ত্রাংশ, ল্যাপটপ, স্ক্যানার, ক্যামেরা এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সংবেদনশীল যাবতীয় সামগ্রী এ ভবনগুলোতে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।

মন্ত্রী পরিষদে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলো সরাসরি নির্বাচনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এখানে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও সমর্থক এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের আগমন ঘটে। তাই যে কোনো পরিস্থিতিতে এ অফিসগুলোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বলা হয়েছে, এতে সরকারি মালামাল এবং অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভান্ডারের বায়োমেট্টিক ডাটাসহ ইলেকট্রনিক তথ্যাদি ক্ষতিগ্রস্ত বা স্থায়ীভাবে বিনষ্ট হতে পারে। ইতিমধ্যে ২/১টি অফিসের অতি দরকারি ল্যাপটপ, স্ক্যানার, ক্যামেরাসহ অনেক সামগ্রী খোয়া গেছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

চুরির ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি ভিত্তিতে মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোর নিরাপত্তা বিধানের তাগিদ দেয়া হয়েছে। সেখানে আঞ্চলিক, জেলা, উপজেলা/থানা সার্ভার স্টেশনগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য সব মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) চিঠি দিয়েছে কমিশন।

চিঠিতে নিরাপত্তা জোরদারের জন্য সব থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) নির্দেশ দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ বলেন, দেশব্যাপী ইসির নিজস্ব ভবনগুলো বর্তমানে সাধারণ ভবন নয়; এগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আগে শুধুমাত্র নির্বাচনের নির্বাচনী সামগ্রী সংরক্ষিত থাকত। এখন এসব ভবনগুলোতে ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও ভোটগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ মালামাল সংরক্ষণ করা হচ্ছে। পুরোপুরি সার্ভার স্টেশনের কার্যক্রম চালু হওয়ায় নাগরিকরা এলাকায় বসেই পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে পারে। ঢাকায় স্থাপিত মূল সার্ভারের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের লিংক রয়েছে। মাঠ অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বিশেষ কোড এর মাধ্যমে সেখানে ঢুকে আইডি সংশোধন, ভোটার স্থানান্তর ও পরিচয়পত্র বিতরণ সবই করেন। তাই ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে কমিশনকে ভাবতে হচ্ছে। সামান্য ভুলের কারণে এসব ভবন থেকে কোন সামগ্রী চুরি হলে এর জন্য ভোগান্তি কমিশনকেই পোহাতে হবে। তাই ভবনগুলোর সুরক্ষায় নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে কমিশন।

ইসি সূত্রে জানা যায়, ১ ডিসেম্বর ২০১৩ সালে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজলা নির্বাচন অফিসে দুষ্কৃতিকারীরা আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক মেইন সুইচে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়, একই দিন মাগুরা জেলা নির্বাচন অফিস ও মাগুরা সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসে দুষ্কৃতকারীরা পেট্রোল বোমা, হাত বোমা, ইট, পাথরে মাধ্যমে হামলা চালায়, একই বছরের ৩০ ডিসেম্বর নওগাঁ সদর উপজেলায় সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়ে নির্বাচনী ফলাফল তৈরির কাজে ব্যবহৃত ল্যাপটপ, প্রিন্টার ও স্ক্যানার ভাঙচুর করে, ২০ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে ককটেল মেরে সন্ত্রাসীরা ঝালকাঠি জেলা নির্বাচন অফিসের নিচতলার একটি গ্লাস ভেঙে ফেলে, নাটোর জেলা নির্বাচন অফিসে দুষ্কৃতিকারীরা ৩০ নভেম্বর ২০১৩ তারিখে জানালা ভেঙে তিনটি রুমে আগুন আগুন ধরিয়ে দেয় এবং ৩১ মে ২০১৪ তারিখে প্রধান ফটকের তাই গ্লাস, দরজার লক ভেঙে ফেলে দুষ্কৃতিকারীরা, ১৪ নভেম্বর ২০১৩ তারিখে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসে দুষ্কৃতিকারীরা অফিসের ভেতরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়।

সেই আগুনে পুড়ে আনুমানিক ৪ লাখ ৪১ হাজার টাকা মূল্যমানের যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, রেকর্ডপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ৮ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে নীলফামারী জেলা নির্বাচন অফিস ও নীলফামারী সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসে দুস্কৃতিকারীরা পেট্রোল বোমা, হাত বোমা, ইট, পাথর দিয়ে হামলা চালায়, একই দিন মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলা নির্বাচন অফিসে রাজনৈতিক দলের অবরোধ কর্মসূচি ও বিক্ষোভের সময় ইট, পাথার দিয়ে হামলা চালায়, ১ অক্টোবর ২০১৪ তারিখে মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসের সার্ভার স্টেশনের পেছনের জানালার গ্রিল কেটে ৮টি ল্যাপটপ, ৩টি ডিজিটাল ক্যামেরা ও ৬০ হাজার টাকা চুরি হয়, ২৬ নভেম্বর ২০১৩ তারিখে ফেনী সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসে দুষ্কৃতিকারীরা অগ্নিসংযোগ করে, ৪ জানুয়ারি ২০১৪ সালে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাচন অফিসে দুস্কৃতিকারীরা ইট-পাটকেল ছুরে সার্ভার স্টেশনের দোতলার সানলাইট ফ্রেমের এবং জানালার গ্লাসসহ বৈদ্যুতিক মিটার ভাঙচুর করে এবং নিচতলার বারান্দায় পেট্রোল ছুড়ে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করে এবং সর্বশেষ ২৪ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখে নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলা নির্বাচন অফিস দুষ্কৃতিকারীদের মাধ্যমে পেট্রোল বোমা, হাত বোমা, ইট, পাথর হামলার শিকার হয়।

নৈশ প্রহরীর পদ সৃষ্টির উদ্যোগঃ  সারা দেশে সার্ভার ষ্টেশনের নিরাপত্তা বাড়াতে নিজস্ব নৈশ প্রহরী নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে (ইসি)। ইতোমধ্যে নৈশ প্রহরীর পদ সৃষ্টি করতে ইসির সংস্থাপন শাখাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১৫ জেলা সার্ভার স্টেশনে শূন্য পদে নৈশ প্রহরী নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি ১৫ মে ২০১৬

Related posts