September 19, 2018

এবার দুদিন হবে বই উৎসব!

আর কয়েকদিন পরেই দেশে উদযাপিত হবে ‘বই উৎসব’। কিন্তু উৎসব পালন নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে তীব্র সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে। অথচ দুই মন্ত্রণালয় থেকেই দাবি করা হয়েছে, ছাপার কাজ শেষ হয়ে সব জেলায় ৮০ শতাংশ বই পৌঁছেও গেছে। বাকি বই আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই চলে যাবে। নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে ২০১৬ সালের বিনামূল্যের বই ছাপার কাজ যেখানে শেষ হতে চলেছে সেখানে উৎসব পালন করা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিপত্তি। এর ফলে এবার বই উৎসব কিভাবে হবে তা জানতে আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এবার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ কোটি নতুন বই বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পাঠ্যপুস্তক উৎসবের উদ্বোধন করবেন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার নতুন বছরের প্রথম দিন মিরপুরের ন্যাশনাল বাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠ্যপুস্তক উৎসবের উদ্বোধন করবেন। অন্যদিকে ২ জানুয়ারি রাজধানীর সরকারি ল্যাবরেটরি স্কুল প্রাঙ্গণে পাঠ্যপুস্তক উৎসবের মধ্য দিয়ে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেবেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। গত কয়েক বছর ধরে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে বর্ণিল আয়োজনে একই স্থানে পাঠ্যপুস্তক উৎসবের করে এলেও এবার ছোট আর বড়দের উৎসব আলাদা হয়ে গেল।

২০১০ সাল থেকে বরাবরের মতো ১ জানুয়ারি দেশে বই উৎসব পালন হয়ে আসছে। এদিন প্রথম থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা খালি হাতে স্কুলে আসে, আর যায় নতুন বই নিয়ে। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম ঘটতে যাচ্ছে। আগামী ১ জানুয়ারি শুক্রবার হওয়ায় সাপ্তাহিক ছুটি উপলক্ষে স্কুলগুলো বন্ধ থাকবে। তবু প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় গত সোমবার জানিয়ে দেয়, বছরের প্রথম দিন পাঠ্যপুস্তক বিতরণের ‘ধারাবাহিকতা’ ঠিক রাখতে ১ জানুয়ারি শুক্রবার বাংলাদেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা রেখে ‘বই উৎসব’ পালন করা হবে। উৎসবের জন্য রাজধানীর ন্যাশনাল বাংলা স্কুলকে ভেন্যু হিসেবে ঠিক করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, শুক্রবার স্কুল খোলা রাখা হলেও কোনো ক্লাস হবে না। শিক্ষকরা শুধু বই বিতরণ করবেন।

কিন্তু বই উৎসব পালন নিয়ে দুই রকম সিদ্ধান্ত কেন হল এ বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংলাপে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সঙ্গে রেখেই মিলেমিশে পাঠ্যপুস্তক উৎসব পালনের আশা প্রকাশ করেন। জানুয়ারি মাসের প্রথম দিন বই উৎসব হলেও এবার ওই দিন শুক্রবার হওয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় চাইছে ২ জানুয়ারি করতে। আর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বছরের প্রথম দিনই বই উৎসব করার ঘোষণা দিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমরা ঘোষণা করিনি যে, আমরা কত তারিখে করব। তবে আমাদের প্রাথমিক মন্ত্রণালয় ১ তারিখে করতে চায়। মন্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমি তাকে বলে এসেছি, দুই দিনে করলে সেটার অর্থ হবে না। আগে কোনোদিন বন্ধের দিন করিনি। সেই হিসাবে আমরা ২ তারিখে বলেছি। আলোচনার পর এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দুএকদিনের মধ্যে জানিয়ে দেবেন বলে শিক্ষামন্ত্রী জানান।

তবে গতকাল মঙ্গলবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে নতুন করে কিছু জানায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়টির ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেছেন, বই উৎসব নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত আগেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে। তাতে-তো দুই মন্ত্রণালয় একসঙ্গে উৎসবটি পালন করছে না এরকম প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একসঙ্গে করার দরকার কী? তার মতে, দুই মন্ত্রণালয় একসঙ্গে মিলে বই উৎসব করবে আর ক্রেডিটসহ মিডিয়া কভারেজ নিবে শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয় তা তো হতে পারে না। তিনি বলেন, ২০১০ সাল থেকে দুই মন্ত্রণালয় মিলেই বই উৎসব করেছে। কিন্তু রেকর্ড দেখলে বোঝা যাবে সেই উৎসবগুলোয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপস্থিতি ছিল যেন নামেমাত্র। এটি কেন হবে? এজন্য আমরা চিন্তা করেছি আলাদাভাবে বই উৎসব করার।

বই উৎসব পালন নিয়ে সমন্বয়হীনতা থাকলেও ইতিমধ্যেই ছাপার কাজ শেষ হয়ে সব জেলায় ৮০ শতাংশ বই পৌঁছেও গেছে। বাকি বই আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই চলে যাবে। বছরের প্রথম দিনে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলাদেশের চার কোটির বেশি শিক্ষার্থীর হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দেয়া হবে। এবার প্রায় ৩৫ কোটি বই ছাপা হচ্ছে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এত বই আলাদা করে দেখবার জন্য হাজার হাজার লোক লাগালেও সম্ভব না। আমাদের এই সব দেশে কিছু সমস্যা থেকেই থাকে। আমরা চেষ্টা করি, যত পরিদর্শন, যত বেশি চাপ দেয়া যায় রাখতে।

গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরামের উদ্যোগে এক সংলাপে অংশ নিয়ে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমানের সঞ্চালনায় এই সংলাপে সভাপতি শ্যামল সরকারও উপস্থিত ছিলেন।

সংলাপে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, প্রাথমিকের বই ছাপায় বিশ্ব ব্যাংকের ‘সামান্য’ অর্থায়ন রয়েছে। এজন্য তাদের কিছু শর্ত মানতে হয়। তাই প্রাথমিকে ছাপাটা দেরিতে শুরু হয়েছে। আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন, ছাপা হয়ে যথাসময়ে বই পৌঁছে যাবে। মঙ্গলবার পর্যন্ত ৮০ ভাগ বই বিদ্যালয়গুলোতে পৌঁছে গেছেও বলে জানান তিনি।

এবার ছাপানো অনেক বই পড়ার অযোগ্য বলে অভিযোগের দিতে ?দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মন্ত্রী বলেন, শতভাগ মান অর্জন একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এটা প্রায় অসম্ভব। ৮০ ভাগ হলেও আমরা সন্তুষ্ট। এবার তাড়াহুড়ো থাকার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, বই ছাপানো দেখতে তিনি নিজেও ছাপাখানাগুলো পরিদর্শন করেছেন। আমি রাতে যাই, অনেকক্ষণ থাকি, দেখে আসি। সামনে থাকলে হয়ত ভালো করে, না থাকলে হয়ত খারাপ করে। মানসম্মত বই দিতে না পারা একটা ব্যর্থতার প্রশ্ন। আমরা এটা নিয়ে ভালো করে অনুসন্ধান করব। যারা এর জন্য দায়ী হবেন, তাদের সিকিউরিটি মানি আগে ১০ শতাংশ ছিল, ঝুট ঝামেলার আমি ১৫ শতাংশ করে দিয়েছি, সেই অর্থ জরিমানা গুনতে হবে, বলেন তিনি।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এই কাজের কারণে বছরের শেষ কয়েকমাস অবর্ণনীয় কষ্ট করতে হয় মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। ২০১০ সালে শিক্ষার্থী ছিলো ২ কোটি, আর এখন প্রায় ৪ কোটি। ফলে প্রয়োজন হচ্ছে বেশি বইয়ের। ২০১০ সাল থেকে বছরের প্রথম দিনই উৎসব করে শিক্ষার্থীদের হাতে বই বিতরণ করে আসছে সরকার।

বন্ধের দিনে স্কুল।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১ জানুয়ারি সাপ্তাহিক ছুটি। তারপরও ধারাবাহিকতা অনুযায়ী ওইদিনই প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই বিতরণ করা হবে। দেশের ১ লাখ ৮ হাজার ৫৩৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে ২ কোটি ২৩ লাখ ২২ হাজার ৪২৮ জন। আর এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংখ্যা ৪ লাখ ৮২ হাজার ৮৮৪ জন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার নতুন বছরের প্রথম দিন মিরপুরের ন্যাশনাল বাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠ্যপুস্তক উৎসবের উদ্বোধন করবেন। অন্যদিকে ২ জানুয়ারি রাজধানীর সরকারি ল্যাবরেটরি স্কুল প্রাঙ্গণে পাঠ্যপুস্তক উৎসবের মধ্য দিয়ে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেবেন শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ।

ঘুম নেই শিক্ষামন্ত্রীর ছাপাখানায় চলছে সারাদেশের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর জন্য পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর শেষ মুহূর্তের কাজ। এই সময়ে তাই ঘুম নেই ছাপাখানার কর্মীদের চোখে। একইভাবে ঘুমহীন রাত কাটাচ্ছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও।

সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনে নুরুল ইসলাম বলেন, ডিসেম্বরটা আমার না ঘুমিয়েই কাটে। ছাপাখানায় কর্মীরা বই ছাপার কাজ করে। ওরা ভয় পায়। আমি সাহস জোগাতে বলি, আচ্ছা আমিই থাকছি। তোমরা কাজ করো। পরে ওরা আমাকে বলে, ঘুমাতে যান। কিন্তু এখান থেকে ওখানে যাই, ওখান থেকে এখান করতে করতে আর ঘুম হয় না।

পাশাপাশি আগের দুই বছরের কথাও টেনে আনেন এই মন্ত্রী। বলেন, এর আগের বছর ডিসেম্বরে ছিলো হরতাল-অবরোধ, পেট্রোল বোমা মারা আর তার আগের বছর ছিলো হরতাল। তাই ডিসেম্বর মাসের রাতটা আমার না ঘুমিয়েই কাটে। এভাবেই আমার জীবন চলে। ডিসেম্বর মাসটা রাতে না ঘুমালে আর কী হবে? আমার জীবন এই ধারাতেই অভ্যস্ত।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts