November 19, 2018

এপ্রিল ফুল: ফার্দিনান্দের চক্রান্তে ৭ লাখ মুসলমান শহীদের ইতিহাস

মুহাম্মদ মাহমুদুল হাসান : আজ ১ এপ্রিল। যা একটি নতুন মাসের প্রথম দিন। এপ্রিল ইংরেজী বর্ষের চতুর্থ মাস। এ দিবসটি এপ্রিল ফুল নামে পরিচিত। এর অন্য নাম হলো- ALL FOOLS’DAY. ফুল (Fool) একটি ইংরেজি শব্দ। যার অর্থ বোকা। ইংরেজি এপ্রিল ফুলের অর্থ ‘এপ্রিলের বোকা’ । এই “এপ্রিল ফুল” দিবসটি মুসলমানদের ইতিহাসের একটি জঘণ্যতম ও ঘৃণ্য এবং হৃদয়বিদারক লোমহর্ষক ইতিহাস । আর এদিনে আমরা অনেকই এ সর্ম্পকে জানিনা বলে ইহুদী খৃষ্টানদের সাথে এপ্রিল ফুল পালন করে থাকি। এই “এপ্রিল ফুল” দিবসটি সম্পর্কে কয়েকটি বর্ণনা পাওয়া যায়। পক্ষে-বিপক্ষে নানা কথার প্রচলন থাকলেও সত্যকে কেউ অস্বিকার করতে পারেনা।

আমাদের জানা দরকার-এপ্রিল ফুল শব্দের অর্থ, দিবসের সূচনাকাল, প্রেক্ষাপট, মুসলিমদের সাথে এ দিবসের সম্পর্ক ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক? দিবসটিতে আমাদের করণীয়-বর্জনীয় কি ? এ দিবসটির উৎপত্তি কোথা থেকে? এ দিবসটিতে আমরা ভুলে যাই আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, চরিত্র, ধর্ম ও সংস্কৃতি। ভুলে যাই আমরা মুসলমান। আমাদের ধর্ম ইসলাম। আমাদের দেশ একটি মুসলিম রাষ্ট্র। বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম রাষ্ট্র। শতকরা ৯০% মুসলমানের দেশ এই বাংলাদেশ। আমরা এমনই হতভাগা যে, আমাদের ইতিহাস সর্ম্পকে আমাদের নিজেদের জানা নাই আর জানার চেস্টাও করিনা । এ কারনেই আজ আমাদের এতো অধঃপতন। ‘যে জাতি তার ইতিহাস সর্ম্পকে জানেনা, সে জাতির মত সর্বহারা জাতি আর হতে পারেনা’।

আর মুসলমান কখনো পহেলা এপ্রিল বা ‘এপ্রিল ফুল’ পালন করতে পারে না। কারণ-হিজরী প্রথম শতাব্দীর শেষের দিক । যখন সারাবিশ্ব মুসলমানদের বিজয়ের বাতাস বয়ে চলছে । সে বাতাস ইউরোপের মাটিতেও দোলা দেয় । ইউরোপের একটি দেশের নাম আন্দুলুস বা স্পেন । ইউরোপের দক্ষিন পশ্চিমে অবস্থিত রুপসি স্পেন । উত্তরে ফ্রান্স, পশ্চিমে র্পতুগাল , র্পূবে ও দক্ষিনে ভূমধ্যেসাগর । স্পেনের রাজা লডারিক ছিলেন একজন কট্ররপন্থী জালিম খৃস্টান । তার জুলুমে জনগন ছিল অতিষ্ঠ । তার জুলুম নির্যাতনে হাপিয়ে উঠেছিল মাজলুম মানবতা। কিন্তু তার বিরুদ্ধে একটু টু শব্দ করার সাহসও ছিল না কারো । যখন গোটা ইউরোপের ক্রান্তিকাল চলছিল, মুসলিম রণক্ষেত্রে কমান্ডার প্রধান ছিলেন মূসা বিন নুসায়ের । তিনি তখন দক্ষিন মরেক্কো জয় করে কায়রোয়ানে অবস্থান করছিলেন । তখন তার সাথে কাউন্টার রাজা জুলিয়ান সাক্ষাৎ করে মাজলুম মানবতাকে রক্ষা করার জন্য মূসা বিন নুসায়েরকে আহবান করেন । মূসা বিন নুসায়ের তার অধিনের সেনাপতি তারেক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে ৭,০০০ (সাত হাজার) সৈন্যর একটি মুজাহিদ বাহিনি প্রেরন করেন । ৯২ হিজরী ২৮ রমযান মোতাবেক ৭১১ খ্রিঃ জুলাই মাসে স্পেনে অবতরন করেন মুজাহিদ বাহিনি । শুরু হয় খ্রিস্টানদের সাথে প্রচন্ড লড়াই । মর্মস্পর্শী তাকবীর ধব্বনিতে মূখরিত হয় আকাশ বাতাস । দীর্ঘ জিহাদের পর খৃস্টান বাহিনি পর্যদস্ত হয় । একের পর এক স্পেনের সকল শহর করায়ত্ব হয় মুসলমানদের । ফলে সলিল সমাধি হয় জালিম শাসকের । তারপর থেকে ১৪৯২ সাল পযর্ন্ত প্রায় ৮০০ বছর মুসলমানেরা শান্তি আর সাম্য বজায় রেখে স্পেন শাসন করে। এদীর্ঘ আট বছর মুসলমানেরা স্পেনের বর্বর চেহারা সম্পূর্ণ্য সভ্যতার আলোকে উদ্ভাসিত করেন । তাদের ন্যায়-ইনসাফ আর ভালবাসায় মুগ্ধ হয়ে মানুষ দলে দলে আশ্রয় নেয় ইসলামের ছায়া তলে । শিক্ষা-সাংস্কৃতি ,জ্ঞান-বিজ্ঞান ,শিল্প-বাণিজ্যে ইত্যাদির কেন্দ্র-বিন্দুতে পরিণিত হয় স্পেন ।

কালের প্রবাহে এক সময় মুসলমানেরা শিক্ষা-সাংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ছেড়ো আরাম- আয়েশে মত্ত হতে শুরু করল। সরে গেল কোরআন-সুন্নাহর আদর্শ থেকে। শাসকদের মাঝে অর্থের লোভ, ভোগ- বিলাসিতা ও বিজাতিয় আচার-আচরনসহ সব ধরনের নৈতিক অধঃপতন দেখা দেয়। এমন কি নৈতিক অধঃপতনের নিম্নপর্যায়ে উপণীত হল। মুসলিম শাসকদের মধ্যে অনৈক্য ও বিবাদ শুরু হয় । আর এই সুযোগকে কাজে লাগায় খৃস্টান শক্তি । যখনই মুসলমানেরা নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ভূলে আরাম আয়েশে লিপ্ত হল এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদ শুরু হল তখনই তাদের উপর নেমে আসলো এক অমানিবক অত্যাচার এবং হত্যাযজ্ঞ। ইউরোপের মাটি থেকে মুসলমানদের চিরতরে বিলিন করার জন্য মেতে উঠে ইউরোপিয় নরপিচাশেরা । ফলে মুসলিমবিদ্বেষী নরপিশাচ রাজা ফার্দিনান্দ ভাবলো ইউরোপীয় অঞ্চল থেকে গিরজীয় পর্বতমালা অতিক্রমকারী সম্প্রদায়কে যদি উচ্ছেদ করা না যায় তাহলে রাজত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। বরং গীর্জা থেকে তাদের আজানের ধ্বণী শুনা যাবে। এটা ফার্দিনান্দের জন্য মেনে নেয়া ছিল বড়ই কষ্টকর। তাই ফার্দিনান্দ মুসলিম নিধনের জন্য তৎপর হয়ে ওঠে এবং একাজে উৎসাহী পার্শ্ববর্তী পর্তুগীজ রাণী ইসাবেলাকে বিয়ে করে উভয় মিলে একটি যৌথবাহিনী গঠন করে গ্রানাডা দখলের জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকে। তারা যখন তাদের প্রস্তুতি সম্পন্নে ব্যস্ত তখন কতিপয় নামধারী স্বার্থাম্বেষী মুসলমান তাদের আশ্রয় দিলে তারা হঠাৎ মুসলমানদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হাজার হাজার নারী-পুরুষকে হত্যা করে। অবরোধ করে রাজধানী গ্রানাডা। তখন মুসলমানদের টনক নড়ে। তারা রুখে দাঁড়ায়। ফার্দিনান্দ বুঝতে পারে সম্মুখ যুদ্ধে মুসলমানদের সাথে আর পারা যাবে না, তাই সে অন্য পথ অবলম্বন করে। তারা ফসলের ক্ষেত, খাদ্যগুদাম, শহরের খাদ্য সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র এবং ভেলা উপত্যকা ইত্যাদি জ্বালিয়ে দেয়। ফলে অচিরেই স্পেনে নেমে আসে দুর্ভিক্ষ।

দুর্ভিক্ষের কালো থাবায় যখন মুসলমানরা দিশেহারা তখন যৌথবাহিনী মুসলমানদের অবরোধ করে। এই সুযোগে প্রতারক ফার্দিনান্দ তার যৌথবাহিনীকে গ্রানাডার বিভিন্ন মসজিদের পার্শ্বে সশস্ত্র অবস্থান নেয়ার নির্দেশ দেয়। প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে ফর্দিনান্দ ঘোষণা করে মুসলমানরা যদি অস্ত্র সমর্পণপূর্বক মসজিদে আশ্রয় নেয় তাহলে তাদের সম্পূর্ণ মুক্তি দেয়া হবে। আর যেসব মুসলমান সমুদ্রে খ্রিস্টান জাহাজে আশ্রয় নেবে তাদের অন্য মুসলিম রাষ্ট্রে পৌঁছে দেয়া হবে। ফার্দিনান্দের এ ঘোষণায় বিশ্বাস করে ১৪৯২ সালের ১ এপ্রিল মুসলমানরা সেইভাবে আশ্রয় নিলে প্রতারক ফার্দিনান্দের সম্মিলিত বাহিনী সকল মসজিদে তালা লাগিয়ে আবদ্ধ করে মসজিদে আশ্রয়রত মজলুম মুসলমানদের আগুনে পুড়িয়ে এবং জাহাজে আশ্রয়রত মুসলমানদের সমুদ্রে ডুবিয়ে মারে। সব মিলিয়ে সেদিন শাহাদৎ বরণ করে প্রায় ৭ লাখ মুসলমান। সেই অসহায় শান্তিপ্রিয় প্রতারিত মুসলমানদের আত্মচিৎকারে আকাশ-বাতাস যখন ভারি হয়ে উঠে তখন মুসলমানদের দুর্দশা দেখে জালিম , নরপিচাশ , প্রতারক রাজা ফর্ডিন্যান্ডের তার স্ত্রী ইসাবেলাকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ উল্লাসে বলে উঠে Oh Muslim ! HoW fool you are . হায় মুমলমান ! তোমরা কত বোকা । আর ইসাবেলা উচ্চারণ করে, ‘হায় এপ্রিলের বোকা! শত্রুর আশ্বাসে কেউ বিশ্বাস করে!” সেই দিনই ইসাবেলা মুসলমানদের নাম দেয় ‘এপ্রিল ফুল’ অর্থাৎ এপ্রিলের বোকা। নাঊযুবিল্লাহ! নাঊযুবিল্লাহ!!

ইতিহাসের অন্যতম নরপিশাচ ফার্দিনান্দ সেদিন মুসলমানদের সাথে যে ধোঁকাবাজি করেছিল, সৃষ্টি করেছিল মর্মান্তিক ইতিহাস, উন্মত্ত করেছিল মানবতার কবর রচনায়, সে দিনটি স্মরণ করার জন্য ধোঁকাবাজ খ্রিস্টানরা আজও প্রতি বছর ১ এপ্রিল পালন করে ‘এপ্রিল ফুল’। দুঃখজনক হলেও সত্য আজ আমাদের মাঝেও প্রবেশ করেছে খ্রিস্টানদের সংস্কৃতি, লেগেছে তথাকথিত আধুনিকতার কালো ছোঁয়া, আমরা ভুলে যাচ্ছি নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য। যুগের সাথে তালমলিেয়ে মুসলমানদের মধ্যেও অনেকে পালন করে ‘এপ্রিল ফুল’ দিবস। এটাই নাকি আধুনিকতা! আমরা এতই বিবেকহীন! নিজেদের সাথে নিজেরাই প্রতারণা করছি! ১৯৯৩ সালের ১ এপ্রিল গ্রানাডা ট্রাজেডির ৫০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক সভায় মিলিত হয়ে বিশ্ব খ্রিস্টান সম্প্রদায় বিশ্বের মুসলিম জাগরণকে প্রতিহত করার জন্য গড়ে তোলে ‘হলি মেরি ফান্ড’। তারা সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্বে খ্রিস্টানরাই আধিপত্য বিস্তার করবে। তাদের সেই সিদ্ধান্ত তারা আজ বাস্তবায়নের পথে এগুচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় একটির পর একটি মুসলিম রাষ্ট্রকে ধ্বংস করছে। শুধু গ্রানাডা ট্রাজেডিই নয় বরং যুগে যুগে সর্বদাই খ্রিস্টানরা মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মুসলমানদের ধ্বংস সাধন করে আসছে। আজও করছে। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তেই করছে। তারা সংস্কৃতির নামে চালাচ্ছে অপসংস্কৃতির প্রসার। আধুনিকতার নামে ধ্বংস করছে মুসলমানদের ঈমান। এখন প্রশ্ন হলো- মুসলমান হয়ে যারা এপ্রিল ফুল পালন করে, আনন্দ উল্লাস করছে, তাদের চোখের সামনে যদি তাদের আপনজনকে (অর্থাৎ তাদের পিতা-মাতা, ভাই-বোন, সন্তানদেরকে) পুড়িয়ে নির্মমভাবে শহীদ করা হতো, তাহলে সেই দিনটি কি তারা আনন্দ উৎসবের দিন মনে করতো?

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

Related posts