November 19, 2018

এপারে ফাঁসিয়ে ওপারে আশ্রয়

12
অপহরণের অভিযোগ মাথায় নিয়ে একটি পরিবারের দিন কাটছে। খুঁজে দিতে পুলিশের চাপ সেই পরিবারের ওপর। বলতে গেলে পরিবারের সবাই নজরবন্দি। অথচ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে দিব্যিই সংসার নিয়ে দিন কাটছিল ‘অপহৃত’ ফারুক আহমদ বাদশার। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাকে আটক করলে বেরিয়ে আসে পেছনের নানা খবর। ভুয়া পরিচয়ে রেশন কার্ড সংগ্রহ করে ভারতের ‘নাগরিক’ পরিচয় ধারণের চেষ্টায় ছিলেন তিনি।

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত লাগোয়া এলাকা মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের তেলিবিল গ্রাম। ফারুক আহমদ বাদশাহ এ গ্রামেরই বাসিন্দা। বিদেশে লোক পাঠানোর ব্যবসা তার। এ নিয়ে অনেকের সঙ্গে অনেক ঝামেলাও তার। এমনই এক ঝামেলায় মামলার মীমাংসার জন্য টাকার প্রয়োজন দেখা দিলে তিনি এক খণ্ড জমি বিক্রি করেন একই গ্রামের বাসিন্দা কদর আলীর কাছে। একই গ্রামের বাসিন্দা, অনেক দিনের চেনা-জানা, দলিল রেজিস্ট্রির আগেই তাই ফারুক আহমদকে টাকা পরিশোধ করেন কদর আলী। কিন্তু পরে জমি আর রেজিস্ট্রি করে দেননি ফারুক আহমদ। নানা টালবাহানা করেন। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে মামলা করেন কদর আলী। কিন্তু কদর আলীর কাছে শক্ত প্রমাণ না থাকায় মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেন ফারুক আহমদ বাদশা।

২০১৪ সালের ১৯শে এপ্রিল সন্ধ্যায় ফারুক আহমদ বাদশা তার তিন ছেলে আবদুল মালিক, আবদুল কাদির ও আবদুল জলিলকে সঙ্গে নিয়ে কদর আলীর বাড়িতে হামলা চালায়। হামলায় আহত হন কদর আলীর ভাই ইউসুফ আলী। এ ঘটনায় কদর আলীর অন্য ভাই মোহাম্মদ আলী বাদী হয়ে কুলাউড়া থানায় একটি মামলা করেন (নং:৩৩)। তদন্তের প্রয়োজনে ২০১৪ সালের ২রা মে পুলিশ গ্রামে গেলে ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে আসামিরা। পুলিশ চলে যাওয়ার পর পার্শ্ববর্তী বটতলা বাজারে কদর আলী ও তার ভাইয়ের উপর হামলা চালায় তারা। গুরুতর আহত হন কদর আলী ও তার ভাই মোহাম্মদ আলী। কদর আলীর ছেলে আক্তার হোসেন বাদী  হয়ে এ ঘটনায়ও একটি মামলা (নং: ৬) করেন কুলাউড়া থানায়। হামলার পর থেকেই আত্মগোপনে চলে যান ফারুক আহমদ বাদশা ও তার ছেলেরা।

প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে এবার নতুন নাটক সাজান ফারুক আহমদ বাদশা। ২০১৪ সালের ৮ই মে তার স্ত্রী হাজিরা বিবি মৌলভীবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি অপহরণ মামলা (নং-১০৯/১৪) করেন। কদর আলী তখন চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকলেও হাজিরা বিবি অভিযোগ করেন ৩রা মে কদর আলী এবং কদর আলীর ভাই ও ছেলেরা মিলে তার স্বামী ফারুক আহমদ বাদশাকে অপহরণ করে গুম করে রেখেছেন। এ মামলায় অভিযুক্ত অবস্থায়ই গত রমজানে মৃত্যুবরণ করেন কদর আলী। বাকিরাও আছেন পুলিশের নজরদারিতে।

কদর আলীর পরিবারের লোকজনসহ গ্রামের অনেকেই ধারণা করছিলেন ফারুক আহমদ বাদশা হয়তো সীমানা পেরিয়ে ভারতে আত্মগোপন করে আছেন। ভারতের ত্রিপুরায় তার আত্মীয়স্বজনের অভাব নেই। ফারুক আহমদের শ্বশুরবাড়ি ও নানাবাড়ি ত্রিপুরাতেই। এমনকি এ রাজ্যে তার তিন মেয়ের শ্বশুরবাড়িও। তাই নিজেকে লুকিয়ে রাখতে তার তেমন অসুবিধা হচ্ছিল না। কদর আলীর পরিবার এক সময় নিশ্চিত হন ফারুক আহমদ ত্রিপুরাতেই আত্মগোপন করে আছেন। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীসহ বিভিন্ন মহলেও বিষয়টি জানাজানি হয়। ২০১৫ সালের ২রা অক্টোবর ত্রিপুরা থেকে প্রকাশিত একটি বাংলা দৈনিকের প্রতিবেদনে উঠে আসে ফারুক আহমদের দুই ছেলেসহ ত্রিপুরায় অবৈধ অবস্থানের সংবাদ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে ধুলো দিয়ে লুকিয়ে থাকার একপর্যায়ে গত ৫ই জানুয়ারি ত্রিপুরা রাজ্যের ঊনকোটি জেলার বাবুরবাজার পূর্ব ইয়াজেখাওরা পঞ্চায়েতের ৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা সিপিএম নেতা আবদুর রবের বাড়ির ছাদ থেকে ইরানি থানা পুলিশের সহায়তায় বিএসএফ তাকে আটক করে।

কৈলাসহরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয় ফারুক আহমদকে। ‘আম আদমিকা অধিকার’ হিসেবে পরিচিত আধার কার্ড উপস্থাপনের মাধ্যমে নিজেকে ভারতীয় দাবি করে জামিনে বের হয়ে আসেন ফারুক আহমদ। তবে ওই দিন বিএসএফ ও বিজিবি’র মধ্যে মনুঘাট ক্যাম্পে অনুষ্ঠিত পতাকা বৈঠকে বিজিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল ফারুক আহমদ একজন বাংলাদেশি এবং তার নামে আদালতে মামলা রয়েছে।

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ইরানি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শ্যামল মুরাসিং ফারুক আহমদের আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। একই থানার এসআই অপর্ণা দাস মানবজমিনকে তথ্য দেন, আটকের পর ওই দিন তারা ফারুক আহমদকে আদালতে হাজির করেছিলেন। সেখানে তিনি আধার কার্ড উপস্থাপন করে জামিন লাভ করেন।

কুলাউড়া থানার ওসি মো. শামসুদ্দোহা পিপিএম বলেন, ফারুক আহমদ ভারতে আছেন বলে অনেকটাই নিশ্চিত হতে পেরেছি। যদিও আমার কাছে কোনো প্রামাণিক তথ্য নেই। তবে আশা করছি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে শিগগিরই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পারবো। মানবজমিন

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts