September 20, 2018

এত বিদ্যুৎ গেল কোথায়?


ঢাকাঃ ‘বিপু’ এসেছে উপরে যান। বিপু কে প্রশ্ন করতেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বললেন, বঝুলেন না! বিপু হলো বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর নামে এখানকার মানুষ বিদ্যুতের নাম রেখেছে। বিদ্যুৎ এই আছে তো এই নেই। বৈশাখের প্রচন্ড দাবদাহে জনজীবন অতিষ্ঠ। ঢাকার তাপমাত্রার পারদ প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি (কমবেশি) সেলসিয়াসের আশপাশে উঠানামা করছে। দুঃসহ গরম; অথচ বিদ্যুৎ এই আছে তো এই নেই। গতকাল রাজধানীর যাত্রাবাড়ির পাশের এক কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের অনুষ্ঠানে এভাবেই অভ্যর্থনা জানালেন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বিয়ের অনুষ্ঠান ‘পানসে’ হওয়ার উপক্রম। গরমে বৃদ্ধ, কড়া মেকাপ দিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে আসা মহিলা ও শিশুদের ত্রাহি অবস্থা। কোট পরিহিত বরের শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছে। দীর্ঘক্ষণ পর বিদ্যুৎ চলে আসায় সবার মুখে হাসির ঝিলিক। অতিথিদের মুখে হাসি ফুটলেও আয়োজকের চোখেমুখে শঙ্কা আবার কখন বিদ্যুৎ যায় কে জানে? শুধু ওই বিয়ের অনুষ্ঠান নয়; রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র এই অবস্থা। গরম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের লোডশেডিং চরম আকার ধারণ করেছে। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, পিডিবিসহ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণকারী সংস্থাগুলো প্রতিদিন সন্ধ্যায় খাতাকলমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পারদ উপরে উঠাচ্ছেন।

মাঝেমধ্যেই উৎপাদনের রেকর্ডের দাবি করছেন। খাতা-কলমের সে হিসাব মিডিয়াগুলোতে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। অথচ মানুষ বিদ্যুৎ সংকটে চরম দুর্বিষহ অবস্থায় পড়ে গেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় রাজধানীর অনেক এলাকায় তীব্র পানি সংকট শুরু হয়েছে। গরমে রোগব্যাধি বাড়ছে। প্রতিদিন শুধু আইসিডিডিআরবিতে হাজার হাজার রোগী ভর্তি হচ্ছে। সবার মুখে একটাই প্রশ্ন- এত বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রচার-প্রচারণা চলছে। সে বিদ্যুৎ যাচ্ছে কোথায়? এপ্রিলের প্রথম সাপ্তাহে গরম পড়ায় শুরু হয় বিদ্যুতের লুকোচুরি। পহেলা বৈশাখের পর থেকে লোডশেডিং মারাত্মক আকার ধারণ করে। ঢাকায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাচ্ছে। দিনে-রাতে মিলিয়ে ৬ থেকে ৮ বার বিদ্যুৎ চলে যায়। একবার গেলে ঘণ্টা না পেরোলে দেখা মেলে না। রাজধানীর বাইরে গ্রামগঞ্জের অবস্থা আরো নাজুক। পল্লীবিদ্যুৎ যায় না; মাঝেমধ্যে আসে গ্রামের মানুষের মুখে মুখে এ কথা প্রচলিত। অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সাফল্য নিয়ে সরকারের অহংকারের শেষ নেই। উৎপাদন বৃদ্ধির ঢোল নিত্যদিন বাজানো হচ্ছে। রেন্টাল কুইক রেন্টালের মাধ্যমে দেশে বিদ্যুতের নহর বইয়ে দেয়া হয়েছে। আহা! কি মজা!! এত বিদ্যুৎ রাখবো কোথায়!!! বিদ্যুৎ ছাড়া উন্নয়ন কল্পনাও করা যায় না।

যার জন্য ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর মহাজোট সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেয় সবচেয়ে বেশি। প্রচার করা হয় বিএনপির শাসনামলে তারেক রহমান বিদ্যুতের নামে খাম্বা বসিয়ে তিন বছরে ২ হাজার কোটি টাকা লুট করেছে। যদিও ওই সময় বাজেটে বিদ্যুৎ সেক্টরে মাত্র ১২শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। মহাজোট সরকার বিদ্যুৎ ইস্যুতে তারেকের মুপাত করে দ্রুত বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে স্বল্পমেয়াদী (৩ বছর) রেন্টাল কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এ বিদু্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট হলে যাতে নাগরিকের কেউ আদালতে দুর্নীতির মামলা করতে না পারে সে জন্য জাতীয় সংসদে ইনডেমনেটি (বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার বিচার যাতে কেউ না করতে পারে সে জন্য ইনডেমনেটি বিল পাস করা হয়েছিল) বিল পাস করা হয়। অর্থাৎ বিদ্যুৎ সেক্টরে উন্মুক্ত দুর্নীতির লীলাক্ষেত্র তৈরি করা হয়। সরকারের দাবি কয়েক বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে আড়াইগুণ। অথচ দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী এখনো বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে রয়েছে। পিডিবির দাবি বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে ১১ হাজার ৭৪৪ মেগাওয়াট।

আর চলতি গ্রীষ্মে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা সাড়ে ৮ হাজার মেগাওয়াট। চাহিদার পুরোটাই উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি)। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে চলতি মাসে ৯ এপ্রিল ৮৩৪৮ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য হলো- ২০০৮ সালে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৫২০১ মেগাওয়াট। বর্তমান সরকার প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর দ্রুত বেশকিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। বিনা টেন্ডারে রেন্টাল, কুইক রেন্টার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পর ২০১১ সাল থেকে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়তে শুরু করে। ওই বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৭২৬৪ মেগাওয়াটে। গত বছর তথা ২০১৫ সালে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কাগজে-কলমে ১২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। যদিও চাহিদা না থাকায় প্রকৃত উৎপাদন অনেক কম। গত বছর সর্বোচ্চ ৮ হাজার ১৭৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। সাড়ে ৮ হাজার বিদ্যুতের চাহিদা অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে ২০১৫ সালে। তারপরও রাজধানী ঢাকা শহরে প্রতিদিন ৬/৭ বার করে বিদ্যুৎ যায়।

গ্রামের অবস্থা আরো করুণ। তাহলে কি সরকারের বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিসেব ‘কাজীর গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই’ প্রবাদের নামান্তর! প্যারিসভিত্তিক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড এনার্জি আউটলুক-২০১৫’তে তথ্য দেয়া হয় যে, উৎপাদন বাড়লেও বাংলাদেশে বিদ্যুতের সুবিধাভোগী খুব বেশি বাড়েনি। ২০১০ সালে দেশে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় ছিল ৫৫ শতাংশ মানুষ। দীর্ঘদিন বিদ্যুতের নতুন সংযোগ দেয়া বন্ধ ছিল। তারপরও ২০১৫ সালে বিদ্যুতের সুবিধাভোগী বেড়ে দাঁড়ায় ৬১ শতাংশ। অথচ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারতে ৮১ শতাংশ, পাকিস্তানে ৭৩ শতাংশ, নেপালে ৭৬ শতাংশ, শ্রীলংকায় ৯৪ শতাংশ ও ভুটানে ৯৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী বিদ্যুতের আওতায় রয়েছে। এছাড়া থাইল্যান্ডের ৯৯, ভিয়েতনামের ৯৭, মঙ্গোলিয়ার ৯০, লাওসের ৮৭, ইন্দোনেশিয়ার ৮১ ও ফিলিপাইনের ৭৯ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। এশিয়ার উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ব্রুনাইয়ে শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে।

উল্লেখিত দেশগুলোর দিকে তাকালে বিদ্যুৎ সুবিধার দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়? বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু গত বুধবার তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ থেকে লোডশেডিংয়ের বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। তাতে তিনি বলেছেন, ‘গত এক সপ্তাহ যাবৎ ঢাকা শহর, চট্টগ্রাম ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষ কষ্ট করে যাচ্ছেন, এ জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’ প্রতিমন্ত্রীর মতে, ‘নৌযান ও নৌপরিবহন শ্রমিকরা এক সপ্তাহ ধরে তাদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ে ধর্মঘট করেছে। ফলে সারা দেশে নৌপথে জ্বালানি তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রায় ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হচ্ছে। তেল না পাওয়ায় ফসলি জমিতে সেচকাজও স্থবির হয়ে পড়ছে। আমরা আশা করছি, শুক্রবারের (২৯ এপ্রিল) মধ্যেই দেশে বিদ্যুতের অবস্থা স্বাভাবিক হবে।’

কয়েকদিন আগে সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ সচিব জানান, আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো ৩২৬৮ মেগাওয়াট। আর বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের আগে পর্যন্ত মাত্র ২৭টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো। যার মোট উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৪৯৪২ মেগাওয়াট। আর বর্তমান সরকার প্রায় ৫ বছরে ৭০টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ চুক্তি করেছে। যার মোট উৎপাদন ক্ষমতা হচ্ছে ৯৯০৯ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ৫৭টি অর্থাৎ ৪৭৭১ মেগাওয়াট উৎপাদনে এসেছে। অন্যগুলোও উৎপাদনে আসবে। আগে বিদ্যুতের সুবিধাভোগী জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪৭ ভাগ। এখন ৬২ শতাংশ মানুষ এই সুবিধা ভোগ করছে। নতুন করে সেচ সংযোগ দেয়া হয়েছে ৭৩৭৩৪টি, বিতরণ লাইন স্থাপন করা হয়েছে ৩৯৪৮৩ কিলোমিটার। প্রতি জেলায় বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ৫৮৫০০ জন। এ ছাড়া ২০০৯ সালে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ২২০ কিলোওয়াট আওয়ার। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২১ কিলোওয়াট আওয়ারে। একই সঙ্গে সিসটেম লস ১৮ দশমিক ৮৫ থেকে কমিয়ে ১৪ দশমিক ৬১ করতে সক্ষম হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তার মতে ২০১৮ সাল নাগাদ আরও ১২ হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুতের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

গতকালও ঘোষণা দেয়া হয় জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলো নতুন ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। সামিট বরিশাল পাওয়ার লিমিটেড বরিশালে এই বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে বলে জানান সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. আজিজ খান। তিনি জানান, গত ৫ এপ্রিল থেকে উৎপাদন শুরু হয়। তবে শনিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় গ্রিডে ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হয়। বরিশালের দপদপিয়া এলাকার বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে এ ঘোষণা দেয়া হয়। কীর্তনখোলা নদীর তীরে ৯ একর জমিতে এই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। প্রশ্ন হলো- এতো এতো বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘোষণা। অথচ মানুষের দুর্ভোগ কমছেই না। বিদ্যুৎতের এই আসা-যাওয়া নিয়ে যার সঙ্গে কথা হয় তিনিই জানতে চান, এতো বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা প্রচার করা হচ্ছে; কিন্তু বিদ্যুৎ গেল কোথায়?

উৎসঃ   ইনকিলাব

Related posts