September 26, 2018

এটিএম বুথ জালিয়াতি : কে এই ফরিদ নাবির?

2015_12_17_12_41_16_sBzKYwV4hsMl6MeQQYABXWXfpunXAJ_original

সিলেট : বেসরকারি তিন ব্যাংকের এটিএম কার্ড জালিয়াতিতে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার বিদেশি নাগরিক পিওতর (পিটার) সেজজেফান মাজুরেকের দেয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করছে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। ভয়ঙ্কর এ অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে সিটি ব্যাংকের কার্ড বিভাগের তিন কর্মকর্তাকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সিটি ব্যাংকের কর্মকর্তারা হচ্ছেন রেজাউল করিম শাহীন, রেফাত আবেদিন রনি ও মোকসেদ আলি মাকসুদ। গত ২২ ফেব্রুয়ারি এদের আটক পুলিশ।

রাজধানী ঢাকার গুলশান, বনানী ও মিরপুরের কালশীতে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড, সিটি ব্যাংক লিমিটেড ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের চার এটিএম বুথে ‘স্কিমিং ডিভাইস’ বসিয়ে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য জেনে কার্ড ক্লোন করে টাকা তুলে নেয় এ জালিয়াতি চক্র। তিন ব্যাংক থেকে তুলে নেয়া টাকার পরিমাণ ২০ লাখ টাকা বলে জানা গেছে।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে পোল্যান্ডের জাল পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে আসা ইউক্রেনের এ নাগরিক জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়ার কথা গোয়েন্দাদের কাছে অকপটে স্বীকার করেছে। পাশাপাশি আরো তিন দেশে কার্ড জালিয়াতির অভিযোগ থাকায় পিওতর জাল পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে আসেন বলে গোয়েন্দাদের জানান। জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেপ্তার বিদেশিসহ চারজনকে রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে গোয়েন্দা পুলিশ।

 

পিওতর (পিটার) আরো জানিয়েছেন কীভাবে, কার সহযোগিতায় তিনি বাংলাদেশে এসেছেন, এখানে এসে কী পরিকল্পনা নিয়ে তারা এগোচ্ছিলেন ইত্যাদি। এ সম্পর্কে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য গোয়েন্দারা স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, যা প্রকাশিত হয়েছে।

গোয়েন্দাদের উদ্ধৃতি দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, সিলেটের বাসিন্দা যুক্তরাজ্য প্রবাসী ফরিদ নাবিরের সঙ্গে ইউক্রেনের নাগরিক পিওতর প্রথমে বাংলাদেশে আসেন।

গোয়েন্দারা ফরিদ নাবিরের সন্ধানে সিলেটে আসেন। এরপর থেকে প্রবাসী ফরিদ নাবিরকে নিয়ে সিলেটে চলছে নানা গুঞ্জন। এমন গুঞ্জন শুনে বাংলামেইলের পক্ষ থেকে ফরিদ নাবিরের পরিচয় জানার চেষ্টা করা হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেটি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ফরিদ নাবিরের জীবনযাত্রার পুরোটাই রহস্যঘেরা।

এটিএম বুথ জালিয়াতির চক্রের প্রধান হোতা থমাস পিটারের অন্যতম সহযোগী লন্ডন প্রবাসী বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ফরিদ নাবিরের বাসা সিলেট নগরীর পূর্ব পীরমহল্লায়। তার গ্রামের বাড়ি সিলেটের ওসমানীনগর থানার দয়ামীর ইউনিয়নে।

সোমবার সরেজমিনে ফরিদ নাবিরের সিলেট নগরীর পীরমহলস্থ প্রভাতী-৩৬ নাম্বার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, তিনতলা বাসার প্রথম ও দ্বিতীয় তলার চারটি ইউনিটের মধ্যে তিনটিতে ভাড়াটেরা বসবাস করছেন। দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে থাকেন বাসার কেয়ারটেকার দেলওয়ার ও তার পরিবার। দেলওয়ার পেশায় ট্রাভেলস ব্যবসায়ী ও ফরিদ নাবিরের ঘনিষ্ঠজন। বাসার গেইটে নাবির ভিলা লেখা রয়েছে।

তবে বাসার ভাড়াটিয়ারা ও এলাকার লোকজন বাসার মালিক হিসেবে দেলওয়ারকেই চেনেন। বাসার তৃতীয় তলা এখনো নির্মাণাধীন।

বিস্তারিত জানতে দ্বিতীয় তলায় দেলোয়ারের ফ্ল্যাটে গিয়ে কলিংবেল চাপ দেয়া হয়। তখন ভেতর থেকে এক নারী জানতে চান কে। সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পরও তিনি ঘরের দরজা খুলতে নারাজ। একপর্যায়ে তিনি দরজা খুললেও কোনো তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

ওই নারী নামও জানাননি। তবে তার স্বামী দেলওয়ার জানিয়ে বলেন, তারা এ বাসার কেয়ারটেকার। তিন বছর ধরে ওই বাসায় বাস করছেন। বাসা মালিকের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফরিদ নাবিল। বাড়ির মালিক গত বছর বাসায় এসেছিলেন বলে জানালেও এর চেয়ে বেশি তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন ওই নারী।

বাসার ভাড়াটিয়ারা জানান, গত বছর ফরিদ নাবির এসে একমাস ওই বাসায় ছিলেন। তখনো তারা জানতেন না তিনি বাসার মালিক। তারা মালিক হিসেবে দেলওয়ারকেই চিনেন। নাবির ওই বাসায় অবস্থানকালে বিদেশি লোকজন দামি গাড়ি নিয়ে প্রায়শই এখানে আসতেন।

নাবিরের বাসার পাশের এক ব্যবসায়ী বাংলামেইলকে জানান, কয়েক বছর আগে ফরিদ নাবির বাসাটি কেনেন। গত বছর তিনি দেশে আসার পর প্রায় একমাস ওই বাসায় অবস্থান করেন। ওই সময় বিদেশিরাও এ বাসায় মাঝে-মধ্যে থাকতেন। বাসার সামনের রাস্তায় বিদেশিদের দামি গাড়ির লম্বা লাইন দেখা যেত।

ফরিদ নাবিলের গ্রামের বাড়ি নিজ এলাকা সিলেটের ওসমানীনগর থানার দয়ামীর ইউনিয়নের বড় ধিরারাই। গ্রামের লোকজন তাকে একজন সমাজসেবী কমিউনিটি নেতা হিসেবেই জানেন।

দয়ামীর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই মোশাহিদ জানান, ‘ওই এলাকায় অনেক প্রবাসী রয়েছে। ফরিদ নাবিল নামেও প্রবাসী থাকতে পারে।’

ইউপি সদস্য আহমদ আলী বলেন, ‘ফরিদ নামের এক লন্ডন প্রবাসী বড় ধিরারাই গ্রামে রয়েছেন। তবে তিনি বর্তমানে দেশে নেই। ফরিদ নাবিরের পরিবারের সদস্যরাও লন্ডনে থাকেন।’

কোনো আত্মীয়-স্বজন দেশে আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ফরিদের চাচাতো ভাইরা দেশে আছে। আমি শুনেছি ফরিদ কয়েকদিন আগে দেশে এসেছেন। তবে চলে গেছেন কি না তা জানি না।’

স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের শুরুর দিকে ফরিদ নাবির দেশে এসেছিলেন। গত ২ ফেব্রুয়ারি ফরিদ নাবির দেশ ছাড়লেও ওই সময় তিনি সিলেটের বাসায় আসেননি। সিলেটে আসলেও তিনি হোটেলে থাকতেন। সেখানে থেকে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে ঢাকায় ফিরেন। আর ঢাকা থেকেই তিনি ফের লন্ডনে চলে গেছেন।

এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার মো. রহমত উল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ফরিদ নাবিরের ব্যাপারে কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। যে থানায় মামলা হয়েছে ওই থানা পুলিশ চাইলে আমরা ফরিদ নাবিরের তথ্য সংগ্রহ করে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।’

Related posts