September 21, 2018

এখন থেকে মোবাইল অ্যাপ তৈরিতে অংশ নেবে দেশের নারীরা ।

মোবাইল অ্যাপ তৈরিতে দেশের নারীদের অংশগ্রহণ একেবারে নেই বললেই চলে। তবে, আশার কথা হলো, সম্প্রতি নারীরা এ ধরনের কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে শুরু করেছেন। বিভিন্ন প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা ও অ্যাপ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই অংশ নিচ্ছেন। ফলও ভালো করছেন। শেষ পর্যন্ত ঝরে পড়ার হারও খুব কম। আর এ সবই নজর কেড়েছে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, সংগঠন ও উদ্যোক্তাদের। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব জানা গেছে।

সূত্র জানায়, কিছুদিন আগ পর্যন্তও নারীদের অ্যাপ প্রশিক্ষণ নিয়ে আলাদা করে ভাবা হতো না। পুরুষের সঙ্গে যৌথভাবে নারীরাও অংশ নিতেন। সম্প্রতি অ্যাপ নির্মাণের লক্ষ্যে নারীদের জন্যও ভাবা শুরু হয়েছে।
এদিকে, সরকারি অ্যাপ নির্মাণবিষয়ক সেমিনার-কর্মশালায় নারীদের উপস্থিতি প্রায় ৩৫ ভাগ বলে জানান সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের উপ-সচিব মিনা মাসুদুজ্জামান। তিনি জানান, আইসিটি বিভাগের উদ্যোগে ৫০০ অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম উপলক্ষে দেশব্যাপী আয়োজিত বিভিন্ন সেমিনার ও ওয়ার্কশপে নারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তিনি আরও জানান, ওই প্রকল্পে নারীরা ছেলেদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করেছেন। আলাদা করে শুধু মেয়েদের জন্য কোনও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না। তবে সরকারিভাবে মেয়েদের দিকে আলাদা দৃষ্টি রাখা হয়েছিল।

মিনা মাসুদুজ্জামান আরও জানান, বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ওইসব অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমে সবার কাছ থেকে অ্যাপের আইডিয়া চাওয়া হয়। সেসব আইডিয়া বাছাই করে নির্বাচিতদের ডাকা হয়। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তারা অ্যাপটি কিভাবে তৈরি করবেন, সমস্যার সমাধান কিভাবে দেবেন। যারা সন্তোষনজকভাবে সবকিছুর জবাব দিতে পেরেছিলেন, তাদেরই কেবল চূড়ান্তভাবে অ্যাপ তৈরি প্রকল্পে ডাকা হয়। তিনি বলেন, ওইসব প্রোগ্রামেও নারী উপস্থিতি ছিল বেশ।

অ্যাপস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমসিসি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী এসএম আশ্রাফ আবীর জানান, নারীদের জন্য অ্যাপ নির্মাণের বিশেষ কোনও উদ্যোগ ছিল না। সরকারি-বেসরকারি কোনওভাবেই ছিল না। তবে সরকারি-বেসরকারিভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
আশ্রাফ আবীর বলেন, আমরা অ্যাপ নিয়ে বিভিন্ন সময় ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অনুষ্ঠান করেছি। সেসব অনুষ্ঠানে দেখেছি, নারীদের উপস্থিতি ভালো। তারা শেষ পর্যন্ত সেসব অনুষ্ঠানে থাকেন, অংশ নেন। কাজ দিলে সেগুলোও করেন।
দেশে গুগলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কথা উল্লেখ করে আশ্রাফ আবীর বলেন, সেসব অনুষ্ঠানে নারীদের উপস্থিতি ছিল প্রায় ১২ শতাংশ। একটা বিষয় খেয়াল করেছিলাম, তারা বিষয়টির প্রতি ছিলেন মনোযোগী, তাদের ড্রপ আউটের হারও ছিল কম। এসব থেকে আমরা এম-ল্যাব নামের একটি ল্যাব তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি। ওই ল্যাবের মাধ্যমে আমরা মোবাইল বেইজড স্টার্টআপকে কোচিং করাব। হাতে-কলমে শেখাব। এই প্রজেক্টে নারীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকবে। প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে আলাদা।

আগামী জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি থেকে এই ল্যাব চালু হবে বলে আশ্রাফ আবীর জানান। বিজনেস এবং টেক, এই দুটি বিষয়ে নারীরা কোনও আইডিয়া আমাদের কাছে নিয়ে এলে আমরা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব। আমরা নারী উদ্যোক্তাদের এই শিল্পে নিয়ে আসতে চাই।
এক প্রশ্নের জবাবে আশ্রাফ আবীর বলেন, মেয়েদের এই পেশায় ভালো করার সম্ভাবনা দেখতে পাই। তারা অ্যাপ নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। ছেলেদের চেয়ে তাদের মনোযোগ বেশি। কোনও কাজে হাত দিলে শেষ না করে ছেড়ে দেওয়ার হার মেয়েদের মধ্যে খুব কম। এজন্য তাদের কাজ ভালো হয়।

একইসঙ্গে তিনি সমস্যার কথাও জানালেন। বললেন, মেয়েদের মধ্যে উদ্যোগের অভাব রয়েছে। তাদের উদ্যোগী করে তুলতে হবে। প্রাইমারি এডুকেশনেই এই বিষয়টি তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে হবে বলে তিনি মনে করেন। তার ধারণা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে কারও মধ্যে এ বিষয়ে আগ্রহ না আসতে পারে বা থাকতে পারে।

সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিম ইঞ্জিনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামিরা জুবেরী হিমিকা বলেন, দেশে নারী কোডার আর প্রোগ্রামারের সংখ্যা হাতেগোনা। যা ইন্ডাস্ট্রির চাহিদা পূরণ করে না। এখানেই নারী কোডার আর প্রোগ্রামারদের বড় একটা সুযোগ আছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার। তিনি বলেন, দেখা গেল, ৫০০টা অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে। খুঁজলে দেখা যাবে, হয়তো মাত্র ২টা অ্যাপ নারীদের তৈরি। খুবই হতাশাজনক চিত্র। হিমিকা বলেন, প্রযুক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ একেবারেই কম। যারা কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়াশোনা করছেন, তাদের সফটওয়্যার পড়ানো হয়, শেখানো হয়।

এক প্রশ্নের জবাবে হিমিকা বলেন, এমনও দেখা যায়, ১০০ জন পেশাজীবীর মধ্যে ১৩ জন হয়তো আইটি প্রফেশনাল। এর মধ্যে ১০ জনই সফটওয়্যার নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। খুব জোর তাদের মধ্যে একজনকে হয়তো পাওয়া যাবে, যিনি অ্যাপ নিয়ে কাজ কাজ করতে চান বা করেন। এই অভাবটা পূরণ করতে আমরা বেসিস ওমেন ফোরামের উদ্যোগে আগামী নারী দিবসে একটা হ্যাকাথনের আয়োজন করতে যাচ্ছি। যার নেতৃত্বও দেবেন নারীরা।
তবে, হিমিকিা মনে করেন, অ্যাপের মাধ্যমে একজন নারীকে ক্ষমতায়ন করা যায়। অ্যাপ তৈরি এবং ব্যবহার করে একজন নারী নিজেকে ক্ষমতাবান মনে করতে পারবেন। তাকে একটি স্মার্টফোন দিয়ে দিতে হবে এবং তার প্রচুর অ্যাপ ব্যবহারের সুযোগ থাকতে হবে। তাহলে তিনি কোনও সমস্যায় পড়লে নিজেই একটা উপায় বের করে ফেলতে পারবেন। বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করতে পারবেন। কারও সাহায্য লাগবে না। বিভিন্ন দরজায় ধরনা দিতে হবে না। যা করবেন, তিনি নিজে নিজেই করবেন। আর যদি কেউ নিজেই অ্যাপ বানিয়ে নিতে পারেন, তাহলে তার মতো ক্ষমতাবান আর কে থাকবে। সমস্যার সমাধান যখন হাতের মুঠোয় থাকে, তখন তার মতো ক্ষমতাবান আর কেউ হয় না।

তিনি বলেন, আমরা এটাই মেয়েদের বোঝানোর চেষ্টার করছি। তিনি মায়া আপা অ্যাপের উদাহরণ দিয়ে বলেন, এই অ্যাপটি তৈরি করেছেন দুটি মেয়ে। মেয়েদের সমস্যা নিয়েই তারা এটা তৈরি করেছে এবং সমাধান দিচ্ছে, পরামর্শ দিচ্ছে এমনকি সচেতনতাও তৈরি করছে। ব্র্যাক এটাকে প্রমোট করছে। কত বড় ক্যানভাস। এই বড় ক্যানভাসের বিষয়টি মেয়েদের মাথায় ঢোকাতে হবে।

Related posts