November 19, 2018

এক বছরে ধর্ষণ বেড়েছে ৩৫ শতাংশ

বিগত দুই দশকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও শিশু সুরক্ষায় আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা হয়েছে। নেয়া হয়েছে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ। তারপরও সামগ্রিকভাবে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা কমেনি। বরং ভয়াবহ মাত্রায় বেড়েছে নৃশংসতা। বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায় গত ১ বছরে সারা দেশে ধর্ষণ বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন পর্নোগ্রাফির ছড়াছড়ি, মানবিক মূল্যবোধের অভাব ও যথেষ্ট পরিমাণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা না থাকায় ধর্ষণের ঘটনা এভাবে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এমনকি পর্নোগ্রাফি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণসহ বিভিন্ন ভাবে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে। শুধু ধর্ষণই না, নারী ও শিশুর ওপর যত ধরনের সহিংসতা রয়েছে সবগুলো

বাড়ার পেছনেও এগুলোই দায়ী। বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির ‘বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা’ শীর্ষক ২০১৫ সালের বার্ষিক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, নারীর প্রতি সহিংসতার মধ্যে যৌতুকের কারণে নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮ শতাংশ, যৌন হয়রানি ২৪ শতাংশ এবং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে ৫ শতাংশ। বাংলাদেশের ১৪টি জাতীয় পত্রিকার প্রতিবেদন, সারা দেশের ১০ থানা ও বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির কাছে আইন সহায়তা প্রার্থীদের দাখিলকৃত ১৬০টি মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে এই হিসাব পাওয়া গেছে। তবে আইনজীবী সমিতির দাবি রাজধানীতে ধর্ষণ ও নির্যাতনের মাত্রা আরও অনেক বেশি। এছাড়া, তাদের গবেষণায় দেখা যায়, যৌন হয়রানি, পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুক, ধর্ষণ, ফতোয়াসহ মোট ১২ বিষয়ের মধ্যে ৬ টিতে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। অপর দিকে ২০১৫ সালে ৬টি বিষয়ে নারীর প্রতি সহিংসতা কমেছে।

এর মধ্যে গৃহকর্মী নির্যাতন ৫৬ শতাংশ, ফতোয়া ৪৩ শতাংশ, এসিড সন্ত্রাস ২২ শতাংশ, নারী নিখোঁজ ৫১ শতাংশ, নারী পাচার ৭০ শতাংশ ও পারিবারিক নির্যাতন ১ শতাংশ কমেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাসুদা এম. রশীদ চৌধুরী বলেন, আমাদের সমাজের মানুষের আগের তুলনায় মনুষ্যত্ব নষ্ট হয়ে গেছে। ধর্মীয় শিক্ষা অনেকটা কমে গেছে। আগের দিনে দেখা যেত সন্তানরা কোন ধরনের অন্যায় করলে মা-বাবারা ধমক দিতো। শাসন করতো। এখন সন্তানরাই মা-বাবাদের ধমক দেয়। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যথেষ্ট পরিমাণ নিরাপত্তা দেয়ার অভাব রয়েছে। যে কারণে একজন ছাত্রী স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় নিরাপত্তার অভাবে ভুগছে। পথে ইভটিজিং, অপহরণ ও ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে। এছাড়া, সবচেয়ে বড় কারণ হলো কিশোর ও যুবকরা ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি থেকে প্রভাবিত হচ্ছে। পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর প্রয়োগ হলে এটা কমানো যেত।

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাড. সালমা আলী বলেন, প্রতিনিয়ত শহরে প্রচুর পরিমাণে মানুষ আসছে। তাদের অধিকাংশ উঠছে বস্তিগুলোতে। সেখানে দেখা যায়, বাবা রিকশাচালক, মা গার্মেন্টে বা অন্য কোনো কাজে বাসার বাইরে থাকে। এসময় বাসায় মেয়েরা থাকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায়। অপরদিকে অল্প বয়সী কিশোরদের শিক্ষার দিকে নিতে ব্যর্থ হচ্ছে মা-বাবারা। হাতে হাতে মোবাইলের মাধ্যমে সচরাচর ইন্টারনেটের মাধ্যমে, গান ডাউনলোডের দোকান ও অন্যান্য মাধ্যমে খুব সহজেই পর্নোগ্রাফি দেখার সুযোগ পাচ্ছে। বস্তি এলাকাগুলোতে পর্নোগ্রাফি একেবারে সহজলভ্য। সারা রাত পর্নোগ্রাফি দেখে সেগুলো থেকে প্রভাবিত হয়ে অনেক সময় ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, সারা দেশেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। আমাদের তরফ থেকে দুর্বলতা আছে বলে আমি মনে করি না। বরং আমরা নারী নির্যাতন ও শিশু সুরক্ষায় অনেক সংবেদনশীল। নারী ও শিশুদের নির্যাতনের যে মামলাগুলো আসে সেগুলোর স্পেশাল ব্যবস্থা নিয়ে নিষ্পত্তি করে থাকি। এই ধরনের অপরাধ কমাতে ও জনসচেতনতার জন্য স্কুল-কলেজে কর্মশালা, নারী নির্যাতন বিরোধী পোস্টারিং করে থাকি। একই সঙ্গে ডকুমেন্টারি বানিয়ে সেগুলো প্রচারের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করার কাজ করছি। এর ফলে আগে যে পরিমাণ ইভটিজিং ছিল এখন সেটা নেই বললেই চলে।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts