November 14, 2018

‘একুশের কথকতা’

507
অধ্যাপক রবীন্দ্র কুমার বক্সী
নূরুল আমীণ সিকদার,গাজীপুর প্রতিনিধিঃ   বৃটিশ শাসিত ভারতবর্ষে সর্ব প্রথম কংগ্রেস হিন্দি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে দাবি করে কংগ্রেসের বিপরীত অবস্থানে থেকে মুসলিম লীগও মুসলমানদের পক্ষ থেকে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য দাবি তোলে। ১৯২০ সালে শান্তি নিকেতনে কবিগুরু  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত  সভায় বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার দাবি উত্থাপন করা হয়। বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার প্রশ্নটি উত্থাপিত হয় ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের আগে থেকেই। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বেই আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ জিয়াউদ্দিন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পাল্টা বাংলাভাষার প্রস্তাব দেন। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ২৯’ জুলাই -১৯৪৭ তারিখের দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকায় বাংলাকে  রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরে একটি চমৎকার নিবন্ধ লেখেন।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট শুধু ধর্মীয় দর্শনের ওপর ভিত্তি করে জিন্নাহর নেতৃত্বে ভারতবর্ষ থেকে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান নামের এক কৃত্রিম সম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। জিন্নাহ ব্যক্তিগত ভাবে ধর্মানুরাগী ছিলেন না। তিনি পাশ্চাত্য ধারার জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি ধর্মকে শুধু ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে একাত্র ধর্মীয় যোগসূত্র ছাড়া দু’ অ লের জনগনের মধ্যে তেমন কোনো সুদৃঢ় বন্ধন ছিলনা। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে ও দু’অ লের মধ্যে ছিল হাজার মাইলের ব্যবধান। এরকম বৈসাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও বাঙালি জনগোষ্ঠী পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করেছিল । তাঁরা মনে করেছিল, পাকিস্তান সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটবে। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সে মোহ ভেঙে গেল।

পাকিস্তানের সৃষ্টি লগ্ন থেকেই পশ্চিমা শাসকেগোষ্ঠী  বাঙালি জাতিকে দাবিয়ে রাখার জন্য নানভাবে ষড়যন্ত্র শুরু করে। একটি জাতিকে ধংস করতে হলে প্রথমে তার সংস্কৃতিকে ধংস করে দিতে হয়ে। তাই পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসক-গোষ্ঠী প্রথমেই আঘাত হানে সংস্কৃতির বাহন আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলা ভাষার ওপর। ভারত বিভাগের পর পাকিস্তানের স্থপতি  মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ প্রথম পূর্বপাকিস্তান সফরে ঢাকা এসে পৌছান। তিনি ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে গনসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষনে স্পষ্ঠ ভাবে ঘোষনা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’।তিনি ভাষা আন্দোলনকে পাকিস্তানের মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, জনগনের মধ্যে যারা ষড়যন্ত্রকারী রয়েছে, তারা পাকিস্তানের শত্রু এবং তাদের কখনোই ক্ষমা করা হবে না। ছাত্র-জনতা জিন্নাহর এ বিরূপ মন্তব্যে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। উপস্থিত লোকজন এ ধরনের একপেশে উক্তিতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।

২৪ মার্চ কার্জন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানেও জিন্নাহ একই ধরনের বক্তব্য দেন। সমাবর্তনে উপস্থিত ছাত্ররা সঙ্গে সঙ্গে নো ,নো, ধ্বনি উচ্চারন করে জিন্ন্াহর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। একইদিন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি প্রতিনিধি দল জিন্নাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে একটি স্মারকলিপি দেয়। ১৯৪৮ সালের ১৮ নভেম্বর পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। ২৭ নভেম্বর আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদের এক সভায় আজিজ আহমদ, আবুল কাশেম, শেখ মুজিবুর রহমান, কামরুদ্দীন আহমদ, আবদুল মান্নান, তাজউদ্দিন আহমদ প্রমূখ একটি স্বারকলিপি প্রনয়ন করেন এবং সেটি প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের কাছে পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে কোনো সাড়া দেন নি। ১৯৫০ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার লক্ষ্যে নতুন সংগঠন তমদ্দুন মজলিশ একটি বই প্রকাশ করে যার নাম, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না কি উর্দু?’

বইটিতে তিনজনের লেখাছিল। তাঁরা হলেন- অধ্যক্ষ আবুল কাশেম, আবুল মনসুর আহমদ ও কাজী মোতাহার হোসেন। তাঁরা এই বইয়ে বাংলা ও উর্দু উভয়কেই রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার সুপারিশ করেন। হিন্দি ও ফার্সি ভাষার সংমিশ্রনে উর্দু একটি অখ্যাত ভাষা হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ট বাংলাভাষী  জনগন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে কুন্ঠাবোধ করেন নি। তাঁরা শুধু উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পেতে চেয়েছিল। পাকিস্তানের গনপরিষদের অধিবেশনের অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহন করার জন্য প্রস্তাব তোলেন। কিন্তু তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। ১৯৭১ সালে এ মহান দেশপ্রেমিক মানুষটিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের এদেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে পুত্রসহ নির্মম ভাবে হত্যা করে। পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠী কখনও বাঙালির ন্যায্য অধিকার মেনে নেয়নি।

উপরন্তু বাঙালির ওপর শুরু করে চরম নির্যাতন-নিপীড়ন। কিন্তু বাঙালি জনগোষ্ঠী তাতে হতোদ্যম হয়নি। ভাষাআন্দোলন ক্রমশ দানা বাঁধতে শুরু করে। ভাষা আন্দোলনের তৎপরতা জোরালো হওয়ার পেছনে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিনের পল্টন ময়দানের ভাষন প্রধান নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তিনি তাঁর বক্তৃতায় স্পষ্ট করে বলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু’। তিনি ভাষনে আরো উল্লেখ করেন যে, কোনো জাতি দুটি রাষ্ট্রভাষা নিয়ে সমৃদ্ধির পথে এগুতে পারেনা। এটা তার মনগড়া বক্তব্য যা সত্যের অপলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়। যুগে-যুগে এ জনপদে মীরজাফরদের আগমন ঘটেছে।

তারা দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। মাতৃভূমির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে, যা আজও অব্যহত আছে। নাজিমউদ্দিনের বক্তৃতার প্রতিবাদে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২৯ জানুয়ারি প্রতিবাদ সভা এবং ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালন করে। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় বিশাল ছাত্র সমাবেশে ৪ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ও প্রতিবাদ সভা ও ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশ ব্যাপি হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৫২ সালের ৩১শে জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের  বার লাইব্রেরি হলে অনুষ্ঠিত সভায় মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ৪০ সদস্যের সর্বদলীয় কেন্দ্রিয় রাষ্ট্রভাষা কর্মী পরিষদ গঠিত হয়। সভায় আরবি লিপিতে বাংলা লেখার সরকারি প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করা হয় এবং ৩০ জানুয়ারির সভায় গৃহীত র্ধঘট পালনের সিদ্ধান্তকে সমর্থন দেওয়া হয়।

১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ভাষা সংগ্রামী গাজীউল হকের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সরকারের জারিকৃত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তখন জগন্নাথ হলে অবস্থিত এসেম্বলিভবনে পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের অধিবেশন চলছিল। ছাত্রদের সিদ্ধান্ত ছিল যে, ১৪৪ ধারার মধ্যেই অধিবেশন কক্ষে গিয়ে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম  রাষ্ট্রভাষার দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপি মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের কাছে পেশকরবে। ঐদিনের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাঁচদলে ভাগ হয়ে ভাঙা হলো ১৪৪ ধারা। ছাত্র-ছাত্রীরা ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে এসেম্বলিভবনের  দিকে যাবার চেষ্টা করে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারী  প্রথমদলের নেতৃত্ব দেন ইতিহাস বিভাগের কৃতী ছাত্র -হাবিবুর রহমান শেলী, আর প্রথম ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন ফজলুল হক হলের  বিশিষ্ঠ ফুটবল খেলোয়াড় আব্দুল জলিল সরকার , দ্বিতীয় দলের নেতৃত্বে  ছিলেন আবদুস সামাদ আজাদ ও ইব্রাহিম  তাহা , তৃতীয় দলের নেতৃত্ব দেন আনোয়ারুল হক ও ওবায়দুল্লাহ, প ম দলটি ছিল বিশ্ববিদ্যায়ের ছাত্রীদের। যে দশ জন ছাত্রী  ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাফিয়া খাতুন, সুফিয়া ইব্রাহিম, হালিমা খাতুন, রওশন আরা বাচ্চু প্রমুখ, মেয়েদের দলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনের ইউক্যালিপটাস শোভিত রাজপথ ধরে কিছু দূর  যেতেই তাঁদের ওপর পুলিশের দল ঝাঁপিয়ে পড়ে।

শুরু হয় ছাত্র -ছাত্রীদের ওপর পুলিশের নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ। একপর্যায়ে বিনা উস্কানিতে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি বর্ষন করে। সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের  এম,এ ক্লাসের ছাত্র বরকত শহীদ হন। তাঁর সাথে শহীদ হন রফিক-জব্বার সহ আরো অনেকেই। (তথ্যসূত্রঃ একুশ ঃ ভাষা আন্দোলনের সচিত্র ইতিহাস অ্যালবামে ভাষা সৈনিক অধ্যপক রফিকুল ইসলামের লেখা থেকে উদ্বৃত) পুলিশের গুলিবর্ষনের প্রতিবাদে পূর্বপাকিস্তান আইন পরিষদের অধিবেশন থেকে বিরোধীদলীয় সদস্যরা মিছিল করে বেরিয়ে এসে  রাষ্ট্রভাষা  আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষনা করেন। ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশে আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ভাষা আন্দোলন ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন শ্রেনি পেশার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তীব্র আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার অবশেষে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম  রাষ্ট্রভাষা  হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো রক্তদানই বৃথা যায়নি, একুশের রক্তদানও বৃথা যায়নি। ভাষা আন্দোলন দ্বিজাতি তত্ত্বের ভাব-ধারার বিপরীতে সমগ্র জাতিকে একটি অসাম্প্রদায়িক প্লাটফরমে নিয়ে আসে।

একুশের রক্তে যে ফুল ফুটেছিল তার নাম অসাম্প্রদায়িকতা। একুশের আন্দোলন বাঙালির মনোজগতে প্রগতিশীলতার উন্মেষ ঘটায়। সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের মোহ ত্যাগ করে বাঙালি জনগোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলে অসাম্প্রাদায়িক রাজনৈতিক চেতনা। ফলে ভাষা আন্দোলন শুধুমাত্র সংস্কৃতির আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত রাজনৈতিক  আান্দোলনে রূপ নেয়। পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠীর শত অত্যাচার আর নিপীড়নকে উপেক্ষা করে রফিক, জব্বার সালাম, বরকতসহ নাম  জানা-আজানা অনেক শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা বাংলাভাষাকে  রাষ্ট্রভাষার মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছি। একুশে ফেব্রুয়ারি কয়েকজন তরুনের আত্মত্যাগের মহিমা এবং এর ব্যাপ্তি যে এত বিশাল সেদিন তা অতখানি অনুমিত হয়নি। একুশের আবেদন জাতীয় গন্ডির সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে পৌঁছেছে। একুশ এ জাতিকে যেমনি আলোকিত করেছে , ঠিক তেমনি আলোড়িত করেছে বিশ্ববাসীকে। তাই একুশ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো বাংলাভাষাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। বর্তমানে ইউনেস্কোর সদস্যভুক্ত ১৯০ টি দেশে যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে এ দিবসটি পালিত হচ্ছে। মধ্য আফ্রিকার দেশ সিয়েরালিওন এর অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা স্বিকৃতি পেয়েছে। বাঙালির চিন্তা-চেতনা ও মননে একুশে ফেব্রুয়ারি তার আপন মহিমায় ভাস্বর। বাঙালির জীবনে একুশ যেমন গৌরবের তেমনি বেদনারও। একুশের পথ ধরে নানভাবে বাঙালিজাতিচেতনা সমৃদ্ধ হয়েছে। একুশ বাঙালি জাতিকে যেমন মরতে শিখিয়েছে, ঠিক তেমনি শির উঁচু করে বেঁচে থাকার সাহসও জুগিয়েছে। আমাদের নিজস্ব পরিচয় খুঁজতে শিখিয়েছে। একুশের পথ ধরে বাংলার মানুষ সামনের দিকে অগ্রসর হয়েছে। ১৯৬২ সালের শিক্ষাকমিশন রিপোর্ট বিরোধী আন্দোলন, ৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন ,৬৯ এর গন অভ্যুত্থান, পরবর্তীতে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এ সবই একুশের ফসল। জীবনের যা কিছু সত্য ও সুন্দর তার প্রায় সবটুকুই পেয়েছি একুশের কাছ থেকে।

গনতন্ত্রের সংগ্রামে, জঙ্গি- মৌলবাদী স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে একুশ আমাদেরকে ধ্রুবতারার  মতো পথ দেখাচ্ছে, সাহস যোগাচ্ছে। যখনই আমরা সমস্যা ও সঙ্কটে পড়েছি, তখনই একুশের শরনাপন্ন হয়েছি। একুশ আমাদের চলার পথের সাথী, একুশ আমাদের আত্মার আত্মীয়, একুশ আমাদের অস্তিত্ব, একুশ আমাদের অহংকার। একুশের আন্দোলন আমাদের বাংলা  ভাষাকে যেমনি সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি পৃথিবীর ছোট-বড় সকল জাতিকে তাঁর মাতৃভাষার প্রতি যত্নবান হওয়ার তাগিদ দিচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির মাতৃভাষার ওপর গবেষনার জন্য ২০১০ সালে বর্তমান সরকার ঢাকায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট স্থাপন করেছে। এটি সরকারের একটি মহৎ উদ্যোগ। এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের মধ্যদিয়ে বিভিন্ন জাতির মধ্যে সুদৃঢ় বন্ধন স্থাপিত হবে। প্রত্যেক মানুষ নিজ মাতৃভাষাকে গভীর ভাবে ভালবাসে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘মাতৃভাষা মাতৃদুগসম’। বিশ্বর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে বিদেশি ভাষা চর্চা করতে হবে, কিন্তু আমাদের হৃদয়ে থাকবে বাংলা ভাষা।

সাহিত্যিক আবুল ফজল বলেছেন , ‘বিদেশি ভাষার মাধ্যমে পন্ডিত হওয়া যায় মানুষ হওয়া যায় না, মানুষ হতে হলে মাতৃভাষার প্রয়োজন।’ মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করার জন্য একুশের সৃষ্টি হয়েছিল। জাতীয় জীবনের সকল স্তরে মাতৃভাষার প্রচলন, এটাই ছিল একুশের মূল লক্ষ। কিন্তু ৬৫ বছর পর দুঃখের সাথে বলতে হয়, একশের সে লক্ষ পুরোপরি পূরন হয়নি। উচ্চশিক্ষা ও সর্ব্চ্চো আদালতের কার্যক্রম সবই চলছে ইংরেজি মাধ্যমে। তাই একুশের কাছে আমাদের দীনতা ও কম নয়। জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে বাংলাভাষার প্রচলন করে একুশের শহীদের আত্মত্যাগ স্বার্থক করে তুলতে হবে। একুশের আন্দোলন আজ ও থামেনি। একুশের পরাজিত শক্তি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ধ্বংস করে দিতে চায়। এশক্তি মুক্তিযুদ্ধের প্রগতিশীল মক্তমনা মানুষদের কে হত্যা করে চলছে, দেশবরেন্য বুদ্ধিজীবীদের কাছে প্রতিনিয়ত মৃত্যু পরোয়ানা পাঠাচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করছে, অহেতুক মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বির্তক তুলছে  ,শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি কটাক্ষ করছে, ওস্তাদ আলউদ্দিন খাঁ সঙ্গীত ভবন আক্রমন করছে, তাঁর ব্যবহার সরোদ ও তবল ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে ,

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাঠাগার পুড়িয়ে দিয়েছে, এরাসবাই একুশের পরাজিত শক্তির প্রতিনিধি। তারা দেশটাকে  জঙ্গিরাষ্ট্রে পরিনত করতে চায়। শহীদদের রক্ত স্নাত লাল সবুজের পতাকা খামছে ধরতে চায়। একুশের চেতনায় শানিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে, দেশ বিরোধী অপশক্তিকে রুখে দাঁড়াতে হবে, এটাই হোক এবারের একুশে আমাদের শপথ। ২১ ফেব্রুয়ারীর প্রত্যুষে পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত শিশু-কিশোরসহ কোটি কোটি মানুষের নগ্নপায়ে শহীদ মিনার অভিমুখে ঢল  নামে, তখন আমরা আশাবাদী হই – একুশের পরাজিত শক্তির আরেকটি পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। বিজয় আমাদের অনিবার্য বাঙালি জাতির ইতিহাসে পরাজয় বলতে কোন শব্দ নেই, আছে শুধু বিজয়। শহীদ স্মৃতি অমর হোক।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts