November 21, 2018

একা হয়ে যাচ্ছেন খালেদা জিয়া

নতুন একটি জাতীয় নির্বাচন আদায়ের লক্ষ্যে ভবিষ্যৎ সরকারবিরোধী আন্দোলনকে সামনে রেখে ধীরে ধীরে একা হয়ে পড়ছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। দুই দফা সরকারবিরোধী আন্দোলনে ব্যর্থতা, স্থানীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে হতাশাজনক ফলাফল ছাড়াও জোটের শরিক দলগুলোর জোট ছেড়ে যাওয়ার ঘটনা রাজনৈতিকভাবে তার দল বিএনপিকে আরো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। পৌরসভা নির্বাচনে পরাজয়ের ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই গত সপ্তাহেই বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক ইসলামি ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামির নেতৃত্বে একটি অংশ জোট ছাড়া আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। এর কিছু দিন আগে শেখ শওকত হোসেন নিলুর ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) ও ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এনডিপি) একটি অংশও ২০ দলীয় জোট ত্যাগ করেছে। জানা গেছে, ২০ দলীয় জোটের ওপর দুই শরিক দল খেলাফত মজলিস ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামও ছাড়তে পারে।

পৌরসভা নির্বাচনসহ রাজনৈতিক নানা কারণে বিএনপির সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে জোটের শরিক দলগুলোর দূরত্ব বাড়ছে। বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও বিএনপির মধ্যে এক ধরনের মতভেদ রয়েছে। পৌরসভা নির্বাচনের পূর্বে অনুষ্ঠিত জোটের সর্বশেষ বৈঠকেও জামায়াতের কোনো প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেনি। শরিক দলগুলোর অভিযোগ আন্দোলনসহ রাজনৈতিক কর্মকৌশল নির্ধারণে তাদের মতামত প্রাধান্য পায় না। ঠিকমতো মূল্যায়ন না পাওয়াসহ সমন্বয়হীনতার অভিযোগও রয়েছে বিএনপির বিরুদ্ধে।

শরিক দলগুলোর জোট ছেড়ে যাওয়ার ঘটনাকে প্রকাশ্যে খুব একটা আমলে না নিলেও বিএনপির কয়েক শীর্ষ নেতা বলেছেন, শক্তির বিচারে জোটের অনেক দলেরই সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল। আন্দোলনে খুব একটা কার্যকর ভূমিকা পালনের শক্তি-সামর্থ্যও নেই। তার পরও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জোটের শরিক দলগুলোর জোট ছেড়ে যাওয়া আমাদের চলমান রাজনৈতিক আন্দোলনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও মনে করেন ক্ষমতাসীন সরকার তাদের অবৈধ ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে ২০ দলীয় জোট ভাঙার ষড়যন্ত্র করছে। তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারি একটি ভোটবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ প্রতারণার মাধ্যমে ক্ষমতায় বসেছে। এখন তাদের টার্গেট যে কোনোভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকা। আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালিয়েও যখন জনগণের নির্বাচনের দাবি উপেক্ষা করতে পারছে না তখন আমাদের দল ও জোটে ভাঙনের ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। জোটের শরিক দলগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, তার পরও আমরা আশা করছি সব চাপ লোভ লালসার ঊর্ধ্বে উঠে নতুন নির্বাচন আদায়ের দাবিতে আমাদের জোট ঐক্যবদ্ধ থাকবে।

শুধু যে শরিক দলগুলো জোট ছাড়ছে তা নয় বিপদের সময় দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদেরও পাশে পাচ্ছেন না বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপির বহু হেভিওয়েট নেতা মামলা-হামলার ভয়ে বিদেশে অবস্থান করছেন। যারা দেশে আছেন তারাও হয়রানির হাত থেকে বাঁচতে নিজেদের নিষ্ক্রিয় করে রেখেছেন।

ওয়ান ইলেভেনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে পরাজয়ের পর বিএনপি তার চারদলীয় জোটের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। জামায়াতে ইসলামি, ইসলামি ঐক্যজোট, জাতীয় পার্টি ও খেলাফত মজলিস নিয়ে গঠিত হয় বিএনপির চারদলীয় জোট। পরবর্তী সময়ে জোট সম্প্রসারিত হয়ে এলডিপি, লেবার পার্টি, জাগপা, কল্যাণ পার্টি, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর)সহ ছোট বেশ কয়েকটি দল নিয়ে ২০ দলীয় জোট গঠন করে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন এই জোট নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি জাতীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন দাবিতে জোটগতভাবে আন্দোলন করে আসছে। ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনও জোটগতভাবেই ২০ দল বয়কট করে।

এদিকে ৫ জানুয়ারির আগে-পরে দুই দফা সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে মামলা, হামলা, নির্যাতনে বিএনপির অবস্থা করুণ। পৌরসভা নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ করলেও সাংগঠনিক অবস্থার কারণে দলটি রাজপথের কর্মসূচি পর্যন্ত দিতে পারেনি। নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেই চুপ থেকেছে। এর মধ্যেই গত বছর মে মাসের দিকে সরকারবিরোধী আন্দোলন বন্ধ করে দল পুনর্গঠনের ঘোষণা দেন খালেদা জিয়া। তারপর তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডন যান। বিএনপি নেতারা বলেছিলেন, লন্ডন থেকে ফিরেই বেগম খালেদা জিয়া দল পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেবেন। পৌরসভা নির্বাচনসহ নানা কারণে বিএনপির পুনর্গঠন প্রক্রিয়াও বন্ধ।

জানা গেছে, বিএনপি হাইকমান্ড খুব দ্রুতই দলের জাতীয় কাউন্সিল করে দলকে ঢেলে সাজানোর চিন্তাভাবনা করছে। ফেব্রুয়ারি শেষে অথবা মার্চের প্রথমদিকে দলের কাউন্সিল হতে পারে। দলের কাউন্সিল করার প্রস্তুতি হিসেবে ইতিমধ্যে সাংগঠনিক জেলা কমিটি গঠনের চিঠিও দেয়া হয়েছে।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts