November 20, 2018

একাই দৌড়-ঝাঁপ করছেন জাফরুল্লাহ, নির্দেশনা নেই খালেদার!

377

ঢাকাঃ বিএনপির সন্ত্রাসবিরোধী ঐক্যের প্রস্তাব নিয়ে খোদ দলটির মধ্যেই কোনও তৎপরতা নেই। তবে সমর্থক বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিতি লাভ করা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ওই উদ্যোগ নিয়ে একাই দৌড়-ঝাঁপ করছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘বাসদের খালেকুজ্জামান ভূঁইয়ার সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে দেখা হওয়ায় কিছু কথা বলেছি। এছাড়া বুধবার সিপিবি এবং কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের নেতাদের সঙ্গে জাতীয় ঐক্য নিয়ে কিছু কথাবার্তা হবে। দেখা যাক কী হয়।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপির নেতারা কী করছেন তার খবরও নিচ্ছি না। কারণ তাদেরকে ম্যুভ করতে বলেছি। কিন্তু তারা কিছু করছে বলে মনে হয় না।’ তার মতে, সবকিছু খালেদা জিয়ার বলে দিতে হবে কেন। কিছু কাজ তারা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে করলে সমস্যা কী; প্রশ্ন তোলেন সুধী সমাজের এই প্রতিনিধি।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, বিএনপির সিনিয়র কোনও নেতাকে এ পর্যন্ত ওই উদ্যোগ এগিয়ে নিতে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নির্দেশনা দেননি। ফলে স্পর্শকাতর ওই ইস্যুতে দলটির নেতারা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে কোনও তৎপরতাও শুরু করেননি। কারণ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে গেলে ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক জামায়াতকে জোট থেকে বাদ দেওয়ার প্রসঙ্গ উঠবে। প্রগতিশীল দলগুলোর সঙ্গে বৃহত্তর ঐক্য বা প্লাটফর্ম করার আলোচনা শুরু করতে গেলেই তারা টেনে আনবে জামায়াত ইস্যু। অথচ এ ইস্যুতে বিএনপি এখনও কৌশল ঠিক করেনি; অর্থাৎ জামায়াতকে বাইরে রাখার কথা আলোচনা হলেও কীভাবে তাদের বাদ দেওয়া হবে সে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়নি।

বিএনপি নেতাদের মতে, এ ধরনের নিষ্পত্তিতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত লাগবে। এ পরিস্থিতিতে আলোচনা শুরু করাই বিপদজ্জনক বলে মনে করেন বিএনপির নেতারা। ফলে এ ইস্যুতে তারা নড়াচড়া করছেন না বলে বিএনপি নেতাদের কাছ থেকে জানা গেছে।

আলাপকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও নজরুল ইসলাম খান এবং কেন্দ্রীয় ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানসহ একাধিক নেতা জানিয়েছেন, বৃহত্তর ঐক্যের ব্যাপারে তাদের কাছে কোনও তথ্য নেই, চেয়ারপারসনও এ ব্যাপারে তাদের কোনও দায়িত্বও দেননি।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে কোনও দলের সঙ্গে কেউ কথা বলছেন কি না আমার জানা নেই।’

আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘দলের পক্ষ থেকে দায়িত্ব না পেলে এ ইস্যুতে তৎপরতা চালানো বা কাজ করা কঠিন। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর লন্ডন থেকে ফিরলে এ বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে।’

এর আগেও বিভিন্ন ইস্যুতে দেশের প্রগতিশীল বেশ কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনা অনেকদূর এগিয়ে নিয়েছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এছাড়া দলের কেন্দ্রীয় ভাইস-চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা ও আবদুল্লাহ আল নোমানও অনেক ইস্যুতে বিএনপির হয়ে কাজ করেছেন। খোকা প্রায় দু’বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন। আর মির্জা ফখরুল লন্ডনে গেছেন দলের পক্ষে একটি সেমিনারে অংশ নিতে।

গত ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার পর ৩ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে দল মত নির্বিশেষে সবাইকে সন্ত্রাসবিরোধী ঐক্যে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান। এরপর ১৩ জুলাই রাতে স্থায়ী কমিটিসহ সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে আলোচনা করেন তিনি। একইদিন শরিক জোট ২০ দলের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন খালেদা।

উদ্ভুত পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে পরেরদিন ১৪ জুলাই তিনি সমাজের বিশিষ্ট নাগরিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব আলোচনায় প্রায় সবাই বিদ্যমান সংকট থেকে বের হওয়ার জন্য বৃহত্তর প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলে জাতীয় ঐক্য তৈরি করার পরামর্শ দেন। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ১৪ দলীয় জোটের বাইরে থাকা দলগুলোকে ওই ঐক্যে সামিল করার কথাও বলা হয় বৈঠকে।

তবে বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে বৈঠকে জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বৃহত্তর ঐক্যের পথে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি জামায়াত বড় বাধা বলে উল্লেখ করেন। জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে।’

অন্যদিকে দলের নেতারাও মনে করেন, জামায়াতকে জোটের বাইরে রাখা হলে প্রগতিশীল দলগুলো বিএনপির ডাকে সাড়া দেবে। তবে কী প্রক্রিয়ায় জামায়াতকে জোটের বাইরে রাখা হবে তার প্রক্রিয়া বা কৌশল নিয়ে বিএনপির মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনও আলোচনা হয়নি। ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে অবশ্য খালেদা জিয়া স্বীকার করেছেন, জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির অনেক সমস্যা হচ্ছে।

তবে আওয়ামী লীগ বা ১৪ দল বিএনপির উদ্যোগে ঐক্যে সামিল হবে এ কথা বিএনপির কেউ বিশ্বাস করেন না। দলটির মূল টার্গেট হলো- সিপিবি ও বাসদের পাশাপাশি সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্প ধারা, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম, আ স ম রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমীক জনতা লীগসহ প্রগতিশীল দলগুলোকে কাছে টানা।

আপাতত সন্ত্রাসবিরোধী ঐক্য হচ্ছে বিএনপির মূল লক্ষ্য। পরে এই ঐক্য প্রক্রিয়াকে দলটি গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে আন্দোলনে নিয়ে যেতে চাইছে। তবে বরাবরই জামায়াত ওই পথে প্রধান বাধা বলে দলগুলো প্রকাশ্যে বলে আসছে। ফলে প্রায় ১০ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এবার জামায়াতকে বাদ দিয়ে রাজনীতিতে কী পাওয়া যায় ওই পথে হাঁটছে। আর সে কারণে জাফরুল্লাহ চৌধুরী আপাতত একাই বিএনপির জন্য কাজ করছেন।

সূত্রঃ বা.ট্রি.

Related posts