November 17, 2018

একটি বিয়ের গল্প

বন্ধু, ২৩শে ডিসেম্বর ২০১৫ সন্ধ্যা ৭টায় বিজয় সরণি সামরিক জাদুঘর প্রাঙ্গণে মেঘনা আপি ও রাফায়াত দাদার গায়ে হলুদ। আসতেই হবে তোমাকে। আমরা সবাই মিলে হাসি গানে আনন্দে উপভোগ করবো গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান। দৃষ্টিনন্দন আমন্ত্রণপত্রে কথা ছিল এটুকুই। কিন্তু এই কথাগুলোর মাঝে কতটা আনন্দ আর বিস্ময় ছড়িয়ে ছিল সেটা না দেখলে বোধকরি বিশ্বাসই হতো না। আমন্ত্রণপত্রটি ছিল একটি বিয়ের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানের জন্য।

বড় বোন মেঘনা ও বড় ভাই রাফায়াতের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে তাদের ছোট ছোট ভাইবোন যথাক্রমে মোহনা, রিহাম, রাদিতা, মাধবী, শুভ্র, নিডো, নিধি, সিফাত, নবীন, নিহান, রিদম, রোদসী, নওমী, রোদেলা, নওনা, রায়ান, রাফিন, রিয়াসাত, ফাইজা, সাকি, আকাশ, কিশোরী, সোহাগ, গুড্ডি, ফাইয়াজ, অদ্বিতীয়, তন্ময়, ওয়াসী, নেহা, ভুলু ও স্নেহা। মূলত গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে কী হয়?

মঞ্চ সাজানো হয়, সবকিছুর আয়োজন থাকে। ভাড়া করে গানের দল আনা হয়। ভাড়া করা উপস্থাপক থাকে। অতিথিরা আসেন। ভাড়া করা লোকদের গান-বাজনা দেখেশুনে চলে যান। কিন্তু মেঘনা ও রাফায়াতের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানটি ছিল প্রকৃত অর্থেই ভিন্ন রকম। এই অনুষ্ঠানের সব আয়োজন করেছে বর-কনের ছোট ছোট ভাইবোনেরা, যা ছিল আন্তরিকতায় পূর্ণ। অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে শুরু করে সার্বিক অঙ্গসজ্জার বিষয়টিও ছিল চমক জাগানিয়া। একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান কতটা আলোকিত হতে পারে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে মেঘনা ও রাফায়াতের গায়ে হলুদের এই অনুষ্ঠানটি। এবার বোধকরি বর ও কনের একটু পরিচিতি দেয়া প্রয়োজন। কনের পুরো নাম মেঘনা তাহসিন রেজা। আদুরে ডাক নাম মেঘনা। দেশ বরেণ্য কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের নাতনি।

চ্যানেল আই-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগর ও নারী উদ্যোক্তা কনা রেজার বড় মেয়ে মেঘনা। আর বরের নাম রাকায়াত-উল-ইসলাম খান। ডাক নাম রাফায়াত। বাবার নাম ডা. আই এফ এম শহীদুল ইসলাম খান। তিনি একজন বিশিষ্টসংগীত শিল্পীও বটে। রাফায়াতের মায়ের নাম আরজুমান্দ আরা ইসলাম খান। তারা দিনাজপুরের বাসিন্দা। মেঘনা আর রাফায়াত দুজনই তরুণ চিকিৎসক। দুজনের মায়াময় উজ্জ্বল হাসি মুখের দীপ্তি ছড়িয়ে ২৩শে ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বিজয় সরণির সামরিক জাদুঘর প্রাঙ্গণে অনিন্দ্য সুন্দর এক স্বপ্ন ভুবনে যখন গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানের সূচনা হয় তখন উপস্থিত কয়েকশ অতিথি ও স্বজনের মাঝে দেখা দেয় আনন্দের বন্যা। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান মঞ্চটিকে মনে হয়েছে স্বপ্নময় কোনো এক রঙিন জগৎ। অথবা কোনো এক সুখি রাজ্য। হ্যাঁ, সেই রাজ্য থেকেই রাজাকুমারীর বেশে মঞ্চে ওঠে এলেন আমাদের রাজকুমারী মেঘনা। আর স্বপ্নের ভেলায় চড়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেন রাজকুমার রাফায়াত।

মেঘনার বাবা ফরিদুর রেজা সাগর, মা কনা রেজা উঠে গেলেন মঞ্চে। বরকে আংটি পরিয়ে আশীর্বাদ করলেন। এবার মঞ্চে উঠে এলেন রাফায়াতের বাবা ডা. আইএফএম শহীদুল ইসলাম খান ও মা আরজুমান্দ আরা ইসলাম খান। কনের হাতে আংটি পরিয়ে আশীর্বাদ করলেন। এ সময় কনের মা কনা রেজা ও বরের বাবা শহীদুল ইসলামের কণ্ঠে ধারণ করা গান শোনানো হয় অতিথি, স্বজনদের। কনের দাদি দেশবরণ্যে কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন শারীরিক অসুস্থতার কারণে সাধারণত ঘর থেকে বের হন না। কিন্তু নাতনির গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে দর্শক আসনের সামনের সারিতে অনুষ্ঠান শেষ না হওয়া পর্যন্ত বসেছিলেন। আহ। কী সে মায়াময় দৃশ্য! সত্যি ভোলার নয়। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্ব ছিল বর ও কনের ছোট ছোট ভাইবোনের অংশগ্রহণে ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

যারা কোনোদিনই মঞ্চে ওঠেনি তারাই মঞ্চ কাঁপিয়ে দিলো। এ যেন বিস্ময়ের মাঝে আরেক বিস্ময়। গোটা অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন কনের চাচা বিশিষ্ট উপস্থাপক ফরহাদুর রেজা প্রবাল। তার উপস্থাপনার ঔজ্জ্বল্যে অনুষ্ঠানটি সারাক্ষণ ভালোবাসা আর মায়ার আলো ছড়িয়েছে। অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রটিও ছিল বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। দেশের বিশিষ্ট অভিনেতা, নির্মাতা, চিত্রশিল্পী আফজাল হোসেন আমন্ত্রণপত্রের অঙ্গসজ্জা করেছেন। যা সত্যি সংগ্রহে রাখার মতো। মুকিমস ক্রিয়েশন গায়ে হলুদ ও বিয়ের মূল অনুষ্ঠানের মঞ্চ ও অঙ্গসজ্জা করেছেন। যা সত্যি অনবদ্য। নাগরিক ব্যস্ততার কারণে আমাদের দেশে পারিবারিক বন্ধন যেন শিথিল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মেঘনা ও রাফায়াতের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান দেখে মনে হয়েছে আমরা ইচ্ছা করলেই নিজেদের বদলাতে পারি। এজন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা। মেঘনা ও রাফায়াতের গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানে পারিবারিক বন্ধনের এক উজ্জ্বল দ্যুতি ছড়িয়েছে।

যা দেখে অতিথি, স্বজনরা হয়েছেন আপ্লুত। অনেকে ভেবেছেন- হ্যাঁ, এভাবেও তো সম্ভব নিজেদের কাছে টানা। বিশেষ করে বর-কনের ছোট ছোট ভাইবোনের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দেখে সকলে মুগ্ধ। কেউ কেউ বললেন পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতে এভাবে তরুণ সদস্যদের সম্পৃক্ত করা গেলে পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় হবে। যা এখন সময়েরই দাবি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ভালোবাসার অর্থ আত্মসমর্পণ নহে। ভালোবাসার অর্থ নিজের যাহা কিছু ভালো তাহাই সমর্পণ করা।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts