September 21, 2018

একটি ছবির গল্প

bdd১৯৯০ সালের এপ্রিল। শারজায় অস্ট্রেলেশিয়া কাপে খেলার সুযোগ পেল বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তখনো হাঁটি হাঁটি পা পা বাংলাদেশের। মাত্র ৫টি ওয়ানডে ম্যাচের অভিজ্ঞতা নিয়ে মার্টিন ক্রো-জন রাইট আর মার্ভ হিউজ-ক্রেইগ ম্যাকডারমট-ডিন জোনসদের অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হলো বাংলাদেশ। সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। সেবারের অস্ট্রেলেশিয়া কাপেই ওয়ানডেতে দেশের পক্ষে প্রথম ফিফটিটি পেয়েছিলেন আজহার হোসেন সান্টু।

এই লেখায় ব্যবহৃত ছবিটি সেই মুহূর্তেরই। ঐতিহাসিক মুহূর্তই বটে। আজকের দিনে সাকিব-তামিম-মাশরাফি-মাহমুদউল্লাহ-মোস্তাফিজদের প্রতিনিয়ত গড়ে চলা নানা কীর্তির তুলনায় হয়তো কিছুই নয়। কিন্তু টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার ১০ বছর আগে শারজায় আজহার হোসেনের সেই কীর্তিতে গর্বিত হয়েছিল দেশের মানুষ। ক্রিকেটে একটু একটু করে এগিয়ে চলার পথ পরিক্রমায় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ফিফটি যেন পথ দেখিয়েছিল পরের প্রজন্মগুলোকে। ২৬ বছর আগের সে স্মৃতি ধূসর হয়ে গেছে, কিন্তু নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগে সেটি নস্টালজিক করে তুলবে অনেককেই।

১৯৯০ সালের ২৮ এপ্রিল অস্ট্রেলেশিয়া কাপে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। প্রথমে ব্যাট করে সে ম্যাচে নিউজিল্যান্ড গড়ে ৩৩৮ রানের বিশাল সংগ্রহ। ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের বিপক্ষে এটি এখনো কিউইদের সর্বোচ্চ সংগ্রহ। ৯৩ রান করে করেছিলেন জন রাইট ও অ্যান্ড্রু জোনস। প্রয়াত কিংবদন্তি মার্টিন ক্রোর ব্যাট থেকে এসেছিল ৬৯ রান। তিরিশের ঘরে দুটি স্কোর ছিল মার্ক গ্রেটব্যাচ ও কেইন রাদারফোর্ডের। মাত্র ৫ ওয়ানডে খেলা বাংলাদেশের কাছে ৩৩৮ রান ছিল এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখার মতোই কঠিন এক ব্যাপার। তারপরও বাংলাদেশ লড়েছে, তখন পর্যন্ত ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ সংগ্রহটা এসেছিল এই ম্যাচেই—১৭৭। পুরো ৫০ ওভার খেলে ৫ উইকেট হারানোটাও ছিল বাংলাদেশের জন্য পিঠ চাপড়ে দেওয়ার মতোই সাফল্য। আজহার হোসেন ওপেনিংয়ে নেমে ১৭৫ মিনিট ব্যাট করেছিলেন। উইকেট না দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় খেলেছিলেন ১২৬টি বল। ইনিংসটিতে ছিল মাত্র ৪টি চার। ৫৪ রান করে দেশের পক্ষে ওয়ানডে ক্রিকেটে ফিফটির তালিকায় প্রথম নাম লিখিয়েছিলেন চশমা পরা সেই ওপেনার।

আজহার হোসেনকে সেই কীর্তির কথা মনে করিয়ে দিতেই নস্টালজিয়া পেয়ে বসল তাঁকে। ফিরে গেলেন শারজায় এপ্রিলের সেই তপ্ত দুপুরে, ‘আমার লক্ষ্য ছিল কোনোভাবেই উইকেট দেব না। অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু বলেছিলেন, “তোকে কিন্তু কমপক্ষে ১০ ওভার ব্যাট করতে হবে।” সে ম্যাচে আমি যে ওপেনিং করব, সেটিও ঠিক হয় ম্যাচের আগের দিন বিকেলে। নেটে হয়তো আমি খুব ভালো করেছিলাম। বল ব্যাটে আসছিল। কোচ প্রয়াত দৌলতউজ্জামান ভাইয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে ম্যানেজার শফিকুল হক হিরা ভাই আমাকে ওপেনিং করতে বললেন। হিরা ভাইয়ের কথায় অবাক হলেও চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলাম আমি।’

ফিফটি করার মুহূর্তটি আজও ভোলেননি আজহার, ‘আমার সঙ্গে ব্যাটিংয়ে তখন ছিল আকরাম খান। আমার রান যখন চল্লিশের ঘরে, তখন পায়ের পেশিতে টান পড়ায় জাহিদ রাজ্জাক মাসুম নেমেছিল আমার রানার হয়ে। ফিফটি হয়ে যাওয়ার পর মাসুম এগিয়ে এল। আমাকে অভিনন্দিত করল। কিন্তু দেশের হয়ে প্রথম ফিফটিটা যে করেছি, সেটি আমাদের কারওরই মাথায় ছিল না। সেটি জানি পরে। স্বাভাবিকভাবেই আনন্দিত হয়েছিলাম।’

লেখার ছবিটিও সেই মুহূর্তেরই। দেশের পক্ষে প্রথম ফিফটি করার পরপরই সাদা হেলমেট পড়া রানার মাসুম এসে আজহারকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। আজহারের চোখে-মুখে একটা তৃপ্তির ছাপ। এ দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের ‘আইকনিক’ ছবির তালিকায় এটি থাকবেই।

ফিফটি করার পরপরই নিউজিল্যান্ডের বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার আজহারকে অভিনন্দন জানাতে এগিয়ে এসেছিলেন। তবে তাঁর স্মৃতিতে বিশেষভাবে আছেন মার্টিন ক্রো, ‘মার্টিন ক্রোর খেলা সব সময়ই আমার খুব ভালো লাগত। তাঁর বিপক্ষে খেলতে নেমে অন্যরকম একটা রোমাঞ্চই কাজ করছিল। আমার ফিফটির পর তিনি এগিয়ে এলেন। বললেন, “ওয়েলডান মেট।” আজ তিনি এই দুনিয়ায় নেই। তবে তাঁর কাছ থেকে অভিনন্দন পাওয়ার মুহূর্তটি কোনো দিন ভুলব না।’
আজহারের কীর্তির মুহূর্তটিও কোনো দিন ভুলবে না বাংলাদেশের ক্রিকেট।

Related posts