November 21, 2018

উপসাগরে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি

2 April, 2016, আশরাফ হায়দার চৌধুরীঃ সিরিয়া পরিস্থিতির ওপর এখন শুধু উপসাগর নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও সমরনীতি জড়িয়ে পড়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক, ইরান যেমন এক দিকে সিরিয়ার বিষয়ে নাক গলাচ্ছে, অন্য দিকে তেমনি রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোও সিরিয়াকে নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে। বিদ্রোহী বাহিনীর দখলকৃত এলাকা রুশ বিমান হামলার সহায়তায় সিরীয় সেনাবাহিনী যদি আজ পুনরুদ্ধার করে তো পরদিন আবার তা বিদ্রোহীরা দখল করে নেয়। এমন পরিস্থিতিতে তুরস্কের আকাশে রুশ বিমান ভূপাতিত করা, তেহরান-ওয়াশিংটন সম্পর্কের উন্নতি এবং আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন- এসব কিছুর দিকেই নজর রাখছেন বিশ্লেষকেরা।

উপসাগরে নিজেদের কর্তৃত্ব হারাতে চাইছে না তুরস্ক। এ জন্য প্রয়োজনে সৌদি আরবের সাথে যৌথভাবে সিরিয়ায় আক্রমণে যেতে পারে তারা। তুর্কি সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা উত্তর সিরিয়ায় কুর্দি যোদ্ধাদের ওপর নজর রাখছে। অন্য দিকে বিমানবাহিনী তুরস্কের ঘাঁটিতে যুদ্ধবিমান নামিয়েছে। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে তাই সিরিয়ায় যৌথ আক্রমণের সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে।
এ দিকে উপসাগরে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির তৎপরতার গোপন কিছু খবরও প্রকাশ হয়ে পড়েছে। গত ডিসেম্বরে হঠাৎ করেই তুরস্ক ঘোষণা করে যে, তারা কাতারে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে যাচ্ছে। তুরস্কের এই ঘোষণায় অনেকেই অবাক হন। কেননা ১০০ বছরের মধ্যে এটাই হতে যাচ্ছে উপসাগরীয় অঞ্চলে তুরস্কের প্রথম কোনো সামরিক ঘাঁটি। এরপর গত জানুয়ারিতে তুরস্ক নতুন আরেক ঘোষণায় জানায়, তারা সোমালিয়াতেও একটি সামরিক ঘাঁটি বসাবে।
তুরস্ক ও কাতারের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও সামরিক চুক্তি নিয়ে প্রায় এক দশক ধরেই গোপন আলোচনা চলছিল। ২০০৭ সালে আঙ্কারা ও দোহা একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। পরে ২০১২ সালে তারা একটি সামরিক প্রশিক্ষণ চুক্তিতে উপনীত হয়।

প্রায় এক বছর আগে ২০১৫ সালের মার্চে তুরস্কের পার্লামেন্টে পাস হয় ‘তুর্কি-কাতার মিলিটারি কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট’। কিন্তু একটি চূড়ান্ত অবস্থায় উপনীত হওয়ার জন্য তখনো অনেক কিছু বাকি ছিল এবং সব কিছুই চলছিল অত্যন্ত গোপনে। ফ্রান্সভিত্তিক একটি গোয়েন্দা অনলাইনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের জুলাইয়ে কাতারের আমির তামিম বিন হামদ আল সানি প্রথম এই চুক্তির বিষয়টি সৌদি বাদশাহকে অবহিত করেন। চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য আদান-প্রদান করবে। প্রয়োজনে একে অপরকে সহযোগিতা করবে। এ ছাড়া প্রায় তিন হাজার তুর্কি সেনা, নৌ ও বিমান ইউনিট কাতারে স্থাপিত সামরিক ঘাঁটিতে অবস্থান করতে পারবে বলে চুক্তির একটি ধারায় উল্লেখ করা হয়। তারা সেখানে যৌথ সামরিক মহড়ায়ও অংশ নিতে পারবে বলে বলা হয়।
কাতারে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়টিকে সৌদি সরকার প্রথম থেকেই স্বাগত জানায়। ইরানের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাব ঠেকাতেই সৌদি আরব এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। রিয়াদ মনে করছে, হাতের কাছে অতিরিক্ত তিন হাজার দক্ষ বিদেশী সেনা থাকলে যেকোনো প্রয়োজনে কাজে আসতে পারে। এ ছাড়া কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানঘাঁটি, আবুধাবিতে ফরাসি নৌঘাঁটি আর বাহরাইনে ব্রিটিশ নৌঘাঁটির সাথে যদি এই অঞ্চলে তুরস্কের একটি ঘাঁটি থাকে তাহলে শক্তির একটা ভারসাম্য আসবে।

তবে তুর্কি-কাতার সামরিক সহযোগিতা চুক্তিকে সৌদি আরব স্বাগত জানালেও জিসিসিভুক্ত অন্য দেশগুলো কিন্তু বিষয়টিকে বাঁকা চোখেই দেখছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত বলছে, এই চুক্তি উপসাগরে সামরিক ভারসাম্য নষ্ট করবে। তারা আগামী জিসিসি সম্মেলনে এই চুক্তির বিরোধিতায় প্রস্তাব উপস্থাপন করবে বলে জানিয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা চুক্তিটি চূড়ান্ত করতে কয়েক দফা দোহা সফর করেছেন। চুক্তির একটি ধারায় আছে, তুরস্ক বাইরের সামরিক হুমকি থেকে কাতারকে রক্ষা করবে। বিনিময়ে কাতার তুরস্কের অর্থনীতি বিশেষ করে পর্যটন শিল্পকে চাঙা করতে সহায়তা করবে। রুশ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার পর তুরস্কের পর্যটন শিল্পে বলতে গেলে ধস নেমেছে। কেননা দেশটির পর্যটন খাতের একটি বড় আয়ের উৎস ছিল রাশিয়া। প্রতি বছর রুশ পর্যটকদের কাছ থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করত তুরস্ক। কিন্তু বিমান কাণ্ডের পর রাশিয়া তার নাগরিকদের তুরস্ক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করায় তুরস্কের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

দেখা যাচ্ছে, তুর্কি-কাতার চুক্তি একটি সামরিক চুক্তি হলেও এর সাথে অর্থনৈতিক বিষয়ও জড়িয়ে আছে। ফরাসি গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তুরস্ক ও কাতার একটি ‘ফোর্সেস অ্যাগ্রিমেন্ট’ করার জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তুরস্কের বিলকেন্ট ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইয়ুপ এরসোয় বলেন, চুক্তির সব শর্ত হয়তো জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে না। তবে আন্দাজ করা যায় দুই পক্ষই চুক্তির মাধ্যমে লাভবান হতে চাইবে। তিনি আরো বলেন, কাতারে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন হলে প্রথমেই আসে খরচ বহনের বিষয়টি। যেহেতু এই চুক্তির মাধ্যমে কাতার সামরিক দিক থেকে আর তুরস্ক অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে চাইছে আর ঘাঁটি যেহেতু কাতারের মাটিতে স্থাপিত হবে, তাই ধরে নেয়া যায় খরচের বেশির ভাগই তারা বহন করবে। তাই যদি হয়, তাহলে এটা তুরস্কের জন্য অর্থনৈতিক দিক দিয়ে মঙ্গলজনকই হবে।

মূলত চুক্তির মাধ্যমে আঙ্কারা ও দোহা পরস্পরের ঘনিষ্ঠ হলে তা হবে আশ্চর্যের। সেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্য তথা উপসাগর থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখেছিল। মিসর, লিবিয়া ও সিরিয়া ক্রাইসিসেও তারা দূরে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমাদের সাথে ইরানের সম্পর্কের উন্নতি, ইরান কর্তৃক কুর্দিদের উসকানি আর শরণার্থী সমস্যার মোকাবেলা করতে গিয়ে তুরস্ক আর নিজেদের দূরে রাখতে পারছে না। বাধ্য হয়ে তারা উপসাগরে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করছে।

এ অঞ্চলের সেনাবাহিনীর মধ্যে তুর্কি সেনাবাহিনীর আর্টিলারি বিভাগ সবচেয়ে উন্নত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বর্তমান সিরিয়া পরিস্থিতিতে শুধু আর্টিলারি বিভাগই যথেষ্ট নয়। যথাযথ বিমান সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই রুশ বিমান ভূপাতিত করার পর আঙ্কারা সিরিয়ার আকাশে নিজেদের বিমান ওড়াতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগবে। তাই তারা সৌদি আরব ও কাতারসহ কয়েকটি দেশের সাথে জোট করার সিদ্ধান্ত নেয়। আর সেটা করতে হলে সৌদি-তুর্কি জোটকে অনেক বেশি কিছু করতে হবে। তা ছাড়া এখন সিরিয়ায় বিমান চালাতে গেলে তা রুশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে চালাতে হবে। ফলে রিয়াদ হয়তো মস্কোর সাথে প্রত্যক্ষ সঙ্ঘাতে যেতে চাইবে না। একই সাথে সিরিয়ায় তুর্কি বা সৌদি যুদ্ধবিমান আমেরিকা কতটা সহ্য করবে তাও ভেবে দেখার বিষয়। একই সাথে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দু’টি পরাশক্তিকে বিরক্ত করার ঝুঁকি কাতার বা সৌদি আরব নেবে কি না তাও তুরস্ককে ভাবতে হবে।

তুরস্কের জন্য আরো উদ্বেগের বিষয় হলো সিরিয়ায় সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ। আঙ্কারা যখন শরণার্থীদের বিপুল স্রোত ঠেকানোর কাজে ব্যস্ত ঠিক তখনই সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের সেনারা আলেপ্পো পুনর্দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রুশ বিমানবাহিনীর সহায়তায় তারা লড়াইয়ে একটা ভারসাম্য নিয়ে এনেছে। এ ছাড়া বাশারের সেনারা উত্তরাঞ্চলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিজেদের অবস্থান মজবুত করেছে। এতে আঙ্কারার বিপদের আশঙ্কা বেড়েছে। তুর্কি সরকার পরিষ্কারভাবেই দেখতে পাচ্ছে তাদের দরজার সামনে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী ও রুশ সেনাদের মধ্যে ঐক্য হয়েছে এবং এর মাধ্যমে তারা লাভবান হচ্ছে। তাই নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্যই তুরস্ককে উপসাগরে মিত্র খুঁজতে হবে।

Related posts