September 18, 2018

উপবৃত্তির টাকা বিতরণে অনিয়ম, প্রতিবাদে স্কুল ঘেরাও!

396
শিপলু জামান
ঝিনাইদহ থেকেঃ
উপবৃত্তির টাকা বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ অভিভাবকদের কাছে জানানোর কারনে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের ছোট ভাটপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৩৫ জন ছাত্র-ছাত্রীকে বেত্রাঘাতে আহত করা হয়েছে। ওই বিদ্যালয়ের টিউলি ম্যাডাম নামে শিক্ষার্থীদের কাছে পরিচিত শিক্ষিকা পড়া না পারার অভিযোগে এসব ছাত্র-ছাত্রদের বেত্রাঘাত করেন। বেত দিয়ে মারপিটের সময় শিক্ষিকা ছাত্র-ছাত্রীদের ছোট লোক, ইতর, অর্থলোভী, ফকিরের বাচ্চা গালি দিয়ে তিরস্কার করে বলেন, পড়া পারিস না আবার উপবৃত্তির টাকা চাস। টাকা দিব কি তোদের চেহারা দেখে। তোদের আজ মেরেই ফেলবো নীচু জাতের বাচ্চা।

এ ঘটনায় বুধবার দুপুরে এলাকার শত শত অভিভাবক স্কুল ঘেরাও করে ওই শিক্ষিকার অপসারণসহ শিক্ষাথীদের মারপিট করার বিচার দাবি করেন। বর্তমানে শিক্ষিকা টিউলিপের মারপিটের ভয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুলে যাচ্ছে না বলে একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করেন। তবে ওই শিক্ষিকা ছাত্র-ছাত্রীদের গালি দিয়ে তিরস্কার করার কথা অস্বীকার করে বলেন, পড়া না পারার কারনে তাদের দুইটি করে বেত মেরেছি। ঘটনাটি নিয়ে এলাকাবাসী ফুঁসে উঠেছে। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ যেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে।

শিক্ষিকা টিউলির বেত্রাঘাতে যেসব ছাত্র-ছাত্রী আহত হয়েছে তারা হচ্ছে, ছোট ভাটপাড়া গ্রামের সাধন দাসের ছেলে ৫ম শ্রেণীর ছাত্র সোহাগ (১১), একই গ্রামের নারায়ন দাসের মেয়ে পিংকি দাস (৯), সন্তোষ দাসের মেয়ে ৫ম শ্রেণীর ছাত্রী বিথিকা দাস (১১), বিপেন দাসের মেয়ে ৫ম শ্রেণীর ছাত্রী ঋতু দাস (১১), হরিদাসের মেয়ে মুন্নি দাস, আনন্দ দাসের মেয়ে ৩য় শ্রেণীর ছাত্র ঋতুপর্না দাস (৯), রঞ্জন দাসের ৫ শ্রেণী পড়–য়া চেলে রনি দাস (১১), ভবেন দাসের যমজ দুই মেয়ে সততা ও সমতা, অশোক দাসের ছেলে ৩য় শ্রেণীর ছাত্র অমিত দাস (৯), সাধান দাসের ছেলে ২য় শ্রেণীর ছাত্র সজল দাস ( ৮)সহ প্রায় ৩৫ জন। এদের মধ্যে সোহাগের হাত ভেঙ্গে গেছে বলে অভিযোগ পাওযা গেছে।

সরেজমিন স্কুলে গেলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তারা তাদের সন্তানদের জামা খুলে আঘাতের ক্ষত স্থান দেখান এবং মারপিট করার বিচার দাবি করেন। ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবক শুকুর আলী, কিনা রাম দাস, সুফিয়া বেগমসহ একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করেন, তাদের সন্তানদের ১২শ টাকা করে উপবৃত্তি দেওয়ার কথা। কিন্তু কাউকে ৫০, কাউকে ১শ আবার কাউকে ৪শ বা ৮শ করে টাকা দিয়েছে। নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত ও ভাল রিজাল্ট করলেও কিনা রামের ছেলে-মেয়ে কৃষ্ণ দাস ও অর্পনা দাস দুই জনকে মাত্র ২৫০ টাকা দিয়েছে বলে তার অভিযোগ।

অভিভাবকরা আরো জানান, তাদের সন্তানদের ছবি অন্য বইতে লাগিয়ে টাকা তোলা হয়েছে। আবার অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ছবি তোলে স্কুলে দিলেও শিক্ষকরা তা নেননি। সেই ছবি ফেরত দিয়ে ছবি তোলা বাবদ তাদের কাছ থেকে ৩০ টাকা করে নেয়া হয়েছে।

কালীগঞ্জ কাঁচামাল বাজারের দিনমজুর ও ছোট ভাটপাড়া গ্রামের বাসিন্দা শুকুর আলী জানান, উপবৃত্তি টাকা বিতরনের ঘটনা জানার পর এলাকার ১শ অভিভাবকের স্বাক্ষরিত এক অভিযোগ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও শিক্ষা অফিসার বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে। এ ঘটনা জানার পর ছাত্র-ছাত্রীদের পড়া না পারার অভিযোগে মারপিট ও গালিগালাজ করে তিরস্কার করা হয়।

আমরা ওই শিক্ষিকার অপসারণসহ মারপিটের বিচার চাই।আজ বুধবার দুপুরে অভিভাবকরা স্কুল ঘেরাও করলে অভিযুক্ত শিক্ষিকা টিউলি আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়েন। তিনি কান্না জড়িত কণ্ঠে এ প্রতিবেদককে জানান, পড়া না পারার কারনে তাদের দুইটি করে বেত মেরেছি। ছাত্র-ছাত্রীদের গালিগালাজ ও তিরস্কার করার কথা তিনি অস্বীকার করেন। পড়া না পারলে ছাত্র-ছাত্রীদের বেত্রাঘাত করা যায় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি নিশ্চুত থাকেন।

এ ব্যাপারে ছোট ভাটপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছুটিতে থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে সহকারি প্রধান শিক্ষিকা নিলুফার ইয়াসমিন জানান, একজন ছাত্র বা ছাত্রী মাসে একশত করে বছরে ১২শ করে টাকা উপবৃত্তির টাকা পাবে। কিন্তু ক্লাসে ৮৫% উপস্থিতি, ৩৩% নাম্বার না থাকলে এবং একই ক্লাসে দু’বছর থাকলে সেসব ছাত্র-ছাত্রী পুরো টাকা পাবে না। এসব কারনে উপবৃত্তির টাকা বিতরণ নিয়ে সমস্যা হয়েছে। তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের মারপিটের বিষয়ে জানান, পড়া না পারার কারনে একজন শিক্ষিকা কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রীকে বেত দিয়ে একটু মেরেছেন বলে স্বীকার করেন।

উপজেলা শিক্ষা অফিসার সালমা খাতুনের সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও ফোনটি বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে কোলা ক্লাস্টারের দায়িত্বে থাকা এটিও কামরুল বাসার ওমর ফারুক জানান, উপবৃত্তি দিতে সমস্যা হয়েছে, এটার একটি অভিযোগ এসেছে। সেটি বাচাই বাছাই করে দেখা হচ্ছে। ছাত্র-ছাত্রী মারপিটের বিষয়ে কেউ কোন অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নিব।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মানোয়ার হোসেন মোল্ল্যা জানান, কেউ আমার কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়নি। মৌখিক অভিযোগ এসেছে, আমি সেটি মৌখিকভাবে ব্যবস্থা নিতে বলেছি। কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নিব।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts