November 21, 2018

রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁসের অভিযোগ: উপজাতীয় পুলিশ সদস্যদের পাহাড় থেকে সমতলে বদলীর সুপারিশ!

অনলাইন ডেস্ক রিপোর্ট: তিন পার্বত্য জেলায় কর্তব্যরত সব উপজাতি পুলিশ সদস্যদের ফের সমতলে বদলির সুপারিশ করেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এ ব্যাপারে কিছুদিন আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি গোপন প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, পার্বত্য জেলাগুলোয় কর্মরত উপজাতি পুলিশ সদস্যরা সরকারের অনেক গোপন তথ্য ফাঁস করে দিচ্ছেন। –

পার্বত্য এলাকার কিছু কুচক্রী মহলের প্রলোভন, আঞ্চলিকতা ও আত্মীয়তায় প্রভাবিত হয়ে তারা রাষ্ট্রের গোপনীয়, স্পর্শকাতর ও আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত তথ্য পাহাড়ের কিছু আঞ্চলিক সংগঠনের কাছে পাচার করছে।

এসব তথ্য ইউপিডিএফ, জেএসএস (সন্তু লারমা) ও জেএসএসের (সংস্কার) মতো আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর নেতাদের কাছে চলে যাচ্ছে। এমনকি দুষ্কৃতকারী ধরতে যেসব অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, তারও আগাম তথ্য ফাঁস করে দিচ্ছেন এসব উপজাতি পুলিশ সদস্য।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, পার্বত্য শান্তিচুক্তি অনুসারে পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনতে এবং তাদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টিতে ২০১২ সাল থেকে সমতলের কিছুসংখ্যক উপজাতি পুলিশ সদস্যকে পার্বত্যাঞ্চলে বদলি করা হয়। এ প্রক্রিয়া এখনো চলমান।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, পাহাড়ি নিবন্ধনহীন আঞ্চলিক সংগঠন কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে ঘোষিত কর্মসূচি উপলক্ষে এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে জেলা পুলিশ কর্তৃক গৃহীত নিরাপত্তা পরিকল্পনা, দিকনির্দেশনামূলক তথ্যাদি উপজাতি পুলিশ সদস্যরা আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর কাছে ফাঁস করে দিচ্ছেন। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা পুলিশের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই দুরূহ হয়ে পড়ে।

এতে জননিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ গৃহীত পদক্ষেপগুলো ফলপ্রসূ না হয়ে অনেক সময় হিতে বিপরীত হচ্ছে। হুমকির মুখে পড়ছে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। এ ছাড়া উপজাতি পুলিশ সদস্যদের মাধ্যমে তথ্য পাচার হওয়ায় বিষয়টি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার প্রতি চরম হুমকি। এ প্রেক্ষাপটে তাদের পার্বত্য এলাকায় নিয়োজিত না করে সমতলে নিয়োজিত করার সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, শান্তিচুক্তি পরবর্তী সময়ে আত্মসমর্পণকৃত সদস্যদের পুলিশে নিয়োগদানের পর মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে সমতলে বদলি করা হয়। বর্তমানে তাদের সমতল থেকে পার্বত্য এলাকায় বদলি করায় অধিকাংশই আগের সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উপজাতি পুলিশ সদস্যরা বিভাগীয় নিয়মশৃঙ্খলা যথাযথভাবে পালন করছেন না। তাদের নামে ইস্যু করা সরকারি অস্ত্র-গুলিসহ অন্যান্য মালামাল সম্পর্কেও যতœবান নয়।

বিধিমোতাবেক অর্পিত নির্দেশ ও দায়িত্ব তারা যথাযথভাবে পালন করেন না। এ কারণে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। বিভিন্ন সময় পার্বত্য অঞ্চলে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে কর্মসূচি পালনকালে পাহাড়ি সংগঠনগুলোর সদস্যরা পুলিশের সঙ্গে উচ্ছৃঙ্খল ও মারমুখী আচরণ করেন।

এ সময় কর্তব্যরত উপজাতি পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আন্তরিক না হয়ে কৌশলে অনেকটা নিষ্ক্রিয় থাকেন। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশও মানতে চান না।

প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ি জেলা সম্পর্কে বলা হয়, উপজাতীয় পুলিশ সদস্যদের পুলিশ লাইনসে সপরিবারে বসবাসের সুযোগ থাকলেও তারা সেখানে থাকেন না। থাকেন ইউপিডিএফ অধ্যুষিত এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে। সেখানে অনেকেই আত্মীয় হওয়ায় পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদান-প্রদান চলে।

প্রতিবেদনে রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টে কর্মরত নায়েক জেনাল চাকমা ও প্রেম চাকমাকে একে-৪৭ রাইফেলের ৫০০ রাউন্ড গুলিসহ গ্রেপ্তারের তথ্য তুলে ধরা হয়। যে গুলি পার্বত্য চট্টগ্রামে পার্বত্য এলাকার আঞ্চলিক সংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডারদের কাছে বিক্রি করার কথা ছিল।

এ প্রসঙ্গে উপজাতীয় নেতৃবৃন্দ বলেন, পুলিশকে পুলিশ হিসেবে দেখা উচিত। বাঙালি বা উপজাতি অথবা আদিবাসী হিসেবে নয়। এতে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, পুলিশ বাহিনীতে কে কোন জাতি-ধর্ম থেকে এসেছে, সেটার মাধ্যমে বিভাজন বা পদায়ন করা গ্রহণযোগ্য নয়।

অপরদিকে বাঙ্গালী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি-বান্দরবান এই তিনটি জেলা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম। এখানে বসবাসরত উপজাতীয়রা সম্প্রদায় ভিত্তিক প্রায় সকলেই কারো না কারো আত্মীয়।

তাই রাঙামাটির অনেকেই খাগড়াছড়িতে চাকুরিরত থাকাকালীন সময়ে সরকারি গুরুত্বপূর্ন অনেক তথ্যই রাঙামাটির আত্মীয়’র মাধ্যমে পাস করে দিচ্ছে। যাতে করে পুলিশের অনেক তথ্যই আর গোপন থাকছে না।

এছাড়াও রাঙামাটি পুলিশ বিভাগের উদ্বর্তন একজন কর্মকর্তাও স্বীকার করলেন তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার কথা। নাম প্রকাশ নকরার শর্তে তিনি জানালেন, ভাই আমি অনেক সময় নিজেই গাড়ি চালাই।

নয়তো স্পর্শকাতর অভিযানগুলোতে আমি আমার উপজাতীয় ড্রাইভারটিকে কৌশলে সরিয়ে রেখে অন্যজনকে নিয়ে যাই। কারণ আমি বেশ ক’বার লক্ষ্য করেছি যে, আমার অধীনস্থ উপজাতীয় কনষ্টেবলটি আমার সাথে থাকা কালীন সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো আসামী পক্ষের কানে আগেই পৌছে যায়। যেটি কিনা আমার সোর্স ও আমি নিজে এবং এই কনষ্টেবল ছাড়া আর কেউ-ই জানতো না। এরপর থেকে আমি সতর্ক হয়ে যাই।

অপরদিকে সরকারের কাছে বিগত কয়েক মাস আগে পাঠানো গোয়েন্দা রিপোর্ট এর ভিত্তি করে এটিকে আরো পূঙ্খানুপূঙ্খভাবে তদন্ত করে আরো বিস্তারিত পাঠাতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে সরকার মাঠে নামিয়েছে অপর একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থাকে।

সংস্থাটি বর্তমানে রাঙামাটি থেকে কতজন উপজাতীয় শান্তিচুক্তি পরবর্তী সময়ে শরনার্থী কৌটায় চাকুরি নিয়েছে এবং রাঙামাটির কি পরিমান উপজাতীয় যুবক পার্বত্য অন্য জেলা গুলোতে চাকুরিরত আছে তাদের ব্যাপারে বিস্তারিত খতিয়ে দেখে একটি প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করছে।

সংস্থাটির মাধ্যমে জানাগেছে, বিগত সময়ে বিশেষ করে পার্বত্য চুক্তির পরপরই ১৯৯৮ সালের মার্চ মাসের তিন তারিখে রাঙামাটি থেকেই পুলিশ বাহিনীতে ভর্তি হয়েছে সর্বমোট ৩৯৩জন উপজাতীয় যুবক। যাদের অধিকাংশই বর্তমানে খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে কর্মরত রয়েছে। অপরদিকে রাঙামাটির দূরবর্তী দুইটি উপজেলার বাসিন্দারা চাকুরি নেওয়ার সময়ে খাগড়াছড়ির বাসিন্দার নাগরিক সনদ দেখিয়ে বর্তমানে রাঙামাটিতেই চাকুরিরত রয়েছে এমন তথ্যও পাওয়া গেছে।

উৎসঃ Chttimes24

Related posts