November 20, 2018

উদ্ভট এক উটের পিঠে চলছে বিসিবি!


স্পোর্টস ডেস্কঃ  ‘ফারুক চাইলে চলে যাক। আমরা আটকাবো না। এখানে ঝামেলা করার কোনো দরকার নেই।’ বক্তার নাম নাজমুল হাসান পাপন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতির কথাটি ‘দম্ভোক্তি’ বলে মনে হতেই পারে। কে আসলো, কে গেল- সেসব নিয়ে খুব একটা পরোয়া করার মানুষ নন তিনি। তাইতো প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদের জন্য ফুলের তোড়া তৈরি করে রাখছেন না বিসিবি বস!

নাজমুল হাসান পাপনের এমন একচেটিয়া আধিপত্যই বিসিবিকে রীতিমতো ‘স্বৈরাচারী’ এক প্রতিষ্ঠানের পথে নিয়ে যাচ্ছে। যেখানে নিয়ম আর ঐতিহ্যের চর্চা সরিয়ে রেখে চলছে ক্ষমতার দাপট। এইতো রোববার সেই বিতর্কিত ঘটনার আরেক নাটক মঞ্চস্থ করেছেন পাপন। যা নিয়ে এখন রীতিমতো সরগরম দেশের ক্রিকেট। পৃথিবীর অন্য টেস্ট খেলুড়ে দেশে যা নেই তা-ই করে দেখালেন তিনি। বিসিবির সভায় অনুমোদন করলেন দুই স্তরের বিতর্কিত এক নির্বাচক কমিটি! মজার ব্যাপার হলো- যেখানে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ম্যানেজারকেও রাখা হয়েছে নির্বাচক কমিটিতে।

উদ্ভট এই নির্বাচক কমিটি দেখে হেসেই খুন আলী আসিফ খান। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত যিনি ছিলেন জাতীয় ক্রিকেট দলের ম্যানেজার। বুধবার বলেন, ‘দেখুন, এমন সিলেকশন প্যানেলের কথা আমি জীবনেও শুনিনি। দুই স্তরের ৬ সদস্যের নির্বাচক প্যানেলের কথা শুনে আমি রীতিমতো হেসেছি। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, ম্যানেজারও নাকি দল নির্বাচনে থাকবেন। এটা হাস্যকর ছাড়া কিছু নয়। তিনি ডিসিপ্লিন আর লজিস্টিক দিকটাই দেখবেন। এমনটাই হয়ে এসেছে। অন্য টেস্ট খেলুড়ে দেশের ম্যানেজাররাও তাই করেন।’

অবশ্য বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজন- যিনি এমন কিছু নেই যে পারেন না! তিনি বোর্ড পরিচালক, বিসিবির ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান, আবাহনীর কোচ, উঠতি তারকা ক্রিকেটারদের এজেন্ট। এমনকি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজও করেন তিনি। এবার যোগ হলো নতুন দায়িত্ব- নির্বাচক। সুজনের এমন ‘অপরিহার্যতা’ স্টেডিয়াম পাড়ায় হাস্যরসেরও জন্ম দিচ্ছে। আলী আসিফ খান বলছিলেন, ‘দেখুন সব হচ্ছে ক্ষমতার দাপট। এখানে যোগ্যতার ব্যাপারগুলো মুখ্য হয়ে উঠে আসছে না। পাওয়ার থাকলে কি-না করা যায়, সেটাই এখন দেখছি।’

আর সেই খেলা খেলতে গিয়ে দেশের ক্রিকেট এখন উল্টো পথে হাঁটছে বলেই মনে করছেন আলী আসিফ খান। আক্ষেপ নিয়ে জাতীয় দলের সাবেক এই ম্যানেজার বলছিলেন, ‘দেখুন, মাঠের নৈপুণ্য যাই হোক, সব মিলিয়ে দেশের ক্রিকেট এখন পেছন পথে হাঁটছে। আর আমি নিশ্চিত, কিছুদিন বাদেই এর প্রভাব মাঠের খেলার ওপরও পড়বে। আমাদের ক্রিকেটাররাও এই রাজনীতিতে জড়িয়ে যেতে পারেন। জাতীয় দল গঠন নিয়ে সামনে কতো যে নাটক হবে তা-ই ভাবছি।’

একইভাবে বিসিবির এমন সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেন সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক এম. এম. কায়সার। যেমনটা বলছিলেন তিনি, ‘দেখুন, এটা একেবারেই ভুল সিদ্ধান্ত। আমরা যদি লক্ষ্য করি তবে দেখবো- ফারুক আহমেদের নির্বাচক কমিটি দারুণ সফল। তারা ভালো কাজ করছিল। এ অবস্থায় ক্রিকেটের স্বার্থে তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া উচিত ছিল। যদি ধরে নিই বিসিবি তাদের কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট নয়, তাহলে তো পুরো কমিটিই বাদ করে দিতে পারতো। সেই পথে তারা না হেঁটে কৌশলে অন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একটা বিষয় পরিষ্কার, এখানে ফারুক আহমেদকে টার্গেট করা হয়েছে। তিনি চলে যেতে বাধ্য হন তেমন জটিল পথে হেঁটেছে বিসিবি।’

পুরো ব্যাপারটিতে দেশের ক্রিকেট নয়; লাভবান একজনই- তিনি খালেদ মাহমুদ সুজন। স্টেডিয়াম পাড়ায় গুঞ্জন তাকে জায়গা করে দিতেই নাকি ইতিহাসে বিরল এই দুই স্তরের নির্বাচক কমিটি অনুমোদন করেছে বিসিবি। সেই আলোচিত সাবেক ক্রিকেটারের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও সাড়া দেননি তিনি।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে এমন ক্ষমতার দাপট দেখানোটা অবশ্য বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে। তবে মাঠে মাশরাফি, সাকিব আর মুস্তাফিজদের নৈপুণ্যে তা আড়ালে থাকছে। এমন দ্বন্দ্বের চর্চাতেই বোর্ড ছেড়েছেন দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুল থেকে শুরু করে নাঈমুর রহমান দুর্জয়ও। মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে যাদের যাতায়াত তারা ভাল করেই জানেন, কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণেই বোর্ড ছাড়তে হয়েছে অভিষেক টেস্টের অধিনায়ককে। বলা হচ্ছে, ঠিক একই পথে ফারুক আহমেদকেও দরজা দেখিয়ে দিয়েছে বোর্ড।

পাপন মনে করছেন, বাংলাদেশ ক্রিকেটের আজকের এই সাফল্যের পুরো রূপকারই হলেন কোচ হাথুরুসিংহে! বোর্ড প্রধানের আশীর্বাদে তাইতো মহা ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছেন এই লঙ্কান। তার ইচ্ছের ওপর অনেকের ভাগ্য নির্ভর করছে। এমনকি এখানে মাশরাফি বিন মুর্তজার সেই ম্যাজিক নেতৃত্বের বিষয়টাও আড়ালে চলে যায়। এ কথা হয়তো তারা ভুলে যাচ্ছেন মাঠে ক্রিকেট খেলছে কিন্তু সেই ১১ ক্রিকেটারই।

দেশের ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাই বলছেন, বিসিবি সভাপতি নিজের কাজ ভুলে অনদিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। বোর্ডের প্রধান হিসেবে প্রশাসনিক কাজের দিকেই বেশি মনোযোগ থাকার কথা ছিল তার। কিন্তু তিনি দল নির্বাচন নিয়েই খুব বেশি মনোযোগী হয়ে উঠেছেন। দল নির্বাচনে পাপনের সরাসরি হস্তক্ষেপ করার ব্যাপারটি এখন ওপেন সিক্রেট। গত টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় নির্বাচকদের পাত্তা না দিয়ে কোচের সঙ্গে মিলে সেই কাজটিও দেখা গেছে!

অথচ ক্রিকেটারদের স্বার্থ রক্ষায় যে কাজ করা উচিত বোর্ডের তা করতে গিয়ে বারবারই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এই যেমন, প্রিমিয়ার লিগ শুরুর আগে ‘প্লেয়ার্স বাই চয়েজ’র নাম করে ক্রিকেটারদের গায়ে শৃঙ্খল পরিয়ে দেয়া হল। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ক্রিকেটারদের মূল্য বেঁধে দেয়ার মতো বিতর্কিত পদক্ষেপ তিনিই নিলেন। এখন এমনকি ক্লাবগুলো থেকে ক্রিকেটারদের পাওনা আদায় নিয়ে নাটকের জন্ম দিয়ে যাচ্ছে বোর্ড। তবে লিগ চলাকালীন সবচেয়ে বেশি নজরে পড়েছে আবাহনী আর তামিম ইকবালের দাদাগিরি। যাতে বোর্ডের পরোক্ষ সমর্থনের অভিযোগও উঠেছে বারবার।

তামিম আবাহনীর অধিনায়ক বলেই হয়তো আম্পায়ারকে মাঠে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেও লঘু শাস্তি পেয়েছেন। মাত্র এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে তাকে। সেইসঙ্গে জরিমানা করা হয়েছে এক লাখ টাকা। সেটিও লিগে আবাহনীর শিরোপা নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর। অথচ অভিযোগ কবুল করে নিয়েছিলেন তামিম! এমন শৃঙ্খলা ভঙ্গের শাস্তি আরো বড় হতে পারতো।

পাপনের আরেকটি মন্তব্য হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে ক্রিকেটাঙ্গনে। কিছুদিন আগে হঠাৎ করে তিনি বলেন, লিগে আম্পায়ারিং নিয়ে আইসিসির কাছে বাংলাদেশ থেকে কেউ একজন অভিযোগ করেছেন। এনিয়ে অভিযোগকারীদের দেখে নেয়ার হুমকিও ছিল তার কথায়। যদিও পরে আইসিসির মিডিয়া ম্যানেজার সামি উল হক স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘কোনো দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের আম্পায়ারিং নিয়ে মাথা ব্যথা নেই আইসিসির।’ তবে এটা ঠিক এবারের লিগের আম্পায়ারিং নিয়ে একাধিকবার প্রশ্ন উঠেছে। যেখানে পাপনের ক্লাব আবাহনীর বাড়তি সুবিধা পাওয়ার কথাটি গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।

এটা তো গেল ঘরোয়া ক্রিকেটের চালচিত্র- আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দাবি আদায়ে সফলতার রেকর্ড খুব একটা নেই বর্তমান বোর্ড সভাপতির। ভারতের মাটিতে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ নিয়ে নাটক এখনো শেষ হয়নি। কিছুদিন আগে ভারতীয় বোর্ড একমাত্র টেস্টের ভেন্যুর নাম প্রকাশ করলেও তারিখ জানায়নি। এমনকি এ বছর ম্যাচটি হবে কি না তার কোনো গ্যারান্টি নেই। ভারতের সঙ্গে টেস্ট সিরিজ ইস্যুতে বারবারই নতজানু নীতি নিয়ে হেঁটেছে এই কমিটি। একইসঙ্গে বাংলাদেশের টেস্ট কমে যাওয়ার জন্যও বিশ্লেষকরা পাপনের নেতৃত্বাধীন এই কমিটিকেই দায়ী করছেন।

দ্বি-পাক্ষিক সিরিজ খেলতে অন্য দেশের বোর্ডের সঙ্গে যেভাবে আলোচনা এগিয়ে নিতে হয়, সেটা করেনি বিসিবি। এনিয়ে বড় কোনো উদ্যোগও চোখে পড়েনি। আবার ক্রিকেট মোড়লদের রাজনীতি নিয়েও তেমন সরব হতে দেখা যায়নি পাপনকে। যেখানে বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে সেখানেও নীরব থেকেছেন তিনি।

সব মিলিয়ে দেশের ক্রিকেটে এখন অশনি এক সংকেত। বোর্ড কর্তাদের এমন ক্ষমতার দাপট ভাবিয়ে তুলছে দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের। অনেকেই বলছেন এর প্রভাব মাঠেও পড়বে। এটা ঠিক বাংলাদেশ সীমিত ওভারের ক্রিকেটে দুর্দান্ত খেলছে। কিন্তু তার অবদান ক্রিকেটারদের পাশাপাশি নির্বাচকদেরকেও দিতে হবে। এখন সেই কমিটি এলোমেলো করে যে হ-য-ব-র-ল দ্বি-স্তরের প্যানেল গড়া হলো তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই করছেন বিশ্লেষকরা।

সত্যিকার অর্থেই বিসিবি এখন উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছে। যেখানে ভবিষ্যতের বড় ছবি দেখার চেয়ে বর্তমানের ঠুনকো রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত কর্তারা। এমন চালচিত্র দেখে কবি শামসুর রাহমানের কবিতার সেই বিখ্যাত লাইন কিছুটা বদলে বলা যায়- উদ্ভট এক উটের পিঠে চলছে বিসিবি!

Related posts