November 19, 2018

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় থমথমে দেশ

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ সতর্কতার মাঝেও দুর্বৃত্তরা সক্রিয় থাকায় ব্যক্তিগত জানমালের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কিত সবাই। তাই অধিকাংশ মানুষ পেশাগত কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ধরনের কার্যক্রম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির রায় বহাল রাখার পর বুধবার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নিরাপত্তা জোরদার করা হয় দুই বিদেশি-দুই পুলিশ খুনসহ বেশ কয়েক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড, তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলা ও ঈশ্বরদীতে খ্রিস্ট ধর্মযাজক হত্যা প্রচেষ্টার ঘটনার রেশ না কাটতেই বুধবার দিনাজপুরে আরো এক ইতালির নাগরিককে গুলি এবং একই দিন জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় পুনর্বহালের ঘোষণায় দেশজুড়ে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের কোনো নাশকতার ঘটনা ঘটতে পারে এ আশঙ্কায় মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।

সারাদেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ সতর্কতার মাঝেও দুর্বৃত্তরা সক্রিয় থাকায় ব্যক্তিগত জানমালের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কিত সবাই। তাই বুধবার সকাল থেকেই অধিকাংশ মানুষ পেশাগত কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি  ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ধরনের কার্যক্রম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। এমনকি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহর ও জেলা-উপজেলার রাস্তাঘাটে যানবাহন চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। এর ওপর রাস্তার মোড়ে মোড়ে তল্লাশি চৌকি, সড়ক-মহাসড়কে র‌্যাব-পুলিশের সশস্ত্র পাহারা, গুরুত্বপূর্ণ স্পটগুলো জলকামান, রায়টকার ও টিয়ারশেল গান নিয়ে সতর্ক অবস্থান ও বর্ডার গার্ড বিজিবির টহলে সর্বত্র এখন ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে।

সকালে মহানগরীর প্রধান সড়কগুলোতে গার্মেন্টকর্মী ও জরুরি অফিসগামী লোকজন ছাড়া প্রায় কাউকেই তেমন চোখে পড়েনি। স্কুল-কলেজ ও সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খোলা থাকলেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল অতিনগণ্য। রাজধানীর রাস্তায় দিনভর ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহন চলাচল ছিল সীমিত।

মহল্লাগুলোতে ঢুকে দেখা গেছে, টি-স্টল, মুদির দোকান ও বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে উদ্বিগ্ন মানুষের জটলা। সবার মুখেই একই প্রশ্ন_ যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি হবে কবে? এ রায় কার্যকর হওয়ার পর বিএনপি-জামায়াত কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাবে? দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পর জামায়াত-শিবির যেভাবে দেশজুড়ে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল এবারো কী এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে? আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী আগের মতোই পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হবে? নাকি বিশেষ কোনো কৌশলে তারা তা সামাল দেবে এ ধরনের নানা প্রশ্ন ‘টক অব দ্য কান্ট্রিতে’ পরিণত হয়।

এদিকে রাজধানীর বাণিজ্যিক এলাকা দিলকুশা-মতিঝিল ও গুলশান-বনানীর পাশাপাশি ফকিরাপুল, রাজারবাগ, শান্তিনগর, মৌচাক, মগবাজার, কারওয়ান বাজার, বিজয়সরণি, মিরপুর, মহাখালী, কাকলী, গুলশান-১ ও ২, আবদুল্লাহপুর, নর্দ্দা, নতুনবাজার, রামপুরা, খিলগাঁও, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী ও কমলাপুরসহ ঢাকার অধিকাংশ অফিস-আদালত ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে দিনভর থমথমে পরিবেশ বিরাজ করে।

উদ্বিগ্ন জনগণের আশঙ্কা, জামায়াত-শিবিরের ক্ষুব্ধ নেতাকর্মী যে কোনো মুহূর্তে সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠতে পারে। এরই ধারাবাহিকতায় তারা বিশেষ স্থাপনা ও লোকসমাবেশে বড় ধরনের হামলাও চালাতে পারে এমন আশঙ্কাও করছেন অনেকে।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রশিবিরের একাধিক নেতা জানান, কোনো ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা তাদের নেই। তবে যে কোনো মুহূর্তে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে কেন্দ্রীয় নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে। হাইকমান্ডের গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ামাত্র কর্মসূচি বাস্তবায়নে তারা রাজপথে নেমে আসবেন। গত কয়েক সপ্তাহে তাদের হাজার পাঁচেক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার করলেও যে কোনো ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতা তাদের এখনো রয়েছে বলে দাবি করেন ওই শিবির নেতারা।

তবে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাবি, ঢাকা মহানগরসহ সারাদেশ নিরাপত্তা চাদরে ঢেকে দেয়া হয়েছে। দুর্বৃত্তরা চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারলেও বড় ধরনের কোনো নাশকতার ঘটনা ঘটাতে পারবে না।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর নয়াপল্টন ঘুরে দেখা গেছে, বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং আশপাশ এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কার্যালয়ের সামনে রাখা হয়েছে রায়টকার। কাকরাইলের নাইটিঙ্গল মোড়, বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এবং ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় থাকতে দেখা গেছে।

মগবাজারস্থ জামায়াতের প্রধান কার্যালয়সহ আশপাশের গোটা এলাকাতেও র‌্যাব-পুলিশের সশস্ত্র অবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া জামায়াত-শিবিরসহ বিরোধীদলীয় সব নেতাকর্মীর সন্দেহজনক গতিবিধি পর্যালোচনায় ঢাকা মহানগরীতে সাদা পোশাকে অর্ধশতাধিক গোয়েন্দা টিম কাজ করছে বলে ডিএমপি সূত্র নিশ্চিত করে।

বুধবার দুপুরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা ও আপরাধতত্ত্ব বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, মানবতাবিরোধী অপরাধে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ডের রায়কে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে কেউ না ঘটাতে পারে সেজন্য রাজধানীজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

এদিকে বিকাল পর্যন্ত রাজধানীর রাস্তায় স্বল্পসংখ্যক বাস-মিনিবাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করলেও সন্ধ্যার পর গোটা মহানগরী যানবাহন শূন্য হয়ে পড়ে। রাত ৭টার পর শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতেও জনমানবের উপস্থিতিও ছিল একেবারে নগণ্য।

মতিঝিল এলাকার বেশ কয়েকজন পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উদ্বিগ্ন মানুষ দুপুরের পরপরই কর্মস্থল ছেড়ে বাসাবাড়ির দিকে পা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে যারা ব্যক্তিগত যানবাহন নিয়ে কর্মক্ষেত্রে এসেছেন তারা জামায়াতের হরতাল ঘোষণার পরই ঘরমুখো হয়েছেন।

অগ্রণী ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুল আহাদ বলেন, প্রতিবার হরতালের আগের দিন সন্ধ্যায় বিভিন্ন স্থানে যানবাহন ভাঙচুর ও অগি্নসংযোগসহ নানা ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটে। তাই দুপুরের পরপরই কাজকর্ম গুটিয়ে অনেকেই বাসায় ফিরে গেছেন। ব্যাংকপাড়ায় অন্য যে কোনো দিনের তুলনায় আর্থিক লেনদেনও ছিল অনেক কম।

রাজধানীর মৌচাক, বসুন্ধরা সিটি, ইস্টার্ন প্লাজা, ইস্টার্ন মলি্লকা, ধানমণ্ডি হকার্স মার্কেট, রাপা প্লাজাসহ বিভিন্ন বিপণিবিতান ও শপিংমলের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতির খবর পাওয়া গেছে। তারা জানান, সকাল থেকে বেচাকেনা স্বাভাবিক থাকলেও দুপুরে সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের রায় ঘোষণার পর পরই হঠাৎই মার্কেট থেকে ক্রেতা সাধারণ উধাও হয়ে যায়। সন্ধ্যার পর অধিকাংশ মার্কেটেই খা খা অবস্থা বিরাজ করে।

এদিকে অজানা আতঙ্কে দুপুরের পর ঢাকায় দূরপাল্লার বাসও তেমন আসেনি। ফলে নগরীতে বহিরাগতের সংখ্যা ছিল যে কোনো দিনের তুলনায় অনেক কম। তবে বিএনপির নেতারা বলছেন, নাশকতার আতঙ্কে নয়, গণগ্রেপ্তারের ভয়ে মানুষ রাস্তায় নামেনি। বহিরাগত কাউকে কোনো ধরনের সন্দেহ হলেই তাকে বাস-লঞ্চ টার্মিনাল ও রেলস্টেশনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা।

অন্যদিকে বুধবার সকাল থেকেই রাজধানীর আবাসিক হোটেলগুলোতে পরিচিতজন ছাড়া কাউকে সিটভাড়া দেয়া হয়নি। ফলে ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় আসা লোকজন হোটেলে উঠতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে। এদের মধ্যে যারা কোনোভাবে পরিচয় দিয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করতে পেরেছেন তাদের কোনো রকমে ঠাঁই মিললেও বাকিদের শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাসাবাড়িকে মাথা গুঁজতে হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য এসে হোটেলে ঠাঁই না পেয়ে কেউ কেউ বাড়ি ফিরে গেছেন।

উদ্বেগ ও আতঙ্কের প্রভাব শুধু রাস্তা-ঘাটেই নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প কারখানাতেও পড়েছে সমানতালে। মালিবাগের বেশ কয়েকটি গার্মেন্টের শ্রমিকরা জানান, ফিরতি পথে নাশকতার মুখে পড়ার আশঙ্কায় অনেকেই ওভারটাইম ডিউটি করতে রাজি হয়নি। ফলে কর্তৃপক্ষ বিকালের পরপরই কাজ গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।

অন্যদিকে হরতাল পূর্ববর্তী গণগ্রেপ্তারের শিকার হওয়ার ভয়ে গার্মেন্টসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানায় শ্রমিক-কর্মকর্তাদের অনেকেই কর্মস্থলে যোগ দেয়নি। ফলে প্রায় প্রতিটি কারখানাতেই উৎপাদন ঘাটতি হয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।
উৎসঃ   যা.যা.দি.
দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts