September 21, 2018

ঈদুল ফিতর ও বিষাদময় পৃথিবী

এবিএম সালেহ উদ্দীন
কীভাবে কেটে যায় সময়। সময় তার গতিতেই চলে। সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। পৃথিবীতে অনেক কিছুই ফিরে পাওয়া যায়। কিন্তু সময়কে ফিরে পাওয়া যায় না।  অর্থ্যাৎ যে সময় হারিয়ে যায় সে চিরকালের জন্যই হারিয়ে যায়। সময়ের সদ্ব্যবহার করা প্রত্যেকের জন্যেই জরূরি।  এইতো মনে হলো রোজা সেদিন এসেছিল এবং কিভাবে যেন দ্রুত চলে গেলো। রোজার পর ঈদ এলো এবং  ব্যাপক ধুমধামের মধ্যে তাও চলে গেলো। কিন্তু আমাদের পরিবর্তন কতটুকু হলো। অর্থ্যাৎ আত্মার শুদ্ধি,মনন-চেতনাগত আত্মোপলব্ধি কতটুকু ঘটলো। আমাদের চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই চিরায়ত আহবান “ ও মন রমজানেরই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/ তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানি তাগিদ”। ঈদুল ফিতরের সময় এ গানটির সুর-ধ্বনিতে সকল মিডিয়াসহ সর্বত্র ঝলসে ওঠে।

কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সামাজিক পর্যায়ের কোথাও কি এর প্রতিফলন ঘটছে ? ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে সামাজিক, অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সবইতো আগের মতো চলছে। পরিবর্তন ঘটেছে?  এক কথায় বলতে গেলে না। খুউব একটা না।
বাস্তবতার নিষ্ঠুর আঘাতে মানববিধ্বংসের উন্মাদনায় রক্তাক্ত মানুষের পৃথিবী। বিশেষ করে বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের অবস্থা বড়ই করুণ। আর্থ-সামাজিক আর আর্ত-মানবতার এক করুণ ও পীড়াদায়ক অবস্থা ইসলামী দুনিয়ায়।  ফিলিস্তিনে সভ্যতার করুণ বিপর্যয় ঘটে চলেছে। এমন একটি দিন, মাস কিংবা বছর যায় না ফিলিস্তিনে ইসরাইল কর্তৃক নিপীড়ন হয় না। মুসলমানদের এমন কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আর পাশবিকতার শিকার সংশ্লিষ্ঠ দেশের মানুষ। সভ্যতার উপর রাষ্ট্রপুঞ্জের সৈরতন্ত্রী এমন আঘাত এর আগেও ছিল।
গত বছর পবিত্র রোজার মাসে এরকম অনবরত অত্যাচার,নির্যাতন,নির্মম-নৃসংশ হত্যাযজ্ঞ আর রাষ্ট্রীয় বর্বরতা সবকিছুকেই হার মানিয়েছে। বিশেস করে পবিত্র রমযান মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ইসরাইলী দস্যু বাহিনী  গাজায় উপর্যুপরি বোমা হামলা এবং স্থল বাহিনীর ট্যাংক হামলার মাধ্যমে ফিলিস্তিনীদের ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। নিরস্ত্র মানুষের উপর বোমা হামলা চালিয়ে শত শত মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে চলেছে। হাজার হাজার মানুষ আহত হচ্ছে। ফিলিস্তিনের বৃদ্ধ,নারী ও শিশুদের নির্বির্চারে হত্যা করা হচ্ছে। নারী,শিশু ও বৃদ্ধ মানুষের লাশের উপর দিয়ে ইসরাইলী দস্যুদের বোমা হালা,ট্যাংক আর বুলডোজারের আঘাতে নিরব নিস্তব্ধ হয়ে গেছে পৃথিবী। ইসরাইলের এবারের মানব বিধ্বংসী হামলা এ তাদের ইতিপূর্বেকার সকল বর্বরতাতে হার মানিয়েছে। পৃথিবীর সকল মানুষ এই নৃশংস হত্যাকান্ডের নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে নির্মম হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করবার দাবী জানচ্ছে। ইসরাইলী বর্বতার নিন্দা জানিয়ে সারা দুনিয়ায় মিছিলর,মিটিং আর বিক্ষোভ হচ্ছে। জাতিসংঘসহ সকলের দাবী ইসরাইলকে অবিলম্বে ফিলিস্তিনে আগ্রাসনমূলক যুদ্ধ বন্ধ করতে। কিন্তু ইসরাইল কোন কর্ণপাত করছে না। মানবতার দূর্ভাগ্য যে, ইসরাইলের মানবতা বিরোধী আগ্রাসন এবং বর্বর হত্যাকান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রসহ কেউ কেউ নিরব সমর্থন দিচ্ছে।  ইসরাইলের মানববিধ্বংসী বর্বোরচিত বোমা হমলাকে সমর্থন দেয়া অর্থ মানবতার বিরুদ্ধেই নিজেকে সম্পৃক্ত করা।এটা সভ্যতার নির্মম পরিহাস।  মানবতার জন্য ইহা দু:খজনক,নিন্দনীয় এবং লজ্জাষ্কর।

ইসরাইলের অবৈধ রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকে দেখা গেছে যে, তারা পৃথিবীর কারো কথার তোয়াক্কা করে না। দুনিয়ার মানবতাবাদী মানুষকে সন্মান জানায় না। দুনিয়ার কোন ধর্মমত ও পথের মানুষকে শ্রদ্ধা করে না। পৃাথবীর সকল ধর্ম ও মতের মানুষ মুসলমানদের পবিত্র রোজার মাসটিকে সন্মান করেন এবং শ্রদ্ধা করেন। একমাত্র ব্যতিক্রম ইসরাইল। এমন ধৃষ্টতা আর অসভ্যতা পৃথিবীর আর কোন জাতি করে নি। ইসরাইলী শাসকবর্গ ফিলিস্তেনের অসহায় মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং তাদের নিজস্ব ভিটা-বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে বর্তনানে যে ভয়ংকর অপরাধ করেছে। তার বিচার হওয়া দরকার।

কী পরিমান জান-মালের ক্ষতি হচ্ছে। অসহায় ফিলিস্তিনী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কোন বিকল্প নেই।

এ মুহুর্তে ফিলিস্তিনের অসহাস মানুষের সাহার্যার্থ্যে সকল মানবতাকামী মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।

স্বজন হারা আর্তমানবতার শোকে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে হবে।

ক্ষমতাসীন সৈরশাসকের অত্যাচার,নিপীড়ন আর গণ মানুষের উপর দমননীতির ফলে যেকোন দেশে সন্ত্রাস বেগবান হয় এবং নানা রকম অপরাধ প্রবণতার বৃদ্ধি ঘটে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের সুযোগে সন্ত্রাস আর মানববিধ্বংসী অপরাধ প্রবণতা  ছেঁয়ে যায় দেশময়। বিগত দিন গুলোর মতো মুসলমানদের সবচেয়ে তাৎপর্যময় পবিত্র রমযান মাসেও সিরিয়ায় সরকারি সৈরাচারের ধ্বংসলীলা। যেখানে নৃসংশভাবে নির্বিচারে মানুষ হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে বেপরোয়ভাবে। অতএব সেদেশের গণমানুষের রোজাব্রত পালন আর পবিত্র ঈদুল ফিতর কীভাবে পালন করা হয়েছে(!) তা সহজেই অনুমেয়।

আরব বিশ্বে ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ কয়েকটি দেশের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে ভয়াবহ বর্বতা চলছে সিরিয়ায়। সেখানকার সিংহশাবক এক উন্মাদ বর্বর শাসকের পাশবিকতায় সমগ্র পৃথিবীর বর্বতাকে হার মানিয়ে দিয়েছে। এমনকি ফিলিস্তিনে এ যাবতকালে যে সব মানববিধ্বংসী বর্বরতা চলেছে তার চেয়েও বেশি ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে চলেছে সিরিয়ার সৈরাচারি শাসকের অত্যাচার ও নির্যাতন। সেখানে সাধারণ মানুষের ঘর-বাড়ি ধুলিসাৎ হচ্ছে। হাজার হাজার দালান-কোঠা  ধ্বংস এবং প্রতিনিয়ত লাখ লাখ মানুষ দেশ ছাড়া হয়ে দূরস্থিত শরণার্থী শিবির আশ্রয় নিচ্ছে এবং মানবেতর জীবন যাপন করছে। প্রতিনিয়ত গণহত্যার শিকারে মর্মান্তিকভাবে মারা যাচ্ছে নারী,শিশুসহ সর্বস্তরের মানুষ।

আরব বিশ্বের আর একটি ঐতিহ্যবাহি দেশ হচ্ছে মিশর। হাজার হাজার বছরের ইতিহাসখ্যাত পৃথিবীর এই প্রাচীনতম দেশটির অবস্থা বর্তমানে এক ভয়াবহ আঁকার ধারণ করেছে। মিশরের সৈরাচারি সামরিক জান্তা সেদেশের নির্বাচিত সরকারকে বন্দুকের নলের মাথায় উৎখাত করেছে। ২০১১ সালের প্রারম্ভে  বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী মিশরে এক গণ অভ্যুথানে সেদেশের ভয়ংকর এক স্বৈরশাসক এবং ডিক্টেটর হোসনি মোবারকের পতন ঘটে। পরবর্তীতে সর্ব মহলে সমাদৃত  একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সাধারণ নির্বাচনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে ড, মুহাম্মদ মুরসি পাঁচ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাসিত হন।

পৃথিবীর সকল দেশ এবং সর্ব মহলে মিশরের পরিবর্তন এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার প্রচলন বেশ প্রশংসিত হয়। কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই ব্রাদারহুডের সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জনকারী মুরসি সরকারকে মিশরের সামরিক জান্তা জোর পূর্বক উৎখাত করে। পবিত্র রোজার মাস এবং পবিত্র ঈদের মধ্যেও সেদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ক্ষোভে,দু:খে প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসে। এবারের রোজার মাসে মিশরের সামরিক জান্তা মুরসী উধখাতের পূর্তি উদযাপন করেছে।

সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে তারা বিক্ষোভ মিছিল সহ লক্ষ লক্ষ মানুষ রাজপথ, বিশ্ব বিদ্যালয় ক্যাম্পাস, বিভিন্ন গণ সমাবেশস্থল সমূহে অবস্থান নেয়। মিশরের গণবিক্ষোভকে  দমনের উদ্দেশ্যে সামরিক বাহিনী পবিত্র রোজার মাসে নির্বিচার গুলি চালিয়ে শত শত নামাজরত মুসুল্লিদের নৃশংসভাবে হত্যা করে।

বিচারের নামে মিশরের বর্তমান সৈর শাসকের বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি নির্মম অত্যাচার চালিয়ে বর্বরবার চরম সীমায় পৌঁছে দিয়েছ। কিছুদিন আগে একসাথে কয়েক’শ রাজবন্দীকে নৃশংসভাবে ফাঁসি দিয়ে সভ্যতার বিপক্ষে এক বিষাদময় কলংক সৃষ্টি করেছে। গত বছর রোজার পূর্ব থেকেই  ক্ষমতাচ্যুত মুরসি সরকারকে মিশরের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে সমগ্র মিশরের বিশেষ বিশেষ সুবিখ্যাত স্কোয়ারগুলোতে লাখো জনতা অবস্থান করছে। কারো জানা নেই সেখানকার জনগণের ভাগ্যে কি আছে।

হয়ত: সেদেশের প্যাসিবাদী সামরিক জান্তা সাধারণ মানুষের কন্ঠরোধের জন্যে আরো ভয়ংকরভাবে নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিবে। যাতে প্রচুর জীবনপাতের আশঙ্কা আছে। এরই মধ্যে শতাব্দীর ভয়াবহতম গণহত্যা চালিয়েছে মিশরের সামরিক জান্তা। মিশরের গণজাগরণকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য জনসমাবেশস্থল বিভিন্ন স্কোয়ার, রাজপথ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মসজিদে সেদেশের সেনা বাহিনীর পৈশাচিক হামলায় কয়েক হাজার নিরস্ত্র মানুষ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।
যুগ যুগ ধরে মিশরের রাষ্ট্র ক্ষমতায় ডিক্টেটরশীপ চেপেছিল এবং যার নেপথ্যে প্রকারান্তরে ক্ষমতায় থাকে সেদেশের মিলিটারি বাহিনী। প্রায় বিগত শতাব্দীকাল ধরেই মিশরে গণমানুষের কন্ঠরোধ আর অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় সরকার পরিচালিত হয়ে আসছিল। ২০১১ সালের গণজাগরণ এবং গণঅভ্যুখানে স্বৈরাচারের পতন ঘটলেও সেদেশের পেশীশক্তির মূলৎপাটন ঘটেনি। আর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ড,মুরসি সরকার চেয়েছিল কিছু সাংবিধানিক আইন-কানুনের মাধ্যমে জনকল্যাণ মূলক ব্যবস্থাপনা চালু করতে। এতে মিশরের শত বছরের পেশীশক্তির দাপট কিছুটা হলেও লাঘব হতো এবং জনজীবনে শান্তি ও স্বস্তির পথ অবারিত হতো। কিন্তু মিশরীয় সামরিক স্বৈরতন্ত্র তা করতে দিল না। সেখানে এখন গৃহ যুদ্ধ লেগে আশঙ্কা রয়েছে।

পবিত্র রোজার মাস কিংবা ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখেও মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশে মানব বিধ্বংসী হামলা এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ থাকে নি। বরং কোন কোন দেশে তুলনা মূলকভাবে আগের চেয়েও বেশি ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। যেমন পাকিস্তানে মার্কিন সৈন্যদের তথাকথিত ড্রোন হামলায় প্রচুর লোকের প্রাণহানি এবং বহু ঘর-বাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে। এছাড়া আত্মঘাতি বোমায় ঈদেরআগের ও পরে অনেক লোকের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে। পাকিস্তানের সরকারি পুলিশ বাহিনীসহ অনেক সাধারণ মানুষ মারা গেছে। একইভাবে আফগানিস্তানেও প্রতিনিয়ত মার্কিনী হামলা এবং তালিবানদের আত্মঘাতি হামলায় প্রচুর লোক মারা যাচ্ছে। ইরাকে উপর্যুপরি বোমা হালায় বহু নিরীহ লোকসহ অগনিত ঘর-বাড়ি যান-বাহনসহ প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে বহু হতাহত হয়েছে। আফ্রিকার কয়েকটি দেশের প্রচুর প্রাণহানি ঘটেছে এবং  এখনো ঘটে চলেছে। ইয়ামেন,লিবিয়া,আলজেরিয়া, তিউনেসিয়া

লেবানন, ফিলিস্তিন সুদান,সোমালিয়া এবং সর্বোপরি সিরিয়ায় গণহত্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এসব দেশের মধ্যে একমাত্র সুদানে রাষ্ট্রীয়-রাজনৈতিক হত্যাকান্ড ছাড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বেশ কিছু লোকের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে। সোদী আরব সরাসরি ইয়েমেনের পুরো দেশের উপর ব্যাপক বোমা বর্ষণ চলিয়ে সেদেশের হাজার হাজার মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। এখন সে দেশটি একটি মৃত্যু উপতক্যা। বাকি দেশগুলোতে মানুষ মরছে রাষ্ট্রীয় স্বৈরতন্ত্রিক পাশবিকতা ও বর্বরতায়।

মুসলিম দেশের বাইরে বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ বার্মায় রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর বরাবরের মতো নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। পবিত্র রোজার মাসেও বার্মার স্বৈরাচারি সরকারের মুসলিম বিধ্বংসী কার্যক্রমে সেদেশের বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা সরকারি গুন্ডা-পান্ডাদের নাশকতামূলক অপতৎপরতা সমানভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা মুসলিমদের হাজার বছরের স্মৃতি চিহ্ন সমূহ ধ্বংস করে দিচ্ছে। প্রতিনিয়ত রোহিঙ্গাদের ভিটে-বাড়ি থেকে নির্দয় ও নির্মমভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। নারী,শিশু,আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাসহ সর্বস্তরের রোহিঙ্গা মুসলিমদের করুণ চিত্র একটি নিত্যকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরকম ফিলিপাইন কিংবা  অন্য কোন অমুসলিম দেশেও বিচ্ছিন্নভাবে মুসলমানদের উপর বর্ণবাদি হামলা কিংবা রাষ্ট্রীয় ও সন্ত্রাসী হামলার শিকার হলেও পবিত্র রোজার মাস এবং ঈদের আগেও পরে বিভিন্ন মুসলিম দেশে সংশ্লিষ্ট দেশ সমূহের জনসাধারণের জান-মালের যে পরিমান ক্ষতি হয়েছে(!) সেরকম ক্ষতি অন্য কোথাও ঘটেনি।

সমগ্র পৃথিবীর অন্য সব দেশ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে এবার নজর দেয়া যাক আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের প্রতি। এক কথায় বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা ভাল নেই। বাংলাদেশে এখন রাজনৈতিক অস্থিরতার এক চরমতম ক্রান্তিকাল। বর্তমান সরকারের অদূরদর্শী নীতির ফলেই রাষ্ট্রীয় অপশাসন ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের কোপানলে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায আসার পর কতিপয় মিমাংসিত আর অমিমাংসিত স্পর্শকাতর বিষয়কে টেনে এনে সমগ্র দেশময় এক চরম অস্বস্তিকর এবং অরাজকতার সৃষ্টি করা হয়েছে। দেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচারের নামে কতিপয় চিহ্নিত লোকের জন্য সাজানো বিচারের ব্যবস্থা করলেও সরকারের ভিতর ও বাহিরের অগনিত রাজাকার,দুর্নীতিবাজ,সুবিধাবাদী সন্ত্রাসীদের বিচার কিংবা শাস্তির ব্যাবস্থা না করে নামকা ওস্তে কতিপয় লোকদের বিচার করতে গিয়েই বর্তমানে সরকারের এখন লেজে-গোবরে অবস্থা। সরকার নিজস্ব সুবিধাবোধ আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করে নেবার এক ঘৃণাত্মক কার্যক্রমে লিপ্ত রয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে গলাটিপে হত্যা করার নীল-নক্সা বাস্তবায়নে অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে।
গত বছর বাংলাদেশে যে পরিমাণ জান-মালের ক্ষতি হয়েছে, তা নির্ণয় করা অসম্ভব। তবে শিশু ও নারী নির্যাতনসহ অনেক অমানবিক কর্ম-কান্ড ঘটে চলছে অহরহ। কী নিদারুণ অবক্ষয়ের কারণে রাজন, রাকীব, সাঈদসহ শিশুরা পৈশাচিকতার শিকার হয়ে আর্ত-চিৎকার করতে করতে মর্মন্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করে। নারী শিশু ছাড়াও বর্বতা ও পৈশাচিকতায় সোহাগী জাহান তনুর মতো মেধাবী কলেজ ছাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু বরণ করে। কোন বিচার নেই। এরই মধ্যে প্রশানিক কর্মকর্তাসহ কত পরিবারের মানুষ হত্যাকান্ডের শিকার হয়ে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করে। এত হত্যাকান্ড ও ধ্বংসলীলার মধ্যে ঈদ কিভাবে পালিত হয়।
বর্তমানে দেশে জনসাধারণের জীবনের নিরাপত্তা নেই। ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দাভাব এবং দেশের অর্থনীতির  চাকা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

দেশের আর্থ-সামাজিক,রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়েছে এবং দেশের মেরুদন্ড ভেঙ্গে পড়েছে। তবুও অর্থমন্ত্রী উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেছে যে, এবারের বাজেট ছিল তার সেরা বাজেট। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েক মিলিয়ন টাকা ডাকাতি হয়ে গেছে । এখন পর্যন্ত সুষ্ঠ তদন্ত হয় নি। এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে মানুষ শান্তিতে আছে;স্বস্তিকর অবস্থানে আছে। সর্বত্র ত্রাহি ত্রাহি ভাব। গণমানুষের ঘুম-নিদ্রা হারাম হয়ে গেছে । কারণ দেশের আইন শৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। অন্যমতের রাজনীতিকে দমন করবার জন্যে সরকার আগেকার স্বৈরাচারি কায়দায় শোষণের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্বকরণ এবং গণমাধ্যমের উপর সরকারের পেশী শক্তির নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গিয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দল সমূহের নেতৃবৃন্দ এবং কর্মীদের প্রতি অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে। মিথ্যা ও সাজানো মামলার ভাড়ে সমগ্র দেশময় এক চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজিত। দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের কোপানলে পড়ে গেছে বাংলাদেশ। সরকারের ভেতরকার মন্ত্রী,এমপি এবং  দলীয় লোকদের দুর্নীতিতে সমগ্র দেশময় এখন লুটেরাদের দাপট। শহর,নগর-বন্দর থেকে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত সর্বত্র সরকার দলীয় লুটেরাদের দৌড়াত্ব। এভাবেই কেটে যাচ্ছে বর্তমান সরকারের সময়কাল ।
এবারের রোজার মাসটিও বাংলাদেশে কেটেছে চরম উৎক›ঠা আর ভয়ভীতির মধ্য দিয়ে।
ইসলামের সর্ব প্রধান তাৎপর্যময় পবিত্র রমযানের রোজা পালন ছাড়াও নির্বিঘœ এবাদত-বন্দেগীতে ব্যত্যয় ঘটেছে দেশের অধিকাংশ শহর-বন্দর ও প্রত্যন্তা লে। জঙ্গী দমন অভিযানের নামে হাজার হাজার মানুষকে গণ গ্রফতার, খুন ইত্যকার পরিস্থিতিতে সমগ্র বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম রোজার মাসে হরতালসহ নানা রকম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে। সরকারের কঠোর দমননীতির আওতায় দেশের একটি রজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণার প্রেক্ষিতে আহুত হরতালে জনজীবনের চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে বাজার-ঘাট করতে পারেনি। ধর্ম পালন তথা উপাসনা করতে পারে নি। আ তা ছাড়া ধর্মীয় সেক্টর গুলোতে সরকারের নির্লজ্ব গোয়েন্দাগিরি ধরপাকর এবাদত-বন্দেগীতে যথেষ্ট বিঘ্ন ঘটেছে। রোজার শেষে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন হয়েছে উৎকন্ঠার মধ্যদিয়ে। ধর্মীয় আলেম-উলামাদের মাঝে অনৈক্য সৃষ্টির অপপ্রয়াস ঘটেছে।

কতিপয় সরকারি মৌলভি-মাওলানাদের দ্বারা বিভেদ সৃষ্টি ছাড়াও এবার অনাকাঙ্খিতভাবে বাংলাদেশের কিছু অ লে প্রকৃত ঈদুল ফিতরের আগের দিন ঈদ উদযাপন হয়েছে। এত একটি দেশের সরকার ব্যবস্থাপনাকে অসন্মান করা হয়েছে এবং সাধারণ্যে একটা বিভেদ সৃষ্টি এবং বিশৃঙ্খলার ক্ষেত্র তৈরি হরা হয়েছে। দেশের এক শ্রেণীর অনবিজ্ঞ মৌলভী-মাওলানাদের খামখেয়ালিপনার ফলে বাংলাদেশে এবার দুই দিন ঈদ করবার একটা নিন্দনীয় নজির স্থাপন করা হলো।

পবিত্র রোজার মাসে বাংলাদেশে জঙ্গী হামলায় গুলশানের একটি হোটেলে বেশ কয়েকজন বিদেশীসহ নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই নিরীহ পর্যটকদের উপর এমন বর্বরতম পৈশাচিকতা এর আগে হয়নি। সেই সাথে দেশের আইন শৃংখলা রক্ষাবাহিনীসহ আর কিছু রোক মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন। মানবতার দুশমন সেইসব সন্ত্রাসীদের প্রতি ঘৃণা,ক্ষোভ ও নিন্দা জানানোর ভাষা নেই।

প্রকাশ থাকে যে, ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্র, প্যারিস,ব্রাসেলস, পাকিস্তান,ইস্তাম্বুলসহ কয়েকটি দেশে ইতিহাসের বর্বরতম সন্ত্রাসী হামলায় অনেক নিরীহ মানুষের উপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে।

বাংলাদেশের সরকারি নির্যাতন,রাজনৈতিক অস্থিরতা,সন্ত্রাস-সহিংসতা আর নৈরাজ্য ছাড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যান-বাহনের নানাবিধ দুর্ঘটনায় দেশের বহু লোকের প্রাণহানি ঘটেছে।

রোজার মাসে যেনো এসব দুর্ঘটনার আরো ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটেছে। ঈদের আগের বাড়ি ফেরার পথে অসংখ্য মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানির ফলে খুশির ঈদের বদলে সমগ্র দেশে এক হৃদয়স্পর্শী  বিষাদের ছায়া নেমে আসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনে। এছাড়া বিভিন্ন কারাগারে বন্দী মানুষের স্বজনের মাঝে কোন ঈদ ছিল না।

এক বছর আগে সবচেয়ে মর্মন্তদ ও হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা আর বিষাদময় ছিল দূরস্থিত ঢাকার সাভারের ট্রাজেডি। রানা প্লাজা নামে একটি অবৈধ নয়তলা বিল্ডিং এর ধ্বংসস্তুপের সাথে বিলীন হয়ে যাওয়া গার্মেন্ট্স কর্মচারিদের করুণ পরিণতিতে ক্ষতিগ্রস্তদের জীবনে ঈদ যেনো মহা বিষাদের চিহ্ন এঁকে দিলো। যারা চিরকালের তরে হারিয়ে গেছে আর যারা চিরদিনের জন্য পঙ্গু (!) তারা এবং  তাদের স্বজনদের জীবনে ঈদ,খুশি কিংবা আনন্দ কিভাবে আসবে। রানা প্লাজা ছাড়াও অন্যান্য শিল্প-কারখানায় দুর্ঘটনার শিকার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের বেতন-ভাতা আর ক্ষতি পুরণ কোনটাই তাদের জীবনে আসে নি। শুধু রানা প্লাজা নয় বাংলাদেশের শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আর ঈদ বোনাসের দাবীতে নিয়মিত বিক্ষোভ মিছিল হচ্ছে।

ঈদের আনন্দের জন্য তারা তাদের ন্যায্য ভাতা প্রাপ্তির জন্যে মিছিল মিটিং করছে। নিরীহ শ্রমিকদের পাওনা না দিয়ে বরং সরকারের পুলিশ বাহিনীর অত্যাচার গোটা পরিস্থিতিকে আরও বিষাদময় করে তুলেছে। ফলে এমন দু:খ-কষ্ট আর বেদনার মধ্যে দিয়ে আনন্দের পরিবর্তে দূর্বিসহ জীবনগাঁথাই ফুটে ওঠে আমাদের রাষ্ট,সমাজ আর আর্থ-সামাজিক জীবনে। শান্তির বিপরিতে অশান্তি আর আনন্দের বদলে দু:খ-কষ্ট আর শোকগাঁথা বেদনাই যেনো আমাদের জনজীবনের নিত্য সঙ্গী।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।

Related posts