November 18, 2018

ইসি ও সরকার ফের একতরফা নির্বাচনের দিকে এগুচ্ছে : রিজভী

Captureঢাকা::

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সরকারের যৌথ প্রযোজনায় একতরফা ও নীলনকশার নির্বাচনের দিকে ধীরে ধীরে এগুচ্ছে তারা, এটি স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। তবে তিনি সরকারকে আবারো একটি নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য পদক্ষেপ নেয়ার আহবান জানান।

আজ শুক্রবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব বলেন। নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলন হয়।

‘বিএনপি নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে, অর্বাচিনের মতো কথা বলছে বিএনপি নেতারা’- আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এমন মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় রুহুল কবির রিজভী বলেন, সিইসি জনগণের কাছে এমনিতেই পূর্ব থেকেই একজন বিতর্কিত ব্যক্তি। চাকারজীবনে কুমিল্লার ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সরকারি আইন ভেঙ্গে বর্তমান সিইসি ‘জনতার মঞ্চে’ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিইসি তার নিজ এলাকা পটুয়াখালী-বাউফলে আওয়ামী লীগের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। চাকরিজীবনে বর্তমান সিইসির দায়িত্বশীল কোনো বড় পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা না থাকলেও আওয়ামী লীগ যে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নুরুল হুদা সাহেবকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে, এটি জনগণের কাছে পরিষ্কার। সম্প্রতি সিইসির বিভিন্ন বক্তব্যে এটি আরো সুস্পষ্ট হয়েছে। সিইসি হিসেবে যোগদানের পর তিনি বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। নির্বাচন কমিশনে পদোন্নতি ও রদবদলে সিইসি একক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন- যা সম্পূর্ণরূপে নির্বাচনী আইন বহির্ভূত। এদিকে গতকাল নির্বাচন কমিশনে আওয়ামী লীগের এক ঘনিষ্ঠ আমলাকে ভারপ্রাপ্ত সচিব নিয়োগ দিয়েছে সরকার। সুতরাং ইসি ও সরকারের যৌথ প্রযোজনায় একতরফা ও নীলনকশার নির্বাচনের দিকে ধীরে ধীরে এগুচ্ছে তারা, এটি স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।

রিজভী বলেন, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী-এমপি ও আওয়ামী নেতারা সরকারী ব্যয়ে ইতোমধ্যেই নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন, যা সম্পূর্ণরূপে নির্বাচনী আইন পরিপন্থী। দেশের ভোটারদের ভোটাধিকার যেহেতু থাকবে না সেহেতু ক্ষমতাসীনরা আগামী নির্বাচন নিয়ে অনাচারে লিপ্ত। সেইজন্য নির্বাচনী নিয়ম-কানুন মেনে চলা তাদের ধর্তব্যে পড়ে না। অন্যদিকে বিএনপিসহ বিরোধী দলের স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকান্ডেও বাধা দিচ্ছে সরকার। বহিরাঙ্গণের সভা করা দূরে থাক বিএনপির ঘরোয়া সভাতেও পুলিশ ও সরকারের দলীয় সন্ত্রাসীরা আক্রমণ চালাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত বুধবার কুষ্টিয়ার মিরপুরে বিএনপির মিটিংয়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। সেখানে বিএনপির সদস্য নবায়ন ও নতুন সদস্য সংগ্রহ অনুষ্ঠান চলছিল, সেসময় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ-ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হামলা চালায়। ভাংচুর করা হয় বিএনপির দলীয় কার্যালয়সহ সাবেক এমপির প্রাইভেট গাড়িসহ অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেল। মারপিটের শিকার হয়েছেন বেসরকারি টিভি চ্যানেল এনটিভি’র ক্যামেরাপার্সন আসিকুজ্জামান সারফু। ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে তার মোবাইল ও ক্যামেরা। উক্ত অনুষ্ঠানে অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্য দিচ্ছিলেন। এমন সময় উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক রাশেদুজ্জামান ছন্দ ও যুবলীগ নেতা হাসানুজ্জামান খান তাপসের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বিএনপির দলীয় কার্যালয় চত্বরে জমায়েত হয়ে এলোপাতাড়িভাবে অধ্যাপক শহীদুল ইসলামের প্রাইভেট গাড়িসহ বেশকিছু নেতাকর্মীর মোটরসাইকেল ভাংচুর করে।

বিএনপির এই নেতা বলেন, গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ীতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের শান্তিপূর্ণ মিছিলে ছাত্রলীগ হামলা চালিয়ে ছাত্রদল নেতা সিদ্দিক ছাব্বির এবং নাজমুলসহ ১০ জনকে গুরুতর আহত করেছে। আমি দলের পক্ষ থেকে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে দোষীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। আহত নেতাকর্মীদের আশু সুস্থতা কামনা করছি।

সুতরাং কাদের সাহেব আগে বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশের অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে দেশে সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করুন, নেতাকর্মীদের শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশের ওপর হামলা বন্ধ করুন। মানুষের বাক ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করে, রাজনৈতিক দলগুলোর সাংবিধানিক অধিকার হরণ করে আপনারাই অর্বাচীন, স্ববিরোধী ও কান্ডজ্ঞানহীনের মতো কাজ করছেন, কথা বলছেন। গণতন্ত্রের দেহে যেভাবে ছুরি চালাচ্ছেন তাতে সকল নাগরিক অধিকার প্যারালাইজড হয়ে গেছে। রাষ্ট্রক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার জন্য আপনাদের কর্মকান্ড কখনোই গণতন্ত্রের পক্ষে স্বাস্থ্যকর হয়নি।

রিজভী বলেন, নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে সেটিকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য আপনারা আগামী সাধারণ নির্বাচন নিয়ে নতুন করে ফন্দি-ফিকির করছেন। আপনাদের অধীনে নির্বাচন কখনোই সুষ্ঠু ও অবাধ হয়নি। সুতরাং আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ দলীয় প্রধানের নেতৃত্বে না করে দলনিরপেক্ষ ব্যক্তির অধীনে অনুষ্ঠিত করতে এগিয়ে আসুন। নিজেদের সীমাহীন অনাচার এবং চরম ব্যর্থতায় দেশে যে দুর্বিষহ দুর্বিপাক ঘটে চলেছে সেটিকে পর্দা দিয়ে আড়াল করার জন্য কতই না বিভ্রান্তি, অপপ্রচার ও মিথ্যাচার চালিয়ে যাচ্ছেন। জনগণের নির্ভিক নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত, মানসিক নির্যাতন বিরতিহীনভাবে চালিয়ে যাবার পরও মিথ্যা প্রচার অব্যাহত রেখেছেন। বাংলাদেশ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামভূমি। এই সংগ্রামভূমি নির্মাণ করেছেন আপসহীন নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। জনগণের কাতারে থেকেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে গণতন্ত্রের নতুন যুগের প্রত্যুষ নিশ্চিত করবেন তিনি।

তিনি তথ্য-প্রযুক্তি আইন বাতিল দাবি করে বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইন থেকে ৫৭ ধারা দিয়ে সাংবাদিকদের নির্যাতন করছে সরকার। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা দেয়া হয়েছে। গতকালও একজন সিনিয়র সাংবাদিককে ৫৭ ধারায় আটক করে কারাগারে প্রেরণ করেছে। আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা স্বাধীন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অন্তরায়। বর্তমানে ৫৭ ধারার ভয়াবহতা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। যদিও আইনমন্ত্রী বলেছিলেন ৫৭ ধারা প্রত্যাহার করা হবে। পরে তিনি তার অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। গণমাধ্যমে জানতে পেরেছি ৫৭ ধারা থেকে আরও ভয়াবহ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করতে যাচ্ছে সরকার। সে আইনের ১৯ ধারাতে গণমাধ্যমকে আরও শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণের বিধান রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগের মনগড়া ইতিহাসের বিরুদ্ধে কথা বললেই মামলা, জেল-জুলুম আর নির্যাতনের খড়গ নেমে আসবে। সরকারের এসব কালাকানুন ও নীতিমালা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম-তাদের সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল মিডিয়া তথা ওয়েবসাইট, অনলাইন সামাজিক মাধ্যমের সরাসরি হস্তক্ষেপ। আমি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির পক্ষ থেকে এ ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক বিধানসহ সকল কালাকানুন অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে সম্পাদক ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় যত মামলা আছে, তা প্রত্যাহার এবং গ্রেফতারকৃত সাংবাদিকদের মুক্তির দাবি করছি।

Related posts