September 22, 2018

ইসি’র প্রতিশ্রুতি শুধু মুখে

ঢাকাঃ  কেন্দুয়ায় নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুলিবিদ্ধ একজন -নিজস্ব ছবিইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অনিয়ম-সহিংসতার মাত্রা ধাপে ধাপে বাড়ছে। দেশের ইতিহাসে যে কোনো নির্বাচনের চেয়ে এ নির্বাচন সহিংসতা, অনিয়ম ও প্রাণহানির সব রেকর্ড ভেঙেছে। নির্বাচন কমিশন পরবর্তী ধাপে আরও কঠোর হওয়ার হুঁশিয়ারি দিলেও ফল হয়েছে উল্টো। ইসির প্রতিশ্রুতি শুধু মুখেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকেই ভেঙে দেয়া হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যে কারও জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, শনিবারের ভোটে নির্বাচনী সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন। আহত হয়েছেন ৫ শতাধিক। ভোট জালিয়াতি, কেন্দ্র দখলসহ অনিয়মের শীর্ষে উঠেছে এই ধাপের নির্বাচন। গতকাল নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে বেশিকিছু ইউপির প্রার্থী এ সংক্রান্ত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। অভিযোগ আমলে নিয়ে অনিয়ম হওয়া ইউপিগুলোর নির্বাচন বাতিল করে পুনঃনির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন তারা। ইসি সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগকারীদের অনেকেই কেন্দ্র দখলের তথ্য ও প্রমাণ জমা দিয়েছেন। অনেকেই জাল ভোটের প্রমাণও দাখিল করেছেন। নির্বাচন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও পড়েছে বেশ কিছু অভিযোগ। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে আরও কিছু কেন্দ্র বন্ধ করেছে ইসি। এর বাইরে আর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি সংস্থাটিকে। সূত্র জানায়, নির্বাচনের প্রথম দিন ৫৩টি কেন্দ্র স্থগিত করা হলেও পরে তা বেড়ে শতাধিক হয়ে যায়।

সর্বশেষ ১২০টি’র বেশি কেন্দ্র স্থগিতের তথ্য পাওয়া গেছে নির্বাচন কমিশন থেকে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দাখিলকৃত অভিযোগ ও সারা দেশের অনিয়মের চিত্রের কাছে এই ব্যবস্থা গ্রহণ খুবই নগণ্য। আরো বেশকিছু কেন্দ্র স্থগিত করে সেগুলোর পুনঃভোটের আয়োজন করার পক্ষে মত দিয়েছেন তারা। এ ছাড়া সহিংসতার ক্ষেত্রে এখনও নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে ইসি। শনিবারের নির্বাচনে সারা দেশের যেসব জায়গায় সহিংসতা ঘটেছে, তার কোনো ঘটনাই খতিয়ে দেখছে না ইসি।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেন, আমরা কোনো অনিয়মই ছোটো করে দেখছি না। কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্যও করছি না। অনিয়মের তথ্য-প্রতিবেদন পেলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো। কাউকে এক বিন্দু ছাড় দেয়া হবে না। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের এসব প্রতিশ্রুতি কেবল মুখেই। এখনও উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। যদি পদক্ষেপই গ্রহণ করতো, তাহলে ধাপে ধাপে এভাবে অনিয়ম-সংঘাত বাড়তো না।

এদিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পঞ্চম ধাপে ভোট পড়েছে ৭৬ দশমিক ৫৪ ভাগ। এ ধাপে ৪২৮টি ইউপিতে জয় পেয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা। এর মধ্যে ৩৮৮জন ভোটে ও ৪০ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। বিএনপি জয় পেয়েছে ৬৬টি ইউপিতে। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ১৭০টি ইউপিতে। স্বতন্ত্র জয়ীদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। নির্বাচন কমিশন থেকে প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। শনিবার পঞ্চম ধাপে দেশের ৭১৭টি ইউনিয়নে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে দুটি ছাড়া বাকি সব ক’টি ইউপিতে প্রার্থী ছিল আওয়ামী লীগের। ১০০টি ইউপিতে বিএনপি প্রার্থী দিতে পারেনি। এই ধাপে জাতীয় পার্টিও ৯টি ইউপিতে জিতেছে। এ ছাড়া অন্য কোনো দল জয়ী হয়েছে বলে এই ধাপের ফলাফলে এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।

ইসির থেকে প্রাপ্ত ফলাফলে বলছে, ৭১৭টি ইউপির মধ্যে ৩৮টি ইউপির শতাধিক কেন্দ্রের ভোট স্থগিত রয়েছে। এজন্য এসব ইউপির ফলাফল ঘোষণা করা হয়নি এখনও। এ ছাড়া আরো ৫টি ইউপির পূর্ণাঙ্গ ফলাফল নির্বাচন কমিশনে আসেনি। এই ৪৩টি ইউপির মধ্যে ২৩টিতেই এগিয়ে রয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা। এগুলোতে জয় পেলে দলটির এ ধাপে চেয়ারম্যান সংখ্যা দাঁড়াবে ৪৫০-এ। এ ছাড়া স্থগিত হওয়া ১০টি ইউপিতে বিএনপি ও ৯টি ইউপিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন।

এবারের ইউপি নির্বাচনের প্রথম ধাপে আওয়ামী লীগের ৪৯৪ জন ও বিএনপির ৫০ জন প্রার্থী জয় পেয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পান ১০৯ ইউপিতে। দ্বিতীয় ধাপে আওয়ামী লীগ ৪১৯টিতে ও বিএনপি ৬৩ ইউপিতে ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১১৭টি ইউপিতে জয় পেয়েছেন। তৃতীয় ধাপে আওয়ামী লীগের ৩৬৬ জন, বিএনপির ৬০ জন ও স্বতন্ত্র ১৩৯ জন জয় পেয়েছেন। চতুর্থ ধাপে আওয়ামী লীগের ৪০৫ জন, বিএনপির ৭০ জন ও স্বতন্ত্র ১৬১ জন জয় পেয়েছেন।

সব মিলিয়ে প্রথম ৫ ধাপে আওয়ামী লীগের সর্বমোট বিজয়ী চেয়ারম্যান সংখ্যা ২১১২ জন। এই ৫ ধাপে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলটির বিজয়ী চেয়ারম্যান সংখ্যা ২১০ জন। এখন পর্যন্ত বিএনপি থেকে মোট ৩০৯ জন প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন। এ ছাড়া সর্বমোট ৬৯৬টি ইউপিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন।

উৎসঃ  মানব জমিন

Related posts