December 10, 2018

ইসলামী ঐক্যজোট সরে যাচ্ছে ২০ দল থেকে!

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ভেঙ্গে যাচ্ছে। অঘোষিত-ভাবে জোট থেকে বেরিয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ শরিক ইসলামী ঐক্যজোট। তারা একলা হয়ে চলছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরানো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল মুফতি ওয়াক্কাসের জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জোটের অন্যতম প্রভাবশালী শরিক জামায়াতে ইসলামীও দূরত্ব বজায় রাখছে। পারতপক্ষে তারা বিএনপিকে এড়িয়ে চলছে।

মূলতঃ পৌর নির্বাচনে ছাড় না দেয়া, জোটে অবমূল্যায়ন, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার প্রেক্ষাপটে চরম ক্ষুব্ধ কয়েকটি শরিক। ইসলামী ঐক্যজোটের একজন শীর্ষ নেতা বলেছেন, জোটে থাকার কারণে আমরা সারাদেশে চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছি। আমাদের নেতা-কর্মীদের নামে ৪০ হাজারের উপর মামলা দেয়া হয়েছে। মামলার খরচ যোগাতে হিমশিম খাচ্ছি আমরা। অনেক জায়গায় ঐক্যজোটের নেতা-কর্মীদের জেল খাটতে হচ্ছে। এসব কারণে সাংগঠনিক কোনো তত্পরতাও চালাতে পারেনি ঐক্যজোট। ফলে দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়েছে সাংগঠনিক কাঠামো।

তিনি বলেন, ২০ দলের সঙ্গে থেকে ইসলামী ঐক্যজোট লাভের চাইতে ক্ষতির ভাগই বেশি পেয়েছে। অথচ বিএনপি আমাদের অবজ্ঞা করছে। মেয়র পদে আমরা প্রার্থীর তালিকা দিয়েছিলাম। একজনকেও ছাড় দেয়নি বিএনপি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঐ নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিএনপির অন্যতম প্রধান একজন নেতা বৈঠকে বসে আমাদের বলেন-’আপনারা মৌলবাদী। আপনাদের কারণে মুসিবতে আছি।’ তারা জামায়াতকে নিয়ে সরকার চালিয়েছে আর মুফতি আমিনী সাহেবকে অবমূল্যায়ন করেছে।

গতকাল খালেদা জিয়ার গুলশান অফিসে পৌর নির্বাচন নিয়ে বিএনপি ২০ দলীয় জোটের মহাসচিবদের বৈঠক ডেকেছিলো। জামায়াত এবং ইসলামী ঐক্যজোট এই বৈঠক বয়কট করে। তারা পৌর নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে থাকছে না।

১৯৯৮ সালে চারদলীয় জোট প্রতিষ্ঠার সময় থেকে মুফতি ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বাধীন কওমী মাদ্রাসা ভিত্তিক বড় রাজনৈতিক সংগঠন ’ইসলামী ঐক্যজোট’ বিএনপির সঙ্গে আছে। হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের পর থেকে মূলত বিএনপির সঙ্গে ঐক্যজোটের দূরত্ব রচিত হয়। এরপর ’ব্যর্থ’ আন্দোলন ও প্রতিটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ’বঞ্চনা’কে কেন্দ্র করে ক্ষোভ ও দূরত্ব দীর্ঘ হতে থাকে। সর্বশেষ পৌর নির্বাচনে জোটগতভাবে ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী ঘোষণা না করায় চূড়ান্তভাবে সম্পর্কের অবনতি হয়। তারা জোটের কাছে ১০টি পৌরসভার জন্য ছাড় চেয়ে একটিও পায়নি।

পৌর নির্বাচনে বিএনপি ২০ দলের শরিক এলডিপি এবং জাতীয় পার্টিকে (জাফর) ২টি পৌরসভায় ছাড় দিলেও ইসলামী ঐক্যজোটকে দেয়নি। অপেক্ষায় থেকে শেষে তারা ৪টি পৌরসভায় প্রার্থী মনোনয়ন দেয়। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশনের যাচাই বাছাইয়ে বাদ পড়ে ২ জন মেয়র প্রার্থী। এখন ২ জন প্রার্থী টিকে আছেন তাদের, যার প্রতিপক্ষ বিএনপির ধানের শীষ।

এ পরিস্থিতিতে নয় বছর পর মহান বিজয় দিবসে বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির আতিথেয়তা গ্রহণ করেন ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ নেজামী, মহাসচিব মুফিত ফয়জুল্লাহ, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মুফতি আমিনীর বড় ছেলে আবুল হাসনাত আমিনী এবং দলটির আরেক শীর্ষনেতা মাওলানা জুবায়ের আহমেদ। জোটের আরেক শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নির্বাহী সভাপতি মুফতি মুহম্মদ ওয়াক্কাস, মহাসচিব মহীউদ্দিন একরাম ও সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি রেজাউল করিম।

গতকাল জোটের মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠকে ইসলামী ঐক্যজোট না থাকায় অন্য শরিকদের প্রশ্নবানে নাকাল হন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; কিন্তু বিএনপির কাছ থেকে কোনো সন্তোষজনক জবাব পাননি তারা।

বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান মির্জা ফখরুলের কাছে জানতে চান ‘ইসলামী ঐক্যজোট কি থাকছে না? তারা আসেনি কেন’? জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জেলা সম্মেলনে যোগ দিতে যাওয়ায় আজকের বৈঠকে ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব হাজির হতে পারেননি’। আরেক নেতা পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘ইসলামী ঐক্যজোটের সবাই কি জেলা সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকার বাইরে গেছেন? উত্তরে ফখরুল বলেন, দুই-একজন না এলে এমন কোনো সমস্যা নেই।

এ সময় খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমেদ আব্দুল কাদের বলেন, এখন আলোচনা করে কী লাভ! বড় দল হিসেবে নির্বাচনে আপনারা সব প্রার্থী দেবেন- এটাই স্বাভাবিক। এতে আমাদের কি লাভ?

জোটের মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠক শেষে মির্জা আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ইসলামী ঐক্যজোটের নেতারা দলীয় কাজে ময়মনসিংহ সফরে থাকায় বৈঠকে তাদের প্রতিনিধিরা যোগ দিতে পারেননি। আর জামায়াত নেতারা ঢাকার বাইরে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত থাকায় বৈঠকে যোগ দেননি। ওই দুইটি দল বৈঠকে যোগ না দিলেও জোট ভাঙার কোনো আশঙ্কা নেই। যেসব গুঞ্জন ছড়ানো হয়েছে সব মিথ্যা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ বলেন, শরিক দলগুলোর সঙ্গে আমাদের জোট সম্পূর্ণ রাজনৈতিক, নির্বাচন ও আন্দোলন কেন্দ্রিক। তাই কেউ যেতে চাইলে তো বাধা দেয়ার সুযোগ নেই। তবে এমন কোনো পরিস্থিতি হয়েছে বলে মনে হয় না।

ইসলামী ঐক্যজোটের অন্যতম প্রধান নেতা মাওলানা আবুল হাসনাত আমিনী বলেন, বিএনপির সঙ্গে আমরা যে জোট করেছি সেটা নির্বাচনী জোট। নির্বাচনে তারা আমাদেরকে ছাড় দিচ্ছে না, জোটে থাকার কারণে সরকারের রোষানলে পড়ে জেল-জুলুমের শিকার হচ্ছেন আমাদের নেতা-কর্মীরা। তাই থেকে কি লাভ? আগামী ৭ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল থেকে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়া হবে- আমরা এই জোটে থাকবো কি না।

২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে থাকা চারদলীয় জোট কলেবরে বেড়ে ১৮ দলীয় জোট হয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিকরা হলো- জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), কল্যাণ পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি), লেবার পার্টি, ইসলামিক পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ, ন্যাপ ভাসানী, মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, পিপলস লীগ ও ডেমোক্রেটিক লীগ। পরে পর্যায়ক্রমে জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ও সাম্যবাদী দলের একাংশ এই জোটে যোগ দেয়।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts