November 20, 2018

ইসরায়েলকে ‘গুরু’ মেনেই কাজ শুরু করতে যাচ্ছে ভারত

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কঃ  ফের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে ভারত। ইসরায়েলকে ‘গুরু’ মেনেই এ প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যেতে চায় দেশটি। বাংলাদেশের সরকার ও পরিবেশবিদদের উদ্বেগ-আশঙ্কার মধ্যেই এ কথা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন দেশটির পানিসম্পদ মন্ত্রী উমা ভারতী।

বুধবার দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া ওয়াটার ফোরাম’- এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা জানান। ওই ফোরামের বৈঠকে উপস্থিত থাকছেন বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় থিংকট্যাংক বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) চেয়ারম্যান মুন্সী ফয়েজ আহমেদ।

উমা ভারতী বলেছেন, দেশের নদীগুলোকে যুক্ত করাই সংকট সমাধানের একমাত্র রাস্তা। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, পানিসম্পদের এই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় ভারতের ‘গুরু’ হবে ইসরায়েল।

উমা ভারতীর কথা সত্য হলে, ভারত থেকে আসা বাংলাদেশের অধিকাংশ নদীই পানি সংকটে মরে যাবে। মরুভূমির আকার ধারণ করবে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা।

দু’বছর আগে নরেন্দ্র মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতের পুরনো আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের তাক থেকে ধুলো ঝেড়ে আবার নতুন করে ফাইলপত্র নাড়াচাড়া শুরু হয়েছে। ভারতের এই প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্ভাবনা আছে বাংলাদেশেই। কারণ দু’দেশের মধ্যে অভিন্ন নদীর সংখ্যা অন্তত ৫৩টি। আর এর প্রায় সব নদীই ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

উজানের দেশ ভারত বাঁধ বা জলাধার তৈরি করে অভিন্ন নদীগুলোর পানি সরিয়ে নিচ্ছে- এমন একটা সন্দেহ বাংলাদেশে আছেই। ঢাকাকে কিছু না জানিয়ে এই প্রকল্প নিয়ে ভারতের পদক্ষেপ অবশ্যই সেই সন্দেহকে আরও জোরালো করবে।

মন্ত্রী উমা ভারতী বলেন, ‘নদী-সংযোগ নিয়ে ভাবা ছাড়া আমাদের কোনও উপায় নেই! তবে যেসব নদীতে জল উদ্বৃত্ত (সারপ্লাস) এবং যেখানে মৌসুমী বৃষ্টির কারণে প্রবাহ বেশি, সেগুলোকেই শুধু নতুন নদীর সঙ্গে যুক্ত করা হবে। তবে নিশ্চিন্ত থাকুন, এটা করা হবে মানুষ বা পরিবেশের যাতে কোনও ক্ষতি না হয় সেটা মাথায় রেখেই।’

ইন্ডিয়া ওয়াটার ফোরামের উদ্বোধন-করেছেন-উমা-ভারতী

উমা ভারতীর মন্ত্রণালয় বাংলা ট্রিবিউনকে এমনও ইঙ্গিত দিয়েছে, এই প্রকল্পে তাদের প্রথম টার্গেট হলো মানস-সংকোশসহ গোটা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা– যাকে ভারত ‘ওয়াটার সারপ্লাস’ বলে মনে করে। এই ব্রহ্মপুত্রই পরে যমুনা নাম নিয়ে ভাটিতে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

পানি যে একুশ শতকের সবচেয়ে দামি সম্পদ হতে যাচ্ছে– তা নিয়ে সারা পৃথিবীই প্রায় একমত। পানির সমস্যা দক্ষিণ এশিয়াতেও ভীষণই প্রকট। এই মুহূর্তেই ভারতের আড়াইশরও বেশি জেলা এবং তেত্রিশ কোটিরও বেশি মানুষ ভয়ংকর খরায় ধুঁকছে। এমন একটা পরিস্থিতিতেই ভারত আয়োজন করেছে ‘ইন্ডিয়া ওয়াটার ফোরামে’র বৈঠক, যেখানে এই সংকট নিয়ে আলোচনা করছেন দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা।

তবে মন্ত্রী উমা ভারতী উদ্বোধনের দিনেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এ ব্যাপারে ভারত ইসরায়েলের দেখানো রাস্তাতেই হাঁটবে বলে স্থির করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমির বুকে ইসরায়েল যেভাবে শস্যশ্যামলা বিস্তীর্ণ কৃষিজমি তৈরি করেছে, সামান্য পানিসম্পদকে যেমন অসাধারণ মুন্সিয়ানায় ব্যবহার করে দেখিয়েছে– তাতে সারা দুনিয়াই ইসরায়েলকে ‘ওয়াটার ম্যানেজমেন্টের ওস্তাদ’ বলে মানে। নদী সংযোগ প্রকল্প নিয়েও ভারত তাই ইসরায়েলেরই শরণাপন্ন হচ্ছে।

উমা ভারতী দিল্লির ইন্ডিয়া হ্যাবিট্যাট সেন্টারে বুধবার যে ফোরামে এ কথা ঘোষণা করছেন সেখানেই যোগ দিচ্ছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) চেয়ারম্যান মুন্সি ফায়েজ আহমেদও। সাবেক কূটনীতিক ফয়েজ আহমেদ বহুদিন চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। দেশের এক নম্বর থিংকট্যাংকের বর্তমান প্রধান তিনি।

ফয়েজ আহমেদ ওয়াটার ফোরামের বৈঠকে যে বিষয় নিয়ে বলতে এসেছেন তা হলো- পানিসম্পদের ক্ষেত্রে ‘আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও আন্তঃসীমান্ত বিষয়সমূহ’। হয়তো কাকতালীয়, কিন্তু সেই বৈঠকের আগেই উমা ভারতী যে প্রায় একতরফাভাবে আন্তঃনদী-সংযোগের কথা ঘোষণা করবেন সেটা হয়তো ভাবা যায়নি। এখন বিআইআইএসএস চেয়ারম্যান মুন্সি ফায়েজ আহমেদ শুক্রবার সম্মেলনের শেষ দিনে তার ভাষণে এ নিয়ে কিছু বলেন কি না, অবশ্যই সে দিকে সাগ্রহ নজর থাকবে সবার।

পানিসম্পদ ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি – ফারাক্কা থেকে তিস্তা সেই সম্পর্কের টানাপড়েনের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে আজও। যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে যোগ দিতে উমা ভারতীর ঢাকা সফরের দিনক্ষণ স্থির করা যাচ্ছে না বহুদিন ধরে, তিস্তা চুক্তি এখনও বিশ বাঁও জলে– এমন পটভূমিতে ভারতের নদী সংযোগের ঘোষণা দুদেশের সম্পর্ককে কোন খাতে বইয়ে নিয়ে চলে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/২০ এপ্রিল ২০১৬/রিপন ডেরি

Related posts