September 26, 2018

ইলিয়াস আলী নিখোঁজের ৬ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ

elias-Aliমো. আবুল কাশেম, বিশ্বনাথ (সিলেট) প্রতিনিধি  :: বিএনপি’র সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী এবং তার গাড়ী চালক আনসার আলী নিখোঁজের ৬ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ মঙ্গলবার। এই ৬ বছরেও সন্ধান মেলেনি তাদের। এখনো ইলিয়াস আলী নিখোঁজের কারণ রহস্যাবৃত রয়ে গেছে। ইলিয়াস আলী নিখোঁজের আন্দোলনও ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়তে শুরু করেছে।

ইলিয়াস আলী ও আনছার আলীকে ফিরে পেতে এখনও অপেক্ষার প্রহর গুণছেন তাদের স্বজন-শুভার্থীরা। নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর পরিবার তাকে ফিরে পাবার ব্যাপারে আশাবাদী হলেও দলের নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষ এ নিয়ে হতাশ। তাঁর এক সময়ের সহকর্মী-সহযোদ্ধাদের অনেকেই ভুলতে বসেছেন ত্যাগী এই নেতাকে।

প্রিয় স্বামীকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় ইলিয়াসের স্ত্রী তাহসিনা রুশদি লুনা। পিতাকে ফিরে পাবার আশায় বুকে পাথর বেঁধে দিন যাপন করছে ইলিয়াসের পুত্র আবরার ইলিয়াস, লাবিব সারার ও মেয়ে সাইয়ারা নাওয়াল। পরিবারের একটাই দাবি  সরকার আন্তরিক হলে ইলিয়াসকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কেননা গুম-নিখোঁজ হওয়ায় অনেক ব্যক্তি এরই মধ্যে তাদের পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন। আমরাও বিশ্বাস করি, ইলিয়াস আলী একদিন ফিরে আসবেন। আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ইলিয়াসের অপেক্ষায় থাকব। এখন তিনি শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করে ইলিয়াস আলী ফিরে আসার পথে চেয়ে রয়েছেন। লুনা বলেন, হত্যা-হামলা-মামলা অনেক নির্যাতন করেও ইলিয়াস নিখোঁজ আন্দোলন দমন করা সম্ভব হয়নি। সিলেটে এখনও ইলিয়াসের সন্ধান দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। বিগত উপজেলা ও ইউপি নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দিয়ে বিশ্বনাথ-বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগরবাসী ইলিয়াস আলী নিখোঁজের জবাব দিয়েছেন। ইলিয়াস আলী ও তার গাড়ি চালক আনসার আলীকে ফিরে পাওয়ার জন্য তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন। নিখোঁজ হবার পর ইলিয়াস আলীর পরিবারের ভর করে দীর্ঘশ্বাসের কালোমেঘ। এখনো থামেনি মায়ের আহাজারী। শুকিয়ে গেছে তাঁর চোখের জল। সন্তান হারা বৃদ্ধা মাকে সান্তনা দিতে প্রায় প্রতিদিন গ্রামের বাড়িতে দলের নেতাকর্মীরা ছুটে আসলেও এখন আর আগের মত ইলিয়াস আলীর গ্রামের বাড়িতে নেতা-কর্মীদের নেই তেমন কোন আনাগোনা। সন্তানকে হারিয়ে নির্বাক ইলিয়াস আলীর গর্ভধারিনী বৃদ্ধা মা সূর্যবান বিবি। তিনি পুত্র শোকে কাতর। অনেকটা শয্যাশায়ী অবস্থায়ও তিনি অপেক্ষার প্রহর গুণছেন পুত্রের জন্য।

২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে নিজ বাসায় ফেরার পথে রাজধানী ঢাকার মহাখালী থেকে নিখোঁজ হন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী ও তার বিশ্বস্থ গাড়ী চালক আনছার আলী। মধ্যরাতে মহাখালী এলাকা থেকে ইলিয়াস আলীর গাড়ীটি উদ্ধার করে পুলিশ। সেই সময় থেকেই তারা নিখোঁজ রয়েছেন। ইলিয়াস আলী নিখোঁজ ইস্যুতে ২০১২ সালের ২৩ এপ্রিল বিশ্বনাথে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ভয়াবহ সংঘর্ষে গুলিতে নিহত হয় মনোয়ার, সেলিম ও জাকির। আহত হন অনেকেই। ঐ সংঘর্ষে বিক্ষুব্দ জনতা উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসায়-জিপগাড়িতে, বিভিন্ন ব্যাংক, মার্কেট, কমিউনিটি সেন্টার, বিপনিবিতানে হামলা-ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ করেছিল। এতে উপজেলা পরিষদের ১৯টি দপ্তরের প্রায় ২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়।

২২ ও ২৩ এপ্রিলের সংঘর্ষের ঘটনায় বিশ্বনাথে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের আসামী করে দায়ের করা হয় ৬টি মামলা। এসব মামলায় বিশ্বনাথের ৮টি ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান, বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী ও অনেক সাধারণ মানুষ’সহ প্রায় ১৮ হাজার লোককে আসামী করা হয়। ৬ ইউপি চেয়ারম্যান’সহ শতাধিক নেতাকর্মী কারাবরণ করেন। ইলিয়াস আলী ‘নিখোঁজ’ ইস্যুতে আন্দোলন করতে গিয়ে ২০১২ সালের ২৩ এপ্রিল পুলিশের সাথে জনতার সংঘর্ষ ও উপজেলা পরিষদের ভাংচুর-অগ্নি সংযোগের ঘটনায় আসামী হওয়ার কারণে ঐ বছরের ১ জুলাই উপজেলার ৭ ইউপি চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তীতের উচ্চ আদালতের রিটের মাধ্যমে তাদের চেয়ারম্যান পদ বহাল থাকে।

জানাগেছে, দলমত নির্বিশেষে সব বয়সের নারী-পুরুষ আশায় বুক বেঁধে বসে আছেন তাদের চিরচেনা সেই প্রিয় মানুষটি আবার তাদের মাঝে ফিরে আসবেন। ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি মানতে নারাজ অনেকেই। বাস্তব যতই নির্মম হউক তবুও যে সত্য তিনি নিখোঁজ হয়েছেন। নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে নেতাকর্মী,সমর্থক, শুভাকাংখিসহ সাধারন মানুষ মানষিক ভাবে ভেঙে পড়েছেন। অনেকেই মসজিদ মন্দিরে করছেন বিশেষ প্রার্থনা। কেউ কেউ পীর ফকিরের বাড়ীতে ধরনা দিচ্ছেন। পীর ফকিরের উক্তি অনুযায়ী অনেকেই জোর গলায় বলছেন ইলিয়াস আলী বেঁচে আছেন। তিনি শিগগিরই ফিরে আসবেন আমাদের মাঝে। ইলিয়াস আলী আবার জীবিত অবস্থায় ফিরে আসবেন এমনটাই প্রত্যাশা তাঁর জন্মস্থান বিশ্বনাথবাসীর। ।

FB_IMG_1523941648526কাউকে দেখলেই এগিয়ে যান সূর্যবান বিবি। জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদেন, ছেলের খবর জানতে চান। তবে তাঁর চোখ এখন আর সজল হয় না। কাঁদতে কাঁদতে শুকিয়ে গেছে অশ্রু। ছয় বছর ধরে অনবরত কেঁদে চলেছেন ছেলে ইলিয়াস আলীর জন্য।

পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস, এখনো বেঁচে আছেন ইলিয়াস আলী। যেকোনো সময় তিনি ফিরে আসবেন। এ জন্য টেলিভিশন চালু করলেই তারা চেয়ে থাকে পর্দার নিচের অংশে, যেখান দিয়ে একটার পর একটা খবরের শিরোনাম বয়ে চলে। পুরো পরিবার অপেক্ষা করছে সেই দিনের জন্য, যেদিন টিভিগুলোতে ব্রেকিং নিউজ দেখাবে যে ‘ইলিয়াস আলীর সন্ধান পাওয়া গেছে’। শুধু পরিবারের সদস্যরা নয়, ইলিয়াস আলীর জন্মভূমি বিশ্বনাথ তথা সিলেটের লাখো মানুষও একই অপেক্ষায় দিন গুনছে।

এ ঘটনার প্রতিবাদে দেশজুড়ে শুরু হয় আন্দোলন পালিত হয় হরতাল, মিছিল, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন, গণস্বাক্ষর সংগ্রহসহ নানা কর্মসূচি। হরতাল পালনের সময় সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় জনতার সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সংঘর্ষ হয়। পুলিশের গুলিতে নিহত হয় বিএনপির তিন কর্মী। আহত হয় শতাধিক। ঘটনার পর উপজেলার অজ্ঞাতপরিচয় আট হাজার মানুষকে আসামি করে মামলা করে পুলিশ। জেল খাটে কয়েক শতাধিক নেতা-কর্মী। এখনো আশা ছাড়েনি ইলিয়াস পরিবার। ছেলে ফিরে আসবে-এ আশায় বুক বেঁধে আছেন মা। স্বামীকে ফিরে পাওয়া যাবে-এ আশায় দিন পার করছেন স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা। আর বাবার ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকে তিন সন্তান-সাইয়ারা নাওয়াল, আবরার ইলিয়াস ও লাবিব সারা।

তাহসিনা রুশদীর লুনা বলেন, যখনই টেলিভিশনের সামনে বসি সংবাদের স্ক্রলের দিকে চেয়ে থাকি। একটা ব্রেকিং নিউজের জন্য অপেক্ষা করি,যেখানে লেখা থাকবে ‘ইলিয়াস আলীকে পাওয়া গেছে’। আমরা প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর ফেরার অপেক্ষায় আছি। আমাদের বিশ্বাস, তিনি বেঁচে আছেন এবং ফিরে আসবেন। এখন আল্লাহ ওপর ভরশা করে বসে আছে আমাদের পরিবার।

এদিকে, নিখোঁজের পর থেকে ইলিয়াস আলীর অবর্তমানে বিশ্বনাথ-বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর বিএনপির কান্ডারী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন তাঁর সহধর্মীনি তাহসিনা রুশদি লুনা। ধীরে ধীরে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর স্ত্রী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার পদে কর্মরত তাহসিনা রুশদী লুনা। প্রথমে লুনাকে জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির প্রথম সদস্য করা হয়। পরবর্তীতে দলীয় চেয়ারপার্সনের উপদেষ্ঠা করা হয় তাকে। গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ও বিগত ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী সিলেক্ট ও প্রার্থীর পক্ষে প্রচারনায় লুনা সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ফলে বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাচন এবং ইউপি নির্বাচেন অধিকাংশ বিএনপির প্রার্থীই বিজয়ী হন। আগামী সংসদ নির্বাচনে সিলেট-২ আসনে নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলীর অবর্তমানে তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদি লুনা বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দিতা করবেন এমনটাই প্রত্যাশা করছেন দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

Related posts