November 19, 2018

ইন্টারপোলের প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রে, সিআইডি চায় ভিডিও কনফারেন্স

ঢাকাঃ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির তদন্তে সহায়ক আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার (ইন্টারপোল) নির্ধারিত একটি বৈঠক যুক্তরাষ্ট্রে করার প্রস্তাব এসেছে। বৈঠকটি বাংলাদেশে হওয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এটি যুক্তরাষ্ট্রে করার প্রস্তাব দিয়েছেন ইন্টারপোলের প্রতিনিধি। তবে বাংলাদেশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা সিআইডি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠকটি করতে চায়। এ বিষয়ে ইন্টারপোলের প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে। সিআইডি কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের বাইরে বৈঠক করতে বিকল্প একটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল ব্যয় কমানোর জন্য। এটিতে সায় পাওয়া যায়নি। এখন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠকটি সম্পন্ন করার চিন্তা করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানিলন্ডারিং (এপিজি)’র একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশে। এতে ৪১টি দেশের প্রতিনিধিদের অংশ নেয়ার কথা ছিল। একই সময়ে গত ৩০শে জুলাই যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ফিলিপাইন, চীন, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের পুলিশ-কর্মকর্তা ও ইন্টারপোলের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল ঢাকায়। বাংলাদেশ পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)’র কর্মকর্তারা সেভাবে প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও টাকা উদ্ধারের বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ১লা জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে ও ঈদের দিন ৭ই জুলাই কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্কতা অবলম্বন করতে পরামর্শ দেয়। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধির অংশগ্রহণে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে বৈঠকটি বাতিল করা হয়। এ বিষয়ে কথা বলতে গত ২৫শে জুলাই ইন্দোনেশিয়া থেকে ঢাকায় আসেন ইন্টারপোলের ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন অফিসার মোহন মনোসেমি। দীর্ঘ সাত দিন এ বিষয়ে দফায় দফায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

সূত্রমতে, এসব বৈঠকে ইন্টারপোলের পরবর্তী বৈঠক নিয়ে আলোচনা হয়। পরবর্তী বৈঠক বাংলাদেশে না করে যুক্তরাষ্ট্রে করার প্রস্তাব দেন ইন্টারপোলের সিআইও মোহন মনোসেমি। এ সময় সিআইডি কর্মকর্তারা ব্যয় কমানোর যুক্তি দেখিয়ে বৈঠকটি ফ্রান্সে করা যেতে পারে বলে মত প্রকাশ করেন। কিন্তু গ্রীষ্মকালীন ছুটিসহ নানা কারণে অন্তত দেড় মাস পর্যন্ত সেখানে বৈঠক না করার পক্ষে মত দেন ইন্টারপোল কর্মকর্তা। যে কারণে ওই বৈঠকের বিষয়ে শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগেই ১লা আগস্ট ঢাকা ছাড়েন ইন্টারপোল কর্মকর্তা। সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বৈঠক করতে হলে তুলনামূলকভাবে ব্যয় হবে বেশি। ওই ব্যয় বহন করতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে। যে কারণে আমেরিকায় বৈঠক করার পক্ষে মত দেননি সিআইডি কর্মকর্তারা। শেষ পর্যন্ত বৈঠকটি কোথায় অনুষ্ঠিত হবে তা নিশ্চিত হয়নি। তবে সিআইডি কর্মকর্তারা চাইছেন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের পুলিশ কর্মকর্তা ও ইন্টারপোলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে। এতে খরচ কমিয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা সম্পন্ন করা যাবে।

বিশেষ করে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় জড়িত থাকার পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ বের করা। আসামিদের গ্রেপ্তার ও হস্তান্তরের বিষয়ে তথ্য ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ই এই বৈঠকের লক্ষ্য। এ ঘটনায় শনাক্ত হওয়া জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আনতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা প্রয়োজন। তাদের আইনের আওতায় নিয়ে এলে বাংলাদেশ থেকে যারা তাদের সহযোগিতা করছেন তাদের নামও বের হয়ে আসবে। সিআইডি কর্মকর্তারা জানান, নিশ্চিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে তাদেরও গ্রেপ্তার করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় তিন দেশের ২০ বিদেশি নাগরিককে শনাক্ত করার কথা এর আগেই জানিয়েছে সিআইডি। জড়িতদের মধ্যে শ্রীলঙ্কার সাত জন, জাপানের এক এবং ফিলিপাইনের ১২ জন রয়েছে। ইতিমধ্যে বিষয়টি তদন্ত করার জন্য সিআইডি’র ছয় সদস্যের দুটি দল শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনে গিয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ উদ্ধার ও জড়িতদের গ্রেপ্তারে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অত্যন্ত আন্তরিক জানিয়ে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অর্গানাইজড ক্রাইম) মীর্জা আব্দুল্লাহেল বাকী বলেন, পরিস্থিতির কারণে আটটি দেশের পুলিশ কর্মকর্তা ও ইন্টারপোলের সঙ্গে ঢাকার বৈঠকটি বাতিল হয়েছে। পরবর্তী সময়ে কোথায় হবে তা এখনও নির্ধারণ হয়নি। তবে ইন্টারপোলের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বৈঠক করার প্রস্তাবের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে ফ্রান্সের বৈঠকের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে তদন্তের গতি বজায় রাখতে ভিডিও কনফারেন্সের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি হ্যাকাররা ৩৫টি ম্যাসেজের মাধ্যমে নিউ ইয়র্ক ফেডারেল ব্যাংকে গচ্ছিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৯৫১ মিলিয়ন ডলার ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকের জুপিটার শাখায় ট্রান্সফার করতে বলে। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক পাঁচটি ম্যাসেজ গ্রহণ করে। ম্যাসেজের পরিপ্রেক্ষিতে ৮১ মিলিয়ন ডলার জুপিটার শাখার চারটি অ্যাকাউন্টে, ২০ মিলিয়ন ডলার শ্রীলঙ্কার শালিকা ফাউন্ডেশনের অ্যাকাউন্টে জমা হয়। ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কার টাকা ফেরত পাওয়া গেছে। চুরি যাওয়া পুরো টাকাই এখন ফিলিপাইনে রয়েছে। এ ঘটনায় গত ১৫ই মার্চ রাজধানীর মতিঝিল থানায় বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব ও বাজেট বিভাগের যুগ্ম পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে ৮শ’ কোটি টাকা চুরির ঘটনায় মামলা করেন। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ, চুরি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে দায়েরকৃত মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি।মানব জমিন

Related posts