November 16, 2018

ইউরোপে দীর্ঘ রোজাঃ প্রথা ভঙ্গের সুযোগ কি রয়েছে?


ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কঃ  ইউরোপে এবার জুন মাস এবং রমজান মাস একসাথে পড়ে যাওয়ায় গত তেত্রিশ বছরের মধ্যে দীর্ঘতম রোজা চলছে।

দেশ ভেদে ১৯ থেকে ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত রোজা রাখছেন ইউরোপের মুসলমানরা। ব্রিটেনে এবার রোজার শুরুর দিনেই সেহেরির শেষ সময় থেকে ইফতারের সময় ১৯ ঘণ্টা। ইউরোপের উত্তরের দেশগুলোতে যেমন, সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়েতে এই ব্যবধান আরো বেশি, ২০ থেকে ২১ ঘণ্টা।

ইউরোপে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এখন কম-বেশি সাড়ে চার কোটি। এই সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু যেসব দেশ থেকে তারা এসেছেন, ভৌগলিক অবস্থানের কারণে সেসব দেশের তুলনায় ইউরোপে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের মধ্যে ব্যবধান অর্থাৎ দিন-রাতের সময় অনেকটাই আলাদা।

সে কারণে গরমের রোজা ১৯-২০-২১ ঘণ্টা। আবার শীতের রোজা ৬-৭-৮ ঘণ্টা, এমনকি নরওয়ের একদম উত্তরে এক ঘণ্টা বা তারও কম হতে পারে। ইউরোপে রোজার সময়কে সামঞ্জস্য করার কোনো রাস্তা আছে কিনা, এ নিয়ে ধর্মের ব্যাখ্যা কি – এসব নিয়ে ইউরোপের মুসলিমদের কেউ কেউ বিচ্ছিন্নভাবে প্রশ্ন করেন।

কিন্তু বছর দুয়ের ধরে প্রকাশ্যে কথা বলছেন ব্রিটেনের বিতর্কিত এক ইসলামি চিন্তাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ড: উসামা হাসান। তার কথা- ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত না খেয়ে থাকার প্রথা মানার প্রয়োজন ইউরোপে নেই। বরঞ্চ মক্কা-মদিনার মানুষ যত ঘণ্টা রোজা রাখেন, ইউরোপে সে মতই রোজা হতে পারে। তাতে ইসলামের বিধান ভঙ্গ হবেনা, বরঞ্চ সেটাই ইসলামের বিধান।

ড. হাসান বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘‘দেখুন আমি যা বলছি, মিশরের গ্র্যান্ড মুফতি মোহাম্মদ আবদো একশ বছর আগে সেরকম ফতোয়া দিয়েছিলেন। ২০১০ সালে আল আজহার সেই ফতোয়া আবার স্মরণ করে দিয়েছে।“

ড. হাসান বলেন, মিশরের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি এবং আল আজহারের ফতোয়ার মোদ্দা কথা ছিলো ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার মুসলমানরা মক্কা এবং মদিনার না-খেয়ে থাকার সময় অর্থাৎ ঋতু ভেদে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা রোজা রাখতে পারে। “১৮ ঘণ্টার ওপর রোজা ইসলামি শারিয়া অনুযায়ী নিষিদ্ধ।“

পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত ড. উসামা হাসান কুইলিয়াম নামে একটি ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত। কুইলিয়াম ইউরোপের উদার ভাবধারার সাথে মুসলমানদের ব্যবধান কমানোর কথা বলে, ইসলামি বিধানের উদার ব্যাখ্যা করে। ফলে বহু মুসলিম তাদের সন্দেহের চোখে দেখে।

গরমে দীর্ঘ রোজা এবং তা নিয়ে ড. ওসামা হাসানের কথিত ফতোয়া নিয়ে কি ভাবছেন ইউরোপের সাধারণ মুসলমানরা এবং মুসলিম ধর্মীয় নেতারা?

রোজার দ্বিতীয় দিন। ইংল্যান্ডের পোর্টসমথ শহরের আবিদুর রহমান চৌধুরী, স্ত্রী স্বপ্না রহমান এবং স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া দুই ছেলে সেহেরির ১৯ ঘণ্টা পর ইফতার করতে বসেছেন। রাত সোয়া নটা তখন।

স্বপ্না রহমান বিবিসিকে বলেন, গরমে দীর্ঘ রোজার কথা মাথায় রেখে তিনি রহমান বাৎসরিক ছুটি এই রোজার মাসে নিয়ে রেখেছেন। বললেন, ১৯ ঘণ্টা রোজা কষ্টের কিন্তু কোনো অভিযোগ নেই।

ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখার প্রচলিত বিধানের বদলে মক্কা-মদিনার মানুষ যতক্ষণ রোজা রাখেন ততক্ষণ রোজা রাখার যে কথা ড উসামা হাসান বলছেন – সে প্রসঙ্গ তুলতে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে স্বামীর দিকে তাকালেন স্বপ্না রহমান।

দ্রুত ভেবে নিয়ে আবিদুর চৌধুরী বললেন, “কোরানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। হবেও না। যত কষ্টটাই হোক না কেন কোরানের নির্দেশ আমাদের মেনে চলতে হবে…যুগ যুগ ধরে এটা চলে আসছে, এখন আমরা যদি নতুন কিছু সৃষ্টি করি সেটা আল্লার-রসুলের বিপরীতে চলে যেতে পারে।”

কিন্তু ইসলামের উৎপত্তি যেখানে সেই সৌদি আরবেই মানুষ যেখানে ১৩-১৪ ঘণ্টা রোজা রাখছে, ইউরোপের মুসলমানরা ১৯-২০ ঘণ্টা রোজা করছে – এটাকে কিভাবে দেখেন তিনি? “শীতের রোজাতে আবার ইউরোপের মুসলমানরা অনেক কম সময় রোজা রাখে।” ইউরোপের গরমে দীর্ঘ রোজা আবিদুর পরিবারের কাছে কোনো ইস্যুই নয়।

অসলোর বাসিন্দা আল মামুন জানালেন, ঐ সব শহরের মুসলমানদের অনেকেই ভোর-থেকে সূর্যাস্তের পরিবর্তে অসলোর সময় অনুসরণ করে রোজা শুরু করছেন এবং ভাঙছেন। তিনি অসলো শহরে কিছু ফিলিস্তিনীকে চেনেন যারা তাদের দেশের সময় হিসেব করে রোজা রাখেন। তবে সিংহভাগ মুসলমান রীতি ভাঙ্গার কথা ভাবেনই না।

“একটা সুবিধে হলো, এখানে গরমেও তাপমাত্রা পঁচিশ ডিগ্রির বেশি ওঠেনা, অত কষ্ট হয়না।“

ড ওসামা হাসান বলছেন পুরো একমাস ধরে দিনে ২০/২১ ঘণ্টা না খেয়ে থাকা কষ্টকর এবং শরীরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ যেটা, তার মতে, ইসলাম সমর্থন করে না।

“দেখুন ইসলামের মূল কথা ধর্ম পালন যেন যন্ত্রণাকর না হয়, বরঞ্চ সহজ হয়।“

তার দাবি রোজা রাখার সময় নিয়ে কোরানের বক্তব্য কিন্তু খুব স্পষ্ট নয়, ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে। “সূর্যাস্তের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখন ইউরোপের অনেক জায়গায় সূর্যাস্ত হচ্ছে রাত ১০/১১ টার দিকে.. সে কারণেই একশ বছর আগে মোহাম্মদ আবদো শত শত বছরের পুরনো ফতোয়া দেখে ফতোয়া জারি করেছিলেন।“

পোর্টসমথ জামে মসজিদের ইমাম শেখ মহিউদ্দিন বললেন রোজা নিয়ে ইসলামের বিধান স্পষ্ট। “সুবেহ সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখতে হবে।“

ইউরোপের গরমে অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময়ের জন্য রোজা, গরমে উত্তর মেরুর খুব কাছাকাছি অঞ্চলে প্রায় পুরোটা সময় দিনের আলো থাকা – এই বাস্তবতার সাথে রোজাকে কিভাবে সামঞ্জস্য করবে সেখানকার মুসলমানরা?

শেখ মহিউদ্দিন বললেন, “এগুলোর সমাধান ইসলামে ইতিমধ্যেই করা হয়েছে। যেসব জায়গায় দিন ও রাতের মধ্যে পার্থক্য করা যাচ্ছেনা, সেসব জায়গায় মুসলমানরা রোজা নামাজরে জন্য কাছাকাছি কোনো শহরের সময় অনুসরণ করবেন। সৌদি আরবের ফতোয়া বোর্ডের নির্দেশ সেটাই।“

মক্কা-মদিনা সময় অনুসরণের যে কথা ড ওসামা হাসান বলছেন, পোর্টসমথ মসজিদের ইমাম তা একবারেই উড়িয়ে দিলেন। “হাজার হাজার মাইল দুরের কোনো শহরের বা দেশের সময় অনুসরণের কোনো সুযোগ নেই, মক্কার সময়ও না।“

ধর্ম পালনে অতিরিক্ত কষ্ট ইসলাম কি সমর্থন করে? এই প্রশ্নে শেখ মহিউদ্দিন বললেন, এই প্রশ্নেরও সমাধান ইসলাম দিয়েছে। অসুস্থতা বা শারীরিকভাবে অপারগ হলে, রোজা পরে সুবিধামত সময়ে করার অনুমোদন রয়েছে।

অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রয়েছে লন্ডনে বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকার ব্রিক লেন মসজিদের।

মসজিদ কমিটির চেয়ারম্যান সাজ্জাদ মিয়া সহ আরো কয়েকজনের কাছে প্রসঙ্গটি তুললে, তাদের বক্তব্য ছিলো — রোজা রাখার সময় নিয়ে তারা কখনও ভাবেনও নি, ভাবতে চানও না।

তবে সাজ্জাদ মিয়ার কথা- মুসলিম ধর্মীয় নেতারা, চিন্তাবিদরা যদি একসাথে বসে একমত হয়ে ভিন্ন কোনো ব্যাখ্যা দেন, তাহলে অন্য কথা। একজন-দুইজনের কথার কোনো মূল্য তাদের কাছে নেই।

‘হত্যার হুমকির সাথে সমর্থনও পাচিছ’- ড. উসামা হাসান

কিন্তু ড. ওসামা হাসান দাবি করলেন গালি-গালাজ, হত্যার হুমকির পাশাপাশি অনেক মুসলমানের কাছ থেকে তিনি সমর্থনও পেয়েছেন। “অনেকেই আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। কারণ আমি যা বলেছি অনেক মুসলমানই অনেকদিন ধরে নীরবে-গোপনে সে মতই রোজা রাখেন। আমি যে প্রকাশ্যে এটা বললাম তা নিয়ে তারা খুশি।“

“…নরওয়ের বহু মুসলমান অনেকদিন ধরেই ১৪ ঘণ্টা রোজা রাখেন। প্রথা ভাঙ্গা মুসলমানের সংখ্যা বাড়ছে কারণ ২০-২২ ঘণ্টা রোজা রাখতে হয় বলে ইউরোপে বহু মুসলমান রোজা রাখারই ছেড়ে দিচ্ছেন। সময়টা কমলে আবার তারা রোজা রাখতে শুরু করবেন।“

সাধারণ মুসলিমদের সিংহভাগের কথা, রোজা নিয়ে ইসলামের বিধান স্পষ্ট, সংশোধনের কোনো অবকাশ নেই।

কিন্তু ইউরোপে মুসলমানদের সংখ্যা যত বাড়বে, সময় যত গড়াবে – আচার-আচরণ, রীতিনীতি নিয়ে ইউরোপীয় মুসলিমদের মধ্যে ভিন্ন একটি স্বত্বা খোজার চেষ্টাও হয়তো দিনে দিনে চোখে পড়বে।

বিবিসি

Related posts