September 20, 2018

ইইউ ছাড়ল যুক্তরাজ্য

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কঃ    মাত্র চার মাসের উসকানি কানপড়ায় (প্রচার-প্রচারণায়) ভেঙে গেছে ইইউ-ব্রিটেনের ৪৩ বছরের সংসার। ইইউর সঙ্গ ছেড়ে বৈরাগ্যের পথ বেছে নিয়েছে ব্রিটেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে গেল ব্রিটেন। দেশটি এখন আর অন্য কারও সম্পত্তি নয়। ব্রিটেন শুধু ব্রিটিশদেরই। কিন্তু এতদিনের ২৮ জাতির সঙ্গে জড়িয়ে থেকে গোটা বিশ্ব ব্যবস্থার আনাচে-কানাচে, ব্যবসা-বাণিজ্য, দেনা-পাওনা, আস্থা-নির্ভরতার যে মায়াজাল বিছিয়ে রেখেছে ব্রিটেন তার বিরহে সারা বিশ্বে উন্মাদনা। শেয়ারবাজার থেকে শুরু করে আমদানি-রফতানি, হোটেল ব্যবসায়ী থেকে মুদি দোকানি সবার মুখেই সেই একই ‘হায় হায়’- কী হল! কি হবে! কেন হল!

২৩ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জোটের সদস্য না থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছে ব্রিটেনের জনগণ। শুক্রবার ভোট গণনা শেষে না থাকার পক্ষের ভোট পড়েছে বেশি। ব্রিটেনের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গণভোট ছিল। যার সঙ্গে দেশটির বর্তমান সমৃদ্ধি, বিশ্বে তাদের উচ্চাসন বহিঃশক্তি হিসেবে আবির্ভাব ইত্যাদি জড়িত ছিল। গণভোটের রায়ের ফলে এসব বিষয় হুমকির মুখে পতিত হল। নতুনভাবে পথ চলা শিখতে হবে ব্রিটেনকে। গণভোটে ব্রিটেনের জনগণ সে পথে চলার জন্য রায় প্রদান করেছে।

২৩ জুনের গণভোটের রায়ে ইইউ জোট থেকে ব্রিটেনকে বেরিয়ে আসতে ৫২ ভাগ ভোটার তাদের রায় দিয়েছেন; ছাড়ার পক্ষে মোট ভোট পড়েছে ১ কোটি ৭৪ লাখ ১০ হাজার ৭৮২টি। না ছাড়ার পক্ষে ভোট পড়েছে ১ কোটি ৬১ লাখ ৪১ হাজার ৪৪১টি। ভোট প্রদানের হার ৪৮ ভাগ। ব্রিটেন ইইউ জোটমুক্ত হওয়ার পক্ষে ১২ লাখ ৯৬ হাজার ৫০১ ভোট বেশি পড়েছে। দেশজুড়ে ভোটের টার্নওভার ছিল ৭২.২ শতাংশ, যা এ যাবতকালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও ব্রিটিশ ভোটাররা দেশটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট কেন্দ্রে গিয়েছেন। যা সাধারণ নির্বাচনগুলোতে সচরাচর দেখা যায়নি।

চারটি রাজ্যের মধ্যে ইংল্যান্ডে বেরিয়ে আসার পক্ষে ৪৪.২ ভাগ, থাকার পক্ষে ৫৫.৮ ভাগ; স্কটল্যান্ডে ছাড়ার পক্ষে ৩৮ ভাগ থাকার পক্ষে ৬২ ভাগ; ওয়েলসে ছাড়ার পক্ষে ৫২.৫ ভাগ বিপক্ষে ৪৭.৫ ভাগ ভোট পড়েছে।

মূলত অভিবাসী যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতেই ঢাকঢোল পিটিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে গেল ব্রিটেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিচারে, গণভোটের রায়ে যতটা না ব্রিটিশ স্বার্থ সুরক্ষিত হয়েছে, তার চেয়ে বেশি জেগে উঠেছে ব্রিটিশ জাতীয়তাবাদের উগ্রতা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ২০১০ সালে প্রথম এই উগ্রতা টেনে এনেছিলেন ব্রিটিশ তল্লাটে। আজ সেই ঝড়েই তার গদি উড়ল। রায় ঘোষণার পরপরই শুক্রবার ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের ফটকে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন ক্যামেরন। আসছে অক্টোবরই পদত্যাগ করবেন তিনি।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তার দলের মধ্যে কঠোর সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। ২০১০ সালে নির্বাচনী প্রচারণায় জোর বক্তব্য ছিল- দল ক্ষমতায় গেলে তিনি অভিবাসননীতি প্রণয়ন করবেন। প্রয়োজনে গণভোট দিয়ে জোট থেকে বেরিয়ে যাবেন। দীর্ঘ ৭ বছর ক্ষমতায় থেকে অভিবাসন সমস্যার সমাধান তো করতেই পারেননি বরং অভিবাসীদের বাঁধভাঙ্গা ঢেউ পুরো ব্রিটেনের অর্থনীতিকে মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন করে তুলেছেন। নতুন জোটভুক্ত দেশগুলো থেকে দলে দলে লোকজন ব্রিটেনে প্রবেশ করতে থাকলে দেশটির সাধারণ নাগরিক বিষিয়ে ওঠেন। তাদের চাকরি, বাসস্থান ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত ও হুমকির সম্মুখীন হতে থাকে। বিশেষ করে ঘরবাড়ি না পাওয়া লোকজন প্রতীক্ষায় থাকতে থাকতে সরকারের অভিবাসন নীতির কঠোর সমালোচনা করতে থাকেন। গত কয়েক বছরে পোল্যান্ড-হাঙ্গেরি, চেক রিপাবলিক-স্লোভাকিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে লোকজন ব্যাপক হারে ব্রিটেনে ঢুকতে থাকে। অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোর অধিবাসীরা এভাবে অনুপ্রবেশ করার কারণে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এটিকে ইস্যু করে রাজনীতিবিদরা পরবর্তী সময়ে ক্ষমতা দখলের সুযোগ নেন। ডেভিড ক্যামেরন তার ২০১০ সালের প্রচারণায় এই বিষয়টি লাইমলাইটে আনেন। পরে তা বাস্তবায়ন না করায় দলের মধ্যে বিশেষ করে তার সমর্থকদের মাঝে কঠোর সমালোচিত হন। বাধ্য হয়ে গণভোট দিয়ে নিজেই ইইউর পক্ষে অবস্থান নেন। পরিণতিতে জনগণ সিদ্ধান্ত নেয়। অপরদিকে লেবার পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালীন অভিবাসন-সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ অনেকটা খোলামেলা হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ জনগণ এটি মেনে নিতে পারেননি। তাই দলকে শোচনীয়ভাবে হেরে গিয়ে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। গণভোটে লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন ইইউর পক্ষে প্রচারণা চালাতে গিয়ে অনেক জায়গায় সমালোচনার সম্মুখীন হন। গণভোটের রায়ের পর তারও পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে।

এদিকে ব্রিটেন জোটমুক্ত হওয়ার খবরে অর্থনৈতিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্বে। ইউরোপে ব্রিটেনের বাণিজ্য ছিল একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারকারী হিসেবে, অবাদ চলাচলেও বাধা ছিল না। ইইউ ছাড়ার রায়ে সেই অবাধ চলাচল বা অর্থনৈতিক মুক্তবাজার নীতিতে কোটা বাড়বে। বাইরে থেকে অবাধে পণ্যসামগ্রী আসবে না। আগের মতো কোটামুক্ত শুল্কমুক্ত বাজারও পাবে না ফলে যে পণ্যটির অবাধ চলাচলে মূল্য তুলনামূলক কম থাকত তা এখন শুল্ক দিয়ে প্রবেশাধিকারের কারণে ক্রেতারা বেশি দামে তা কিনতে হবে। বড় বড় কারখানাগুলো অতিরিক্ত শুল্ক দিয়ে ব্রিটেনে তার ব্যবসা করতে চাইবে কিনা বা তারা কম শুল্কে বা মুক্ত শুল্কের দেশে তাদের ব্যবসা হস্তান্তর করতে পারেন। ফলে অনেক নামিদামি কারখানাই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রায় এখনও ব্রিটিশ পাউন্ডের মূল্য সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। যে কারণে ইইউতে অভিন্ন কারেন্সির মধ্যে যোগ দেয়নি ব্রিটেন। গণভোটের ফলাফলে একদিনেই পাউন্ড স্টার্লিংয়ের যেভাবে মূল্য হ্রাস পেয়েছে তাতে ভবিষ্যতে এটি আরও নিুমুখী হবে কিনা তা নিয়ে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড শংকিত রয়েছে। বিশ্ববাণিজ্যে পাউন্ড এভাবে অবমূল্যায়িত হলে ধাক্কা খাবে ব্রিটেনের অর্থনীতি, সঙ্গে বড় বড় দেশের মুদ্রা ও বাজার ভ্যালু হারাতে পারে।

এদিকে গণভোটের রায়ে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা উল্লসিত। তারা মনে করেন ইউরোপ থেকে আসা অভিবাসীদের চাপে তাদের কর্মসংস্থান মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছিল। ইউরোপের দরজা বন্ধ হলে দেশের ভেতর তাদের প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য জায়গায় চাকরির পথ সুগম হবে। কর্মসংস্থান-বাসস্থান, চিকিৎসায়, লেখাপড়ায় অনুপ্রবেশকারীদের ভিড় কমবে। স্থানীয়দের ভিড় কমবে, সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে রেস্টুরেন্ট মালিকরা মনে করেন, ইউরোপের দ্বার বন্ধ হলে বাংলাদেশ থেকে তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য নতুন লোক আনার ভিসা প্রদান করতে হবে। সে সুযোগটির অপেক্ষায় তারা ইইউ ছাড়ার পক্ষে জোর প্রচারণা চালিয়েছিলেন।

অন্যদিকে গণভোটের ফলাফলে ইউকের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে চরম হতাশা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাদের ধারণা ছিল জোটবদ্ধ থাকার কারণে ব্রিটেনের যে সমৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল তা অব্যাহত রাখার জন্য জনগণ থাকার পক্ষে রায় দেবেন। কিন্তু গণভোটের ফলাফলে রাজনৈতিক নেতাদের মনোভাব ভেঙে গেছে। তারা দীর্ঘ চার মাস জোটে থাকার পক্ষের সুবিধাগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য গোটা ব্রিটেন চষে বেড়িয়েছেন, সুফল-কুফল তুলে ধরেছেন। তাদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেল জনগণের রায়ে।

জোট ছাড়ার আরেক অন্যতম নেতা ইউকে ইনডিপেনডেন্ট পার্টির নাইজেল ফরোজ অবিলম্বে ডেভিড ক্যামরনকে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। তিনি ২০ বছর ধরে ইউর স্বার্থবিরুদ্ধ অভিবাসন নীতি পরিত্যাগের পক্ষে প্রচরণায় লিপ্ত ছিলেন। তার বক্তেব্য- ব্রিটেনে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে যে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে তিনি বদ্ধপরিকর। সর্বশেষ গণভোটের এই সুযোগটি তার ২০ বছরের পরিশ্রম বলে তিনি মনে করেন। ২৩ জুনের এ রায়কে তিনি অভিনন্দন জানিয়ে দিনটিকে ব্রিটেনের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ঘোষণার দাবি জানান।

Related posts