September 21, 2018

ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া শিক্ষার্থীদের ‘বাবা-মা’ রা উদ্বিগ্ন

ঢাকাঃ ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা শঙ্কিত এবং ভীত। অনেক মা-বাবাই সন্তানকে দেশের বাইরে পড়তে পাঠিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। সন্তানদের জন্য তারা বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে কাউনসেলিংয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন।

গত ১ জুলাই গুলশান ও ৭ জুলাই ঈদের দিন শোলাকিয়ার হামলায় জড়িতদের বেশিরভাগই ইংরেজি লেখাপড়া করেছে। এছাড়া ওই হামলাকারীরা দেশে-বিদেশে বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। সংবাদ মাধ্যমে এমন খবর প্রকাশের পর মা-বাবাদের মধ্যে এই আশঙ্কা-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় অভিভাবকরা সন্তানদের দেশের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও বিদেশে পড়তে পাঠানো নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের শিক্ষা হতে হবে আনন্দময় ও প্রকৃতিসম্মত। শিশুদের জন্য আনন্দ বিনোদনের পর্যাপ্ত আয়োজন রাখতে হবে। রাখতে হবে খেলার পর্যাপ্ত মাঠ, থাকতে হবে পার্ক। যেসব কারণে শিশুদের মধ্যে হতাশা, ক্ষোভ ও ক্রোধ তৈরি হয় সে কারণগুলোও দূর করতে উদ্যোগী হতে হবে বাবা মা-সহ স্বজন ও শিক্ষকদের।

তাদের মত, সভ্যতা ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে কিশোর ও তরুণদের অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী শিশু-কিশোরদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের প্রায় ৬০ শতাংশ করে থাকে ১৬-১৮ বছর বয়সীরা।

আমেরিকার জুভেনাইল জাস্টিস অ্যান্ড ডেলিকুয়েন্সি প্রিভেনশন অফিস মনে করছে, কিশোর তরুণদের অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে।

‘আমার ছেলে ঢাকার সব চাইতে নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর একটিতে পড়েছে। কিন্তু ছেলেকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ানোর ইচ্ছে ছিল না, আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। কিন্তু স্বামীর পরিবার মোটামুটি স্বচ্ছল। আমার স্বামীই চেয়েছিল ছেলে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুক। আমি আর না করিনি। তবে একমাত্র সন্তান হওয়ায় স্কুল পাস করার পর ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে চাইনি। চেয়েছি দেশের কোনও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো সাবজেক্টে পড়ে দেশেই চাকরি করুক। ওর বাবাও রাজি হয়। ছেলে পরীক্ষা দিয়ে দেশের নামকরা একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সব চাইতে ভালো সাবজেক্টগুলোর একটিতে ভর্তি হয়।

সমস্যার শুরু এখান থেকেই। আমার ছেলে কয়েকদিন ক্লাসে যাওয়ার পর বাসায় এসে বলতে থাকে- আমার এইসব জায়গায় পড়তে ভালো লাগে না। ক্লাসমেটগুলো কেমন ক্ষেত; স্যাররাও যেন কেমন! আমি ভেবেছি হয়তো প্রথম প্রথম এমন লাগছে, সময় গেলে ঠিক হয়ে যাবে। তিন চার মাস চলে যাওয়ার পরেও দেখি একই অবস্থা। একদিন ইউনিভার্সিটি থেকে এসে বলল- এইসব জায়গায় আমি পড়তে পারবো না। পরিবেশ ভালো না, ক্লাসের ছেলেপেলেদের কথাবার্তাও আমার পছন্দ হয় না; সবকিছু অন্য রকম লাগছে। আমাকে হয় তোমরা বিদেশে পড়তে পাঠাও, নইলে নামকরা কোনও ইংলিশ মিডিয়াম প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে আমি ভর্তি হবো। শেষ পর্যন্ত সন্তানকে অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে পাঠিয়েছি। ও এখন সেখানেই পড়ছে, ভালোই আছে। কোনও অভিযোগও নেই সেখানে যাওয়ার পর। তবে গুলশানের ঘটনার পর বিষয়টা আপনাকে জানাতে ইচ্ছে হলো।’

চিঠিটি এক মায়ের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই মা চিঠিটি লেখেন আমিনুল ইসলামকে। ঢাকার আহসানউল্লাহ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির এই সহকারী অধ্যাপক এখন সুইডেনের এস্তেনিয়ান এন্টারপ্রেনারশিপ ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্সের ক্রিয়েটিভিটি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে নিযুক্ত আছেন। তিনি জঙ্গিবাদ ইস্যুতে একজন সক্রিয় কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করছেন।

গুলশান হামলার পর ঢাকা থেকে এক মা আমিনুল ইসলামকে নিজের পরিবারের এই কথা জানিয়ে মতামত চেয়েছেন। গুলশানসহ শোলাকিয়া হামলার পরে নিজের ছেলেকে নিয়ে চিন্তিত এই মা।

শুধু এই মা নন, আরেক বাবার কথাও জানান আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, সেই বাবা তার ছেলেকে মালয়েশিয়া পড়তে পাঠিয়েছেন। তার ছেলেও ঢাকার একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়তো। তিনি চেয়েছিলেন ছেলে দেশের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুক। কিন্তু ছেলের অন্য বন্ধু বান্ধবরা সবাই বিদেশে পড়াশোনা করছে। এ কারণে ছেলে তাই দেশে আর পড়তে চায় না; বাধ্য হয়ে তিনিও ছেলেকে বিদেশে পড়তে পাঠিয়েছেন। এখন গুলশান ও শোলাকিয়া হামলার পর ছেলেকে নিয়ে তিনিও ভুগছেন নানা দুঃশ্চিন্তায়।

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে বেরিয়ে পাবলিক স্কুল কিংবা বাইরের গণমানুষের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা প্রশ্নে আমিনুল ইসলাম বলেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থাকুক; সেখানে ভালো পড়াশোনাও হোক, কোনও সমস্যা নেই এতে। কিন্তু সেখানকার পরিবেশ হতে হবে বাংলাদেশের মূলধারার মানুষদের মতো। নইলেতো এরা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে মিশতে পারবে না।

এসব শিক্ষার্থীদের মনোজগতের পরিবর্তন এখনও খুব প্রকট হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, এই সমস্যা এখনও খুব প্রকট হয়নি। কারণ দেশে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের জোয়ার শুরুই হয়েছে ১০ থেকে ১২ বছর আগে। এর আগ পর্যন্ত কয়েকটি নামি দামি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থাকলেও তাদের ছাত্র সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু এখন এর সংখ্যা অনেক। ছাত্রের সংখ্যাও অনেক। আরও ৫/৭ বছর পরে বিশাল সংখ্যার এই ছাত্ররা যখন স্কুল শেষ করে দেশের মূলধারার মানুষের সঙ্গে মিশতে যাবে, তখন একটা সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।

আমিনুল ইসলাম বলেন, এই সব শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর নজর দিতে হবে। ইংরেজি মিডিয়াম থাকুক সমস্যা নেই; কিন্তু সেখানকার পরিবেশ যেন নিজ দেশ, সমাজ ও সংস্কৃতিবিরোধী হয়ে না ওঠে। সেই দিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। সেখানে এমন কিছু শেখানো যাবে না, যেটা নিজ দেশের কিংবা সমাজের মানুষকে ঘৃণা করতে শেখায়, বা নিজ সমাজের সঙ্গে ইন্টিগ্রেট করতে শেখায় না বরং মারজিনালাইজ করে।

বাবা-মা বা পরিবারের অন্য সদস্যদের অসদাচরণ, মিথ্যাচার, দুর্নীতিপরায়ণতা, ভারসাম্যহীন ব্যবহার শিশুকে বিপথগামী করে তোলে জানিয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি আবু নাসের খান বলেন, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজন দ্বারা শিশুরা দারুণ প্রভাবিত হয়। স্কুল-কলেজ হচ্ছে শিশু কিশোরের অনন্য ভুবন। এখানে লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সামাজিকীকরণ হয়। সহপাঠী, বন্ধু, শিক্ষকদের মাধ্যমে তারা খুব বেশি প্রভাবিত হয়। যেসব কারণে শিশুদের মধ্যে হতাশা, ক্ষোভ ও ক্রোধ তৈরি হয়, সেগুলো দূর করার চেষ্টা গ্রহণ করতে হবে সবাইকে বলেন তিনি।

উল্লেখ্য, গত ১ জুলাই গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে ও ৭ জুলাই শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের কাছে হামলা চালায় জঙ্গিরা। গুলশান হামলায় অংশ নেওয়া নিবরাস ইসলাম ও শোলাকিয়া হামলায় অংশ নেওয়া আবির রহমান দুজনই বেসরকারি নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। শৈশবে ঢাকার টার্কিস হোপ স্কুলে পড়া নিবরাস নর্থ সাউথে লেখাপড়া শেষ করে মালয়েশিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছিল। অপরদিকে গুলশান হামলায় অংশ নেওয়া রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ছিলেন ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। স্কলাস্টিকার ছাত্র এ লেভেল পরীক্ষার আগে নিখোঁজ হয়েছিল গুলশান হামলার অপর জঙ্গি মীর সামিহ মোবাশ্বের। গুলশান হামলায় ১৭ বিদেশি, দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ মোট ২২ জন নিহত হন। আর শোলাকিয়ার হামলায় ২ পুলিশ সদস্যসহ তিনজন নিহত হন। গুলশানে যৌথবাহিনীর অভিযানে ছয় জঙ্গি এবং শোলাকিয়ায় পুলিশের গুলিতে একজন জঙ্গি নিহত হয়।

Related posts