November 15, 2018

‘আল্লাহু আকবর’

আল্লাহু আকবার’ বলে স্তব্ধ হয়ে গেলেন সালাউদ্দিন কাদের

ডেস্ক রিপোর্টাঃ   রাত ৯:২৯। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বিশাল ফটক। তার মাঝে ছোট্ট দুয়ার। গুণে গুণে ১৭ জন ভেতরে ঢুকলেন। ফাঁসির আসামির স্বজন তারা। স্ত্রী, ছেলে, মেয়েসহ নিকটাত্মীয়।

কারাগারে ভেতরে ঢুকতেই হাতের বায়ে ফাঁসি মঞ্চ। তার ১০-১২ গজ দূরে একটা খোপঘর। কেতাবি ভাষায় কনডেম সেল। ৬ নম্বর কনডেম সেলটা বড়জোর ৭ বর্গফুট। একটা দরজা। ফ্যান নাই। ছোট্ট ভ্যান্টিলেটর দিয়ে শ্বাস টানার বাতাসের যাতায়াত।

বিষ্যুৎবারও এখানেই দেখা হয়েছিল। শনিবার রাতে আসতে হল শেষবারের জন্য। প্রথমেই কথা হলো বাইরের পরিস্থিতি নিয়ে। রটে গেছে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী যুদ্ধাপরাধের দায় স্বীকার করে প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছেন। আবেদন করেছেন আবুদল হামিদ অ্যাডভোকেট বরাবর। জাতীয় সংসদে সালাউদ্দিন কাদেরে সাবেক সহকর্মী এখন রাষ্ট্রপতি।

কিন্তু চতুর্থ থেকে অষ্টম সংসদের টানা ছয়বারের সাংসদ সালাউদ্দিন মৃত্যুর কয়েকঘণ্টা আগেও আগের মতো গর্জে উঠলেন। “এই বাজে কথা তোমাদের কে বলেছে?। আমি কোন আবেদন করিনি। কোন কাগজে সাক্ষর করিনি। যে কাগজ বের হয়েছে, এ ধরনের কাগজ আরো কত দেখবে সামনে।”

এরপর শুরু হলো নিজেদের মধ্যে কথা। শেষ সাক্ষাতে ফাঁসির আসামির সঙ্গে একে একে স্বজনেরা কথা বলে। হাত ধরে। বুকে জড়িয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে। অন্যরাও চোখ মুছে। যার চির বিদায়, তিনিই সবাইকে সান্ত্বনা যোগান। সাহস দেন। দোয়া চান। হাসিমুখে থাকার চেষ্টা করেন।

সালাউদ্দিন কাদের প্রায় পাঁচ বছর ধরে কারাগারে বন্দী। এই সময়টাতে মায়ের নির্দেশনায় সংসার, ব্যবসা, কূটনৈতিক যোগাযোগের সব কিছুই সামলেছেনে ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী।

শেষ দেখায় তিনি বাবার কাছে জানতে চাইলে, “এখন আমরা কি করব?” বাবা দুটি বাক্য উচ্চারণ করলেন, “তোমরা ভাই-বোন এক সঙ্গে থেকো। তোমাদের মাকে দেখে রেখো।”

নিশঙ্ক ও দেশপ্রেমিক সালাউদ্দিন কাদের। বাবা ১৯৪৭ এর স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন। সমগ্র পাকিস্তানের স্পিকার, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। তার ছেলে হিসেবে সব সময় প্রতিপক্ষের টার্গেট ছিলেন তিনি। দশকের পর দশক প্রচারযন্ত্রের লেগেছিল তার পেছনে। তবু যতদিন বেঁচে ছিলেন, বীরোচিত জীবন কাটিয়েছেন।

বিদায়ের আগে স্বজনদের বললেন, “আমার জন্য দোয়া করো। আমি পরকালেও ভালো থাকবো।”

শেষ সাক্ষাতে বড় ভাইয়ের দৃঢ় মানসিকতায় উজ্জীবিত ছোট ভাই জামাল উদ্দিন কাদের চৌধুরীও। তিনি জানালেন, “আমার ভাই একটি কথাই বলেছেন, আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর।”

সাক্ষাৎ শেষে চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে গেলেন স্বজনরা। এর মধ্যে ছিলেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী, বড় ছেলে ফজলুল কাদের ফাইয়াজ ও পুত্রবধু দানিয়া খন্দকার, ছোট ছেলে হুমমাম কাদের, মেয়ে ফারজিন কাদের ও মেয়েজামাই জাফর খান, ভাই গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামালউদ্দিন কাদের চৌধুরী, ভাবি সেলিনা চৌধুরী ও মাহবুবা চৌধুরী, ভাতিজা ওমর আহমেদ আদেল ও শাকিল কাদের চৌধুরী, দুই বোন জোবেদা মনোয়ার ও হাসিনা কাদের প্রমুখ।

স্বজনদের শেষ সাক্ষাতের আগেই ফাঁসির আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে গিয়েছিল। রাত সাড়ে ৮টার দিকে সালাউদ্দিনকে গোছল করানো হয়। এরপর অল্প পরিমাণে খাবার গ্রহণ করেন তিনি। খাবার শেষ হতেই স্বজনরা দেখা করতে চলে আসে। সাক্ষাৎ শেষে তারা কনডেম সেল ছেড়ে যান রাত পৌনে ১১টায়।

এরপর দোয়া পড়তে থাকেন সালাউদ্দিন কাদের। আল্লাহর নাম জিকির করতে বেজে যায় রাত ১২টা। নিরাপত্তা রক্ষীদের সঙ্গে সেলে আসেন কারাগারের জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা মনির হোসেন খান। তিনি তওবা পড়ান সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে।

তওবা পড়ার আগে সালাউদ্দিন কাদের বলেন, “আমি মানবতাবিরোধী কোন অপরাধ করিনি। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমার ভুলত্রুটি থাকতে পারে। তাই অন্যায় হত্যার শিকার হওয়ার আগে আমি তওবা পড়তে চাই।”

ইমামের বিদায়ের পর রাত সাড়ে ১২টায় চারজন জল্লাদকে নিয়ে নিরাপত্তা রক্ষীরা ফের সেলে আসে। ১২টা ৩৬ মিনিটে সালাউদ্দিন কাদেরকে যমটুপি পরিয়ে সেল থেকে বের করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই ফাঁসির মঞ্চের উদ্দেশে হাঁটতে থাকেন তিনি। কণ্ঠে ছিল মহান আল্লাহর নাম। দোয়া ও কলেমা পড়ছিলেন তিনি।

মঞ্চে সামনে এনে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড় করানো হয় সালাউদ্দিন কাদেরকে। এ সময় তিনি বলেন, “আমি কোনো অপরাধ করিনি। ঘটনার সময় আমি দেশে ছিলাম না। আমাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসি দেওয়া হচ্ছে।”

স্বাভাবিক কণ্ঠে কথাগুলো বলার পর নিস্তব্ধতা নেমে আসে ফাঁসির মঞ্চে। সেখানে উপস্থিত সব সরকারি কর্মকর্তারা চুপ করে যান। একটু পরে সালাউদ্দিন কাদেরকে ফাঁসির মঞ্চে উঠতে বলা হলে তিনি শান্তভাবেই ফাঁসির মঞ্চে ওঠেন। এরপর তার দুই পা বেধে ফেলা হয়। গলায় লাগানো হয় ফাঁসির দড়ি।

এ অবস্থায় সালাউদ্দিন কাদের নির্বিকারভাবে দোয়া কালাম পড়ছিলেন। তখন রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে। সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির তার হাতে থাকা সাদা রুমাল ফেলে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ফাঁসির দড়িতে টান দিল প্রধান জল্লাদ  শাহজাহান।

‘আল্লাহু আকবার’ বলে স্তব্ধ হয়ে গেলেন সালাউদ্দিন কাদের। নিয়ম অনুযায়ী ১৭ মিনিট ঝুলিয়ে রাখা হয় তার লাশ। এরপর তার লাশটি ফাঁসিকাষ্ঠ থেকে নামিয়ে মঞ্চের সামনে পাতা টেবিলে শোয়ানো হয়। কারা চিকিৎসক ডা. বিপ্লব কুমার ও আহসান হাবিব, ঢাকা জেলার সিভিল সার্জন আবদুল মালেক নিহত সালাউদ্দিন কাদেরের লাশের ঘাড়ের রগ কেটে ফেলে।

তবে কারাগারের একটি সূত্রের দাবি, রাত ১২ টা ৩০ মিনেটে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

ফাঁসি কার্যকরের পুরো ঘটনার সময় আইজি প্রিজন চৌধুরী ইফতেখার উদ্দিন, ঢাকা জেলা প্রশাসক মো. তোফাজ্জল হোসেন, দুই ম্যাজিস্ট্রেট- খন্দকার মুশফিকুর রহমান ও তানভীর আহমেদ, সিভিল সার্জন আবদুল মালেক মৃধা, জেলার নেছার আলম, সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির উপস্থিত ছিলেন।

পরে কারাগার থেকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর লাশ বের করে র‍্যাব-১০ এর একটি সশস্ত্র দল পাহাড়া দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামের উদ্দেশে রওনা করে। নিজগ্রামে ছোটভাইয়ের কবরের পাশে দাফন করা হবে বাংলাদেশে জনপ্রিয় রাজনীতিক সালাউদ্দিন কাদেরকে।

উৎসঃ  অনলাইন বাংলা
দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts