December 19, 2018

আল্লাহতায়ালার শেখানো দোয়া

324
‘হে আমাদের রব! আপনি এ সৃষ্টিজগত বৃথা সৃজন করেননি। (আপনার সৃষ্টির নিদর্শনাবলী আমাদের করেছে আপনার অস্তিত্ব ও ক্ষমতায় বিশ্বাসী) অতএব, আমাদের জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ দিন। হে আমাদের রব! আপনি যাকে জাহান্নামে পাঠাবেন তাকে চরম লাঞ্ছিত করবেন। কেউ তাদের সাহায্য করতে পারবে না। হে আমাদের রব! আমরা অবশ্যই একজন আহ্বানকারীকে শোনেছি। তিনি ঈমান গ্রহণের প্রতি আমাদের আহ্বান করেছেন। তিনি বলেছেন, তোমরা তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আনো। তাই আমরা ঈমান গ্রহণ করেছি। হে আমাদের রব! আমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দিন। আমাদের ভুলগুলো মোচন করে দিন। আমাদের মৃত্যু দান করুন নেককারদের সঙ্গে। হে আমাদের রব! আপনার রাসূলগণকে মান্য করার ওপর যে প্রতিশ্রুতি আপনি আমাদের দিয়েছেন; তা পূর্ণ করুন। এবং কিয়ামতের দিন আমাদের লাঞ্ছিত করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না।’ -সূরা আল ইমরান : ১৯১-১৯৪

সহিহ বোখারি শরীফের ১১৯৮ নং হাদিসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, হজরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গভীর রাতে সজাগ হয়ে শোয়া থেকে উঠে বসতেন। হাত দিয়ে চোখ-মুখ মুছে ঘুমের ভাব দূর করে সূরা আল ইমরানের ১৯১নং আয়াত থেকে ২০০নং আয়াত পর্যন্ত পাঠ করতেন। এরপর বিছানা ছেড়ে তাহাজ্জুদ নামাজের প্রস্তুতি নিতেন। হজরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি রাতের আমল প্রমাণ করে সূরা আল ইমরানের উক্ত আয়াতগুলো বিশেষ তাৎপর্যমণ্ডিত ও গুরুত্বপূর্ণ। উক্ত আয়াতগুলোর প্রথম চারটি আয়াত শুধু প্রার্থনা। দয়াময় আল্লাহতায়ালার কাছে বান্দার একান্ত মিনতি।

যে আল্লাহ আমাদের সবার সব প্রার্থনা শোনেন, তিনিই উক্ত আয়াতের দ্বারা আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন, তার কাছে কী প্রার্থনা করতে হবে, কোন্ ভাষায় প্রার্থনা করতে হবে। অবশ্যই অন্যান্য দোয়ার চেয়ে তার ভাষায়, তার শিখানো দোয়ার সমাদর ও খাতির তার কাছে একটু বেশিই হবে।

উপরোক্ত দোয়ার বাক্যগুলোতে মহান আল্লাহতায়ালাকে ‘রব’ শব্দে ৫ বার সম্বোধন করা হয়েছে। আরবি ‘রব’ শব্দটি অনেক বিস্তৃত অর্থবোধক একটি শব্দ। এর যথার্থ একক কোনো প্রতিশব্দ পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষায় নেই। যিনি বস্তুকে সৃষ্টি করেন, লালন পালন করেন, সব অনিষ্ঠ থেকে হেফাজত করেন, সব প্রয়োজন পূরণ করেন, উন্নতি ও সমৃদ্ধির শেষ স্তরে পৌঁছে দেন, আইন প্রণয়ন করেন এবং বিচার করেন তিনিই রব। রব হওয়ার জন্য উক্ত সব গুণ পরিপূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান থাকতে হয়। আল্লাহর দয়া, অনুগ্রহ, ক্ষমতা ও বড়ত্বের সর্বোচ্চ প্রকাশ এবং বান্দার অসহায়ত্ব ও অক্ষমতার সর্বশেষ প্রকাশ ঘটে আল্লাহকে রব নামে ডাকলে। তাই দোয়া ও মোনাজাতে বারংবার রব নামে আল্লাহকে ডাকতে থাকলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

উপরোক্ত দোয়ার বাক্যগুলোতে ৫টি প্রার্থনা করা হয়েছে। সেগুলো হলো- জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ দেওয়া, অপরাধ ক্ষমা করা ও ভুলত্রুটি মোচন করা, নেককারদের সঙ্গে মৃত্যু দেওয়া, হাশর দিবসের লাঞ্ছনা থেকে অব্যহতি প্রদান করা এবং প্রতিশ্রুত পুরস্কার প্রদান করা।

উক্ত দোয়াতে আহ্বানকারী বলতে বুঝানো হয়েছে শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। যার ওপর অবতীর্ণ হয়েছে মহাগ্রন্থ পবিত্র কোরআনে কারিম। আর মাগফিরাত ও ক্ষমার জন্য শর্তারোপ করা হয়েছে ওই আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দেওয়া। অতএব, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের পর তাকে নবী হিসেবে মেনে নেওয়া ব্যতীত মুক্তি ও ক্ষমা লাভের বিকল্প কোনো পথ নেই।

উক্ত দোয়াতে মৃত্যু কামনা করা হয়েছে। যদি পার্থিব কারণে মৃত্যু কামনা করা হয়, তবে তা ইসলামের দৃষ্টিতে গর্হিত অন্যায়। আলোচিত আয়াতে কোনো পার্থিব কারণে মৃত্যুর কামনা করা হয়নি। আল্লাহতায়ালার সাক্ষাৎ লাভের অধীর আগ্রহ থেকে মৃত্যু কামনা করা হয়েছে। আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ, ব্যাকুলতা একটি উত্তম বৈশিষ্ট্য।

এ প্রসঙ্গে হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাৎকে ভালোবাসে আল্লাহতায়ালাও তার সাক্ষাৎকে ভালোবাসেন।

বর্ণিত আয়াতে নেককারদের সঙ্গে মৃত্যুর কামনা করা হয়েছে। সঙ্গী-সাথীদের পরিবেশ মানুষের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে থাকে। শিক্ষিত-মূর্খ কোনো ব্যক্তি পরিপূর্ণভাবে পরিবেশের প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে না। ভালো থাকার জন্য, ভালো হওয়ার জন্য ভালো পরিবেশ দরকার। পরিবেশ মন্দ থাকলে নিজেকে ভালো রাখা দুরূহ বিষয়। তাই পবিত্র কোরআনে কারিমের অন্যত্র আদেশ করা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! পাপাচার থেকে বিরত থাকো, আর নেককারদের সঙ্গে থাকো।’ -সূরা তওবা : ১১৯

তাই নিজে নেককার, পরহেজগার, খোদাভীরু না হলেও নিজের জীবন-মরণ তাদের সঙ্গে কাটানোর চেষ্টা করা উচিৎ; যারা আল্লাহকে সন্তুষ্ট রাখার জীবনসংগ্রামের সাহসী যোদ্ধা।

Related posts