November 14, 2018

আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এরশাদ বেঁচে থাকবেন সবসমায়

প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এরশাদকে সবচেয়ে সেরা বিশেষণটি দিয়েছিলেন প্রয়াত শিল্পী কামরুল হাসান। ১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হৃদরোগে মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে আঁকা এরশাদের স্কেচের শিরোণাম আজও জানে দেশ । শিল্পীরা মানুষের অব্যক্ত ভাষা বোঝেন। নয় বছর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে থাকা ব্যক্তিটির ধারা ও ভাষা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন কামরুল হাসান। ১৯৯০ থেকে ২০১৬ সাল। মাঝাখানে সময় নদীর জল গড়িয়েছে। তবে কামরুলের দেওয়া বিশেষণটি আজও অপরিবর্তিত রয়ে গেল।

বাংলাদেশের রাজনীতির খেলায় অন্যান্য দেশের তুলনায় চমকটা অনেক বেশি। অন্যান্য দেশে নীতি-নৈতিকতা যতোটা ওপরে স্থান দেওয়া হয়, এখানে তার থোড়াই পরোয়া করা হয়। রাজনীতির বেলায় এখানে প্রচলিত বাক্য হচ্ছে- শেষ বলে কোনো কথা নেই। নব্বই দশক থেকে এ পর্যন্ত এই বাক্যের সত্যতা আমরা বহুবার দেখেছি। বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানীয় দুটি রাজনৈতিক দল এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে রাজপথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করেছিল। অথচ ক্ষমতাচ্যুতির পাঁচ বছরের মাথায় দুটি দলই এরশাদের জাতীয় পার্টিকে দলে টানতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সাধারণ মূল্যবোধটুকু বিসর্জন দিতে কসুর করেনি দল দুটি। প্রকাশ্যে আমরা এমনটাই দেখেছি ২০০৮ সালের নির্বাচনে। একবার ওই দলের যুবরাজ ছুটে গিয়ে এরশাদকে ‘আঙ্কেল’ ডেকে আসেন তো আরেকবার অন্যদলের নেতারা গিয়ে তাকে ‘ভাই’ বলে বুকে জড়িয়ে ধরেন। তখন নিশ্চয়ই এরশাদ বিজয়ীর মুচকি হাসি হেসেছিলেন। নুর হোসেন আর ডাক্তার মিলনসহ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের শহীদরা সেদিন হয়তো ঢুকরে কেঁদেছিল। তবে তাদের সেই কান্না বাতাসে কান পেতে শোনার মতো অবসর এ দেশের রাজনীতিকদের তখন ছিল না।

ক্ষমতায় থাকাকালে এরশাদের বহু কীর্তিকলাপ সরকারি কর্মকর্তাদের হাসির খোড়াক হয়েছে। এটা তো বহুল প্রচলিত গল্প যে, জুমার দিন কোনো একটি মসজিদে হাজির হয়ে তিনি দাবি করতেন, রাতে স্বপ্নে তিনি নিজেকে এই মসজিদে নামাজ পড়তে দেখেছেন। ক্ষমতা থেকে বিদায় এবং রাজনীতিতে পুনর্বাসনের আগ পর্যন্ত জাতি এরশাদের এসব বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বঞ্চিত ছিল। তবে ২০১৩ সালে মহা সমারোহে সেই বিনোদন পর্ব নিয়ে হাজির হয়েছিলেন এরশাদ। ২০১৪ সালের নির্বাচনে যাওয়ার আগে তার পরিচালিত নাটক দেখতে টিভি ক্যামেরা বারবার ছুটে গেছে গুলশানে। সাংবাদিকদের এরশাদ বললেন, তিনি নির্বাচনে অংশ নিবেন না। নিলে জনগণ থুতু দেবে। একদিন না পেরুতেই বেমালুম থুতু গিলে ফেললেন তিনি। বাসায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি দেখে আত্মহত্যার হুমকি দিলেন। হয়তো সময়ের অভাবে সে কাজটি তিনি করতে পারেননি। এরপর ‘অসুস্থ’ হয়ে পড়ায় হাসপাতালে ভর্তি হলেন। সেই ‘অসুস্থ’ অবস্থাতেই নির্বাচন করলেন এবং হাসপাতাল থেকে এসে শপথ নিলেন। শপথের পরের দিনই ‘সুস্থ’ হয়ে তিনি সোজা বাড়ি চলে গেলেন।

এসব কর্মকাণ্ডের অধিকাংশই ছিল নির্বাক কমেডি। মাস না ঘুরতেই এরপর শুরু হলো সবাক কমেডি। আজকে পদত্যাগ করবেন বললে রাত শেষ হতেই সুর পাল্টে ফেলছেন এরশাদ। আজকে সরকারের সমালোচনা তো কালকে অঝোর প্রশংসা। খোদ সংসদেই নিজের দলের অবস্থান নিয়ে যেসব মন্তব্য করেছেন, তাতে অনেক সাংসদই মুখ টিপে হেসেছেন। তিনি যে তার কোনো বাক্যে স্থির থাকেন না এটা ইতিমধ্যে প্রমাণিত সত্য হয়ে গেছে। এ কারণে দলের নেতারাই তার কথা মানতে নারাজ। চলতি সপ্তাহে দলের নতুন কো-চেয়ারম্যান নিয়োগ ও মহাসচিব পরিবর্তন নিয়ে বেশ ভালোই নাটক অনুষ্ঠিত হলো। বিরোধী দলীয় নেতা ও স্ত্রী রওশনকে দলেরই একটি অংশ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন ঘোষণা করেছিল। মঙ্গলবার জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের বৈঠকের পর জাতীয় সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় এরশাদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার সিদ্ধান্ত অটুট থাকবে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি অটল থাকব।’ তবে এরই মধ্যে খবর বেরিয়েছে স্ত্রীর সঙ্গে সমঝোতা করেছেন এরশাদ। তিনি রওশনকে দলের ১ নম্বর কো-চেয়ারম্যান করতে যাচ্ছেন। আর তাতেই ‘অটল’ এরশাদ যে পুনরায় টলেছেন তা বোঝা যাচ্ছে।

রবীন্দ্রনাথ তার `জীবিত ও মৃত` গল্পের শেষ লাইনে লিখেছেন, `কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল যে সে মরে নাই।’ এরশাদ মরেননি সেটা প্রমাণের জন্য তাকে অবশ্য মরতে হবে না। তার এ ধরনের কর্মকাণ্ড অবশ্যই এ দেশের মানুষের মনে হাসির খোরাক জোগাবে। সে হিসেবে বলা যায়, মৃত্যুর আগেই এরশাদ অন্তত এটা নিশ্চিত হতে পারেন, তার রাজনৈতিক কমেডির মধ্যেই তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/মেহেদি/ডেরি

Related posts