September 26, 2018

আলকায়েদা সর্বাধিনায়ক মোল্লা মনসুরকে হত্যার পর

আবু জাফর মাহমুদ

আফগানি আলকায়েদা সর্বাধিনায়ক মোল্লা মনসুরকে হত্যার পর। আবু জাফর মাহমুদ।
আফগানি আলকায়েদার দুর্ধর্ষ টেরর সর্বাধিনায়ক মোল্লা মোহাম্মদ মনসুরকে হত্যার খবর এলো অবশেষে।মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার নির্দ্দেশে ড্রোন হামলায় তার মৃত্যু হয়েছে।এই হত্যাকে কোয়ালিশন বাহিনী নিজেদের আকাশ-ছোঁয়া  বিজয় বলে দাবি করছে।হোয়াইট হাউস,মার্কিণ সিনেট লিডার,রিপাবলিকান সিনেটর এবং মিলিটারী জেনারেলরা তাদের ভাষায় এই কিংবদন্তিকে কাবু করতে পারাকে ভীষণ তাতপর্য্যপূর্ণ বলে দাবি করেছেন।তালেবানরা বলছে,এই হত্যায় কোন বীরত্ব নেই।এটা কাপুরোষোচিত কাজ।

জানা গেলো স্থানীয়দের কাছে মনসুর  ছিলেন প্রবল আশাবাদের প্রতীক,দুর্দান্ত দুঃসাহসের নাম।আফগান বাহিনী এবং  কোয়ালিশন বাহিনীর কাছে সে ছিলো আস্ত জমদূত।অপ্রতিরোদ্ধ শ্ত্রু।এরা সবসময় তালেবানের ভয়ে ছিলো তটস্থ।তাই  যেকোনভাবে তাকে হত্যা করতে পারার মধ্যে ছিলো কোয়ালিশন বাহিনীর মর্যাদার প্রশ্ন জড়িত।তাদের কাছে এই হত্যা করতে পারা একটি বিলিয়ন ডলার ইস্যু।

সেজন্যে প্রকাশ্যে আয়োজন হয়েছিলো একদিকে বৈঠকে শান্তি আলোচনার আসর।অপরদিকে গোপনে চালকবিহিন  উড়োজাহাজ বা ড্রোন থেকে আক্রমণ।যুদ্ধের কৌশলগত ছলচাতুরীতে কোয়ালিশনের পক্ষে অনেক কাংক্ষিত আনন্দ এসেছে নিঃসন্দেহে।তবে এই আনন্দের জন্যে ত্যাগের অংকও বিশাল।শত শত মার্কিণ ও অন্যান্য বিদেশী সৈন্যের সাথে আরো বেশীসংখ্যক আফগান সৈন্য ও অস্ত্র-গোলাবারুদ হারিয়ে,বদনাম তীব্র সমালোচনা কাঁধে নিয়েই অন্ততঃমুখ রক্ষা করেছে মার্কিণ নেতৃত্ব সহ কোয়ালিশন।

নিঃসন্দেহে এতে মনোবল আসলো আফগান এবং কোয়ালিশন বাহিনীর।হাসছে নাচছে তারা,তবে এই হাসিতে অট্টহাসি কি আছে?বুক উঁচু করে করে কি শব্দ করতে পারছে তারা?এই প্রশ্নের ছড়াছড়ি এখন পাহাড়ে জংগলে,বাংকারে সেনা ছাউনিতে।সে যাই হোক, পাওয়া গেলো যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী করে আফগানিস্থানে আমেরিকার অবস্থান দীর্ঘ করার ছাড়পত্র।মার্কিণ রাজনৈতিক শক্তি রিপাবলিকান দলও প্রেসিডেন্ট ওবামার হাসির নৃত্যে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে,শোনেছি।

মুখে কিছুটা হাসি ফুটিয়ে প্রেসিডেণ্ট ওবামা প্রশাসনের বিদায়ের বিকেলের মাসগুলোকে ডিগনিফাইড অনুভবের আরেকটা সুযোগ পেলেন এই ঘটনায়।সিআইএ’র গোয়েন্দাদের সফলতায় হোয়াইট হাউস তালিকায় আরেকটি বিজয় হিসাব করতে পেলো।এক্ষেত্রে আফগান ইস্যুকে ভর করে দক্ষিণ এশিয়ায় যুদ্ধ স্থানান্তর করা নিয়ে অতিক্রম হলো একটা বাধার।শান্তির আলোচনা এবার নীরবেই ধোঁয়ায় মিশে গেলো।বাংলাদেশ-ভারত অঞ্চলে সক্রিয়তার সুযোগ আরো একধাপ অগ্রসর হলো।

একসময় আফগানিস্থান থেকে রাশিয়াপন্থী কম্যুনিষ্ট ভূত তাড়ানোর জন্যে আমেরিকার প্রশাসনের অর্থ ও অস্ত্রের সমর্থনে গড়া এই আলকায়েদা।কম্যুনিষ্টদের পতনের পর উধাও হবার পরবর্তী পরস্থিতিতে সময় মতো আমেরিকা ও কোয়ালিশন বাহিনী আফগান জনগণের নিরাপত্তা এনং সমৃদ্ধির অংশীদার হয়।যার প্রতিক্রিয়ায় তালেবান এবং কোয়ালিশন বাহিনীর সংঘাতের সাথে তালেবানদের আফগানিপ্রতিরোধ যুদ্ধের দীর্ঘ ১৫ বছর  কাটছে।ইতিমধ্যে তালেবান প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের মৃত্যু হয় ২০১৩সনে।তারপর নেতৃত্বের দায়িত্বে ওঠে আসে এই প্রতিভাধর যোদ্ধা মোল্লা মনসুর।

সাহসিকতাও বীরত্বের সফলতা মনসুরকে নেতার পর্যায়ে নিয়ে আসে।অনেক কঠিন ও নিষ্ঠুর অভিযানের নায়ক ছিলেন তিনি।সকল উপদলীয় কোন্দল দমন করে নিজের একধরনের নিয়ন্ত্রন নিরংকুশ করেছিলেন তিনি।তার নেতৃত্বেই তালেবানরা আফগানিস্থানের বিস্তর অঞ্চলে দখল ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।তালেবানরাই বর্তমানে আফগান সরকারের চেয়ে বেশী শক্তিশালী পরিচয়ে আত্নপ্রকাশ করেছে।কোয়ালিশন বাহিনী ফিরে গেলে একদিনও আফগান বাহিনী টিকবে মনে হয়না।এটা সম্ভব করেছে মোল্লা মনসুর।

২২মে শনিবার মার্কিণ ড্রোনের অতর্কিত উপোর্যোপরি হামলা হয় আফগান-পাকিস্তান সীমান্তাঞ্চল কোয়েটায় তার গাড়ীর উপর।তাকে হত্যা করতে পারায় পেন্টাগন ও মার্কিন সরকার এক দীর্ঘ প্রশান্তির নিঃশ্বাস নিয়েছে মনে হচ্ছে।তারপরও আফগানযুদ্ধের ইতিহাসের ছবক হচ্ছে এই জাতি আক্রমণে মাথা নোয়ায়না।পাথরের কংক্রিট ভেদ করে স্ফুলিঙ্গের উত্থান ঘটে এক এক আফগান গেরিলার।

হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়াঃ সিএনএন ও আলজাজিরার সংবাদে জানাযায়,তালেবান নেতার গাড়ী লক্ষ্য করে শনিবার ২২মে ভোর ৬টায় কয়েকবার ড্রোন হামলা করেই তাকে হত্যা করা হয়েছে পাকিস্তান-আফগানিস্থান সীমান্তের দুর্গম এলাকায়।তার পকেটে ছিলো ইরা্নের ভিসাসহ পাশপোর্ট।সংবাদ নিশ্চিত হয়েই ভিয়েতনাম  সফরকালে প্রেসিডেণ্ট ওবামা বলেছেন,“দ্য ডেথ অব মনসুর মার্ক্‌স এন ইম্পোর্ট্যান্ট মাইলষ্টোন ইন আওয়ার লঙষ্টেন্ডিং এফোর্ট টু ব্রিঙ পিচ এন্ড প্রস্পারিটি টু আফগানিস্থান।আফগানিস্থানে শান্তি ও সমৃদ্ধি আনয়নে আমাদের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় এই মৃত্যু গুরুত্বপূর্ণ মেইলস্টোনরূপে চিহ্নিত”।

এই আলকায়েদা নেতা যে মার্কিণ শক্তির কাছে কতটা বিরক্তিকর ছিলো তা আরো বুঝা যায়,মার্কিণ সেনাবাহিনীর জেনারেল যোশেফ ভোটেলের মন্তব্যে।তিনি জর্ডান থেকেই প্রতিক্রিয়ায় বলেন,“মনসুর কেবল তালেবান নেতৃত্বেই গুরুত্বপূর্ণ ছিলোনা,সে হাক্কানী নেটওয়ার্ককে তালেবানে অন্তর্ভূক্ত করা সহ বহু সন্ত্রাসীদেরকে ঐক্যবদ্ধ করায় মূল ভূমিকায় সফল হয়েছিলো।অনেকদিন ধরে সে মার্কিন বাহিনী,কোয়ালিশন শক্তির বাহিনী এবং আফগান বাহিনীর উপর আঘাত করে প্রচুর ক্ষতি করেছে।সে এই ধারায় দীর্ঘকাল যাবত ঘটনা ঘটিয়ে আসছিলো।তার বিদায় হয়েছে,আমি সন্তুষ্ট।আই এম গ্ল্যাড,হি ইজ গন্‌”।

অবশ্য আফগান এবং কোয়ালিশন ফোর্সেসের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে তার কিছু বর্বর কর্মকান্ড প্রতিষ্ঠানে্র  উল্লেখযোগ্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের যেমন মোল্লা জাকির,মোল্লা শিরিন এবং মোল্লা রাজ্জাকের মতো তালেবান কেন্দ্রীয় কাউন্সিল(সুরা)র প্রভাবশালী নীতিনির্ধারকদের সমর্থন পেতে ব্যর্থ করেছিলো।তাদের সমর্থন পুরোটা পরিস্কার ছিলোনা।এই নেতারা সুরার তাৎপর্য্যপূর্ণ নীতিনির্ধারক দায়িত্বে আছেন।এদের বিরোধিতা মনসুরের নেতৃত্ব আইনসিদ্ধ হবার পথে বাধা ছিলো।মনসুরের অনেক অভিযান হয়েছিলো কেন্দ্রীয় সুরার মতামত অগ্রাহ্য করেই।তবুও মনসুরের পাথর কাঁপানো অপারেশন আফগান বাহিনীকে ইঁদুর বানিয়ে রেখেছিলো এবং কোয়ালিশন বাহিনীকে করেছিলো দ্বিধাগ্রস্থ।তাই আজ মনসুর বিনাশের কৃতিত্ব বলতে হবে সিআইএর। সামনাসামনি যুদ্ধে বা যুদ্ধক্ষেত্রে কেউ তাকে পরাস্থ করতে পারেনি।মৃত্যুকালেও মনসুর ছিলো বিজয়ী, চ্যাম্পিয়ন।তাই প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রতিক্রিয়া যথার্থ হয়েছে যখন তিনি বলেছেন,“দ্য ডেথ অব মনসুর মার্ক্‌স এন ইম্পোর্ট্যান্ট মাইলষ্টোন ইন আওয়ার লঙষ্টেন্ডিং এফোর্ট…..।“

তালেবান যোদ্ধাদের মধ্যেকার দীর্ঘ সশস্ত্র সংঘাত ও খুনাখুনির মধ্যে মনসুর প্রতিপক্ষ ও ভিন্নমতাবলম্বীদেরকে দমন করে একধরনের সহমতের ঐক্যে এনেছিলেন বটে।কিন্তু মনসুরের মৃত্যু সম্ভবতঃ আল-কায়েদাকে এক ভয়ানক নেতৃত্বের সংকটে ফেলে দিলো।এমতাবস্থায় ভিন্ন ভিন্ন উপদলীয় বাহিনীর উত্থান সহজ হতে পারতো।কিন্তুদ্রুততার সাথে তালেবান কমান্ড যেভাবে নিজেদের কাঠামো বিন্যাস করে ফেলেছে,তাতে কোউয়ালিশন বাহিনীর শব্দ করে অট্টহাসির সুযোগ থেমে গেলো।মনসুরের সামরিক কর্মকান্ডের মূল শক্তিই হাক্কানী।সে থাকছে সামরিক দায়িত্বের সর্বাধিনায়ক।

মোল্লা মনসুরের অনুপস্থিতিতে ৪ জনের নাম আসে অধিনায়কের পদের জন্যে।জ্যেষ্ঠতার দিক থেকে মনসুরের  দায়িত্ব চালিয়ে নিতে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্যে নিয়োগ দেয়া হয়েছে মোল্লা হায়বাতুল্লাহকে।নতুন নেতা নির্বাচনের জন্যে কাউন্সিল না হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করবেন।মোল্লা ওমরের ছেলে মোল্লা ইয়াকুব  ছাড়াও আছেন মোল্লা জাকির কাইয়ূম এবং সিরাজুদ্দিন হাক্কানি প্রমূখ।এরাও বাহিনীর কমান্ড কাঠামোয় বেশ জাঁদরেল অবস্থানে আছেন।তবে আপাততঃ সব দিক বিবেচনায় নেতৃত্ব কাঠামো ঠিক হয়ে গেছে।

মাওলানা হায়বাতুল্লাহ আখুনজাদা একজন কট্টরপন্থী আলেম।ইসলামের উপর তার অগাধ জ্ঞানের কথা সর্বজন বিদিত।ইসলামী আইনের বিষয়ে তিনি পন্ডিত।তার যুদ্ধের কোন অভিজ্ঞতা নেই,তিনি যোদ্ধা নন।১৯৯৬-২০০১ সন পর্যন্ত তালেবান শাসনামলে তিনি ছিলেন আফগানিস্থানের প্রধান বিচারপতি।পাকিস্তানের কোয়েটায় তালেবানের সর্বোচ্চ সুরায় সিরাজুদ্দীন হাক্কানী এবং মোল্লা মোহাম্মদ ইয়াকুবকে তার ডেপুটি পদে নির্বাচিত করা হয়।

মোল্লা ওমরের বড় ছেলে মোল্লা মোহাম্মদ ইয়াকুব এবং হাক্কানী নেটওয়ার্কের প্রধান সিরাজুদ্দীন হাক্কানি। পাকিস্তানের সীমান্তের অস্থির অঞ্চল এবং ঊত্তর ওয়াজিরিস্থান থেকে পুর্ব ওয়াজিরিস্থান পর্যন্ত ঘাঁটি করে হাক্কানি নিজবাহিনীর নেতৃত্ব করেন।যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় তাকেই প্রতিপক্ষরা ভীতির বিবেচনায় দেখে।সামরিক বিশ্লেষকদের মতে আফগানিস্তানে যুদ্ধের অধিনায়ক হচ্ছেন হাক্কানি।হাক্কানির মাথার মূল্য দশ(১০)মিলিয়ন ইউএস ডলার।তার জনপ্রিয় নাম খলিফা।তিনি আমেরিকান কোয়ালিশনে হামলা করে শত শত সৈন্য মেরেছেন ইতিপূর্বে।
শান্তি আলোচনায় প্রভাব পড়ছে কিনা সেদিকেও নজর দিতে পারি আমরা।নিশ্চয়ই সরকার বা কিউ.সি.জি  অপেক্ষা করতে হচ্ছে নয়া নেতার জন্যে।কিউসিজি কি?এটা হচ্ছে কোয়াডলেটারিয়েল কোঅর্ডিনেশন গ্রুপ। সংক্ষেপে বলা হয় কিউসিজি।এই মধ্যস্থতাকারীরা শান্তির পক্ষে কাজ করছেন।মনোযোগ যুদ্ধ বা রক্তক্ষয় এবং অস্থিরতা থেকে অঞ্চলকে শান্তিতে ফিরিয়ে আনা।

তাই কিউসিজি অপেক্ষা করছে তালেবানের তরফ থেকে প্রকৃত পদক্ষেপ দেখার জন্যে।এই আকাঙ্ক্ষিত শান্তির পরিবেশের আবির্ভাব নির্ভর করছে তালেবানদের আভ্যন্তরীণ মতানৈক্যের দূরত্ব কমিয়ে আনার মধ্যে।অনেকের মধ্যে ধারণা কাজ করছে যে,এতোদিনে শান্তি আলোচনা দীর্ঘসূত্রিতায় থেকেছে মোল্লা মনসুরের ইচ্ছার ভেতর গলদ থাকার কারণে।তিনি তার মতের একচেটিয়া প্রাধান্যের পক্ষে অনড় থেকেছিলেন।তার নেতৃত্বে শান্তি আলোচনা হয়েছে চীন,ফ্রান্স,রাশিয়া এবং পাকিস্তানে।

এখন কথা আসছে শান্তি আলোচনার কি হবে?এই প্রশ্নে আফগান রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইনায়েত উল্লাহ কাকার দাবি করেছেন,পরিস্থিতি খারাপ থেকে আরো খারাপ, এমনকি ভয়াবহ ভয়াল রূপ নিতে পারে।শান্তি আলোচনার টেবিলের এক ভাইকে হত্যা করলেন অন্যভাইকে দিয়ে কথা বলাবেন?কথা হবে।নিজে করলেন হত্যা।হত্যার পথ উসকে দিয়ে কিভাবে শান্তিতে ফিরিয়ে আনবেন?মোল্লা মনসুরকে ফিরিয়ে আনুন?তা পারবেন?

কথাটা বলে রাখা ভালো,যদি সিরাজ হাক্কানি তালেবানের প্রধানরূপে নির্বাচিত হন,তালেবান যোদ্ধারা হবে অত্যাধুনিক সশস্ত্র সামরিক ভান্ডারে সজ্জিত এবং নিঃসন্দেহে তালেবানরা হবে আফগান অঞ্চলে অতিরিক্ত ক্ষমতা এবং সামরিক সফিশটিকেশনে উল্লেখযোগ্য শক্তি।তাছাড়া পাকিস্তান সামরিক বাহিনী এবং আই এস আই এর সাথে যোগাযোগ রক্ষাকারী হাক্কানী নেটোয়ার্ক তালেবান নেতৃত্বের দাবিদার হতেই পারে যেকোন সময়।

কেননা আফগানিস্তানে কর্তৃত্ব বিস্তার সামরিক কৌশল বিবেচনায় পরাশক্তিগুলোর অন্যতম টার্গেট।পাকিস্তানী সৈন্যেরা বালু খেয়েও লড়াই করবে তবু নিজের নিরাপত্তায় ছাড় দিতে রাজী নেই।ভারত লেগে আছে স্যাবোটেজে।এক কদম অগ্রসর হতে পারেনি পাকিস্তানে।আমেরিকা দ্বৈত ভূমিকা নিয়েও সুবিধা করতে পারেছেনা।তাই হাক্কানী পাকিস্তানী মদদ বঞ্চিত হবার কথা নয়।
হাক্কানীরা কেন্দ্রীয় সুরার মতামত অগ্রাহ্য করেই সামরিক অপারেশন করে ফেলে।এজন্যে হাক্কানীগ্রুপকে ভয়ের  যুক্তি আছে বিভিন্ন পর্যায়ে।হাক্কানীরা অবশ্য যুক্তি দেখান এই বলে যে, অনেক সময় পরিস্থিতিই আমাদেরকে আক্রমণ পরিচালনায় বাধ্য করেছে।এক্ষেত্রে থিউরী আর তর্ক বিতর্কের জন্যে অপেক্ষা করলে মৃত্যু চলে আসে তার চেয়ে আগে।করবো কি?তাই বাস্তবতার আলোকেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি।মৃত্যু অথবা বিজয়।এ দুয়ের একটার প্রশ্নে আমাদের আর উপায় থাকেনা।

অধিকন্তু তালেবানদের ভেতরে এমন প্রচারও আছে হাক্কানীগ্রুপ তালেবানের নিজস্ব শক্তি নয়।এই গ্রুপ আঞ্চলিক শক্তির খেলায় আফগানিস্থান এবং ইন্ডিয়ার প্রশ্নে পাকিস্তানের পক্ষ সমর্থক।এমতাবস্থায় তালেবানে হাক্কানীদের বিপক্ষে অন্যন্যদের যুক্তি আছে।আফগানিস্থানে শান্তির বিবেচনায় আঞ্চলিক স্বার্থে চরম নিষ্ঠুরতার পক্ষ নয়,বরঞ্চ সমঝোতার দিকেই মধ্যস্থতাকারীদের মনোযোগ।এতে সমঝোতাপন্থীদের গুরুত্বও বাড়ছে।আবারও আগ্নেয়গিরি তূল্য প্রশ্ন,প্রতিবেশী পাকিস্তানী সমর্থনকে বিচ্ছিন্ন করে বা গুরুত্বহীন বিবেচনা করে আফগানিস্তানে শান্তির আলোচনা কতটুকু ফলদায়ক হতে পারে?সকলেই চায় তার নিজের নিরাপত্তা যেনো অটুট থাকে।

গত ১৫বছর সন্ত্রাস এবং নিষ্ঠুরতা পুরো অঞ্চলকে ক্ষত বিক্ষত করে রেখেছে।এই মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় এনে মানব সমাজের নিরাপত্তা এবং অগ্রগতির পথ নির্দ্দেশনাতেই গ্রহন যোগ্যতা বেশী থাকবে। আফগানিস্থান এবং মার্কিন পক্ষ নিশ্চয়ই সচেষ্ট থাকবে লিবারেল নেতৃত্বে তালেবান আসুক এবং হাক্কানীদের উপর পাকিস্তানী সমর্থন প্রত্যাহৃত হউক।ভারতও তাই চাইবে।

শান্তি আলোচনার প্রশ্নে হাক্কানীগ্রুপের স্পষ্ঠ মতামত হচ্ছে,আমরা বিজয়ী হচ্ছি,দখল করছি একের পর এক বিস্তীর্ণ এলাকা কেনো আমরা দূর্বলের সাথে আলোচনায় ছাড় দেবো?তাই চারিদিকের অনুরোধে চাপে তালেবান-আফগান সরকার বৈঠক হলেও এতে তেমন অগ্রগতির আভাস নেই।তালেবানরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবার পক্ষে।

পাকিস্থান তালেবানের উপর প্রভাব বিস্তার করে শান্তির আলোচনা সফলে সহায়তা দিক এমনটাই আমেরিকান মিত্র পাকিস্তানকে উপদেশ দিয়ে আসছে।চাপও দিয়ে আসছে।পাকিস্তান চীন-ইরানে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হওয়ায় নিজের কোমরে ভর করতে চায় বেশী।এক্ষেত্রে রাজনীতিবিদরা কিছুটা নড়বড়ে হলেও সেনাবাহিনী ও পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা অনড়।

মার্কিণ প্রতিক্রিয়াঃ মার্কিন ড্রোন হামলায় তালেবানের সর্বাধিনায়ক মোল্লা মনসুরকে হত্যা সম্পর্কে বার্মা সফররত সেক্রেটারী অব  ষ্টেট জন কেরি বলেছেন,তিনি পাকিস্তান এবং আফগান সরকারকে উক্ত হামলা সম্পর্কে জানিয়েছেন।তবে তিনি পরিস্কার করেন নি ফোন করেছিলেন কি হামলা করার আগে নাকি পরে?তার স্পষ্ট বক্তব্য,আমেরিকা তার  অংশীদার আফগান সরকারকে সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।আমেরিকান কিছু আইন প্রণেতা অবশ্য এই চাপ দিতেও হোয়াইট হাউসকে অনুরোধ জানিয়েছে,পাকিস্থানকে এফ-১৬ এবং সামরিক সরঞ্জামাধি সরবরাহ যেনো স্থগিত করা হয়। সিনেট ফরেন রিলেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান টেনেসি থেকে নির্বাচিত রিপাবলিকান সিনেটর বব কোর্কার বলেছেন, পর্যালোচনায় পরিষ্কার যে, “তালেবান নেতা মোল্লা আখতার মনসুরের মৃত্যু সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে এক অবস্মরণীয় বিজয় এবং আফাগানিস্তানে আমাদের সৈনিকদের এবং আফগানিস্থান সরকারের জন্যে এই এক আনন্দের সংবাদ”।

সাউথ কেরোলিনা থেকে নির্বাচিত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম যিনি একজন কড়া রিপাবলিকান নেতারূপে সিনেটে পরিচিত, তালেবান নেতা হত্যার সংবাদকে স্বাগতঃ জানিয়ে প্রেসিডেন্ট ওবামাকে অনুরোধ জানিয়েছেন  আফগানিস্থান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার না করতে“যতক্ষণ পর্যন্ত সৈন্যপ্রত্যাহারের পক্ষে অনুকুল না হয়”।তিনি বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছেন,“আমি জেনে আনন্দিত হয়েছি,আফগানি তালেবান নেতা মোল্লা আখতার মনসুরকে বিচারে আনা হবে।মনসুর আফগান জনগণকে এবং কোয়ালিশন শক্তির বাহিনীকে সন্ত্রাস কবলিত করেছে। প্রেসিডেণ্ট ওবামার প্রশংসা করছি এই আক্রমণ পরিচালনার নির্দ্দেশ দেয়ার জন্যে।পদক্ষেপটা এই মিশনে নিবেদিত আমাদের সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সমাজের জন্যে অতি উত্তম হয়েছে”।

পাকিস্থান দারুন বিচলিত এবং অসন্তুষ্ট হয়েছে বিনা নোটিশে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে মার্কিণ ড্রোন প্রবেশ এবং হামলা করায়।শান্তি আলোচনায় শর্ত ছিলো আলোচনাকালীন তালেবানদের উপর হামলা না করার।তারপরেও এই ঘটনায় পাকিস্তানের সাথে আমেরিকার সম্পর্কে কিছুটা বিতর্ক উঠছে।এদিকে মার্কিণ গোয়েন্দা তরফেও পালটা প্রশ্ন আসছে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে তালেবান লিডার কেনো?

কে এই মোল্লা মোহাম্মদ মনসুর?মনসুর ছিলেন ২০০৭সন পর্যন্ত কান্দাহারের গভর্ণর।তিনি তালেবান সরকারের সিভিল এভিয়েশন এবং যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন।পাকিস্তানের কারাগারে ডিটেনশন থেকে মুক্ত হয়ে তিনি ২০০৬সনে আফগানিস্থানে ফেরত গিয়েছিলেন।জাতিসংঘের মতে তিনি ছিলেন আফগান সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সক্রিয় সৈনিক রিক্রুটার।মনসুরকে হত্যা করে ও স্বস্থিতে আছে কি কোয়ালিশন বাহিনী?অথবা তালেবানকি নিস্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছে এই ঘটনা কারণে?নাকি আরো বেশী শক্তি নিয়ে প্রতিশোধের অপেক্ষায় আছে তালেবান বাহিনী?

(লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও চেয়ারম্যান,বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ সংসদ কেন্দ্রীয় কম্যান্ড কাউন্সিল)।

Related posts