November 15, 2018

আর কত দূর খালেদা জিয়ার জাতীয় ঐক্য?

ঢাকাঃ গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর ৩ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে দলমত নির্বিশেষে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যের ডাক দিলেও কার্যকর কোনও উদ্যোগ নিতে পারেননি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এরপর ১৩ জুলাই বিএনপির সিনিয়র নেতা এবং ১৪ জুলাই বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে তার বৈঠক হলেও এখন পর্যন্ত তারও অগ্রগতি জানা যায়নি। কাউন্সিলের ৫ মাস পেরিয়ে গেলেও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি, স্থায়ী কমিটি গঠন করতে ব্যর্থ হয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন। জাতীয় কাউন্সিলে ‘ভিশন ২০৩০’ ঘোষণা করে ‘অচিরেই চূড়ান্ত’ করার কথা থাকলেও কোনও আলামতই নেই তার মধ্যে। দলীয় নেতাদের দাবি, খালেদা জিয়া দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে পরামর্শ করেই রাজনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে মা-ছেলের হাতই থাকে সব সময়।

বিএনপির ঘনিষ্ঠ এক বুদ্ধিজীবী জানান, সম্প্রতি খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তিনি তাকে পরামর্শ দিয়েছেন, যেন দ্রুত সন্ত্রাসবিরোধী জাতীয় ঐক্য বাস্তবায়ন করা হয়। অন্তত পক্ষে খালেদা জিয়া যেন ২০ দলীয় জোটের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে টেবিল টক শুরু করেন।

জানা গেছে, ১ জুলাই হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বিএনপি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৩ জুলাই দলমত নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন খালেদা জিয়া। বিগত দিনে যেকোনও হামলার পর সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুললেও ওই দিন তিনি ঐক্যের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেন। তিনি বলেন, ক্ষমতায় কে থাকবে, কে থাকবে না—তা আজ বড় কথা নয়। দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ আজ বিপন্ন। তাই কালবিলম্ব না করে আসুন আমরা সব ভেদাভেদ ভুলে দলমত নির্বিশেষে সন্ত্রাসবিরোধী ঐক্য গড়ি। গড়ে তুলি নিরাপদ বাংলাদেশ।

সংবাদ সম্মেলনের পর বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোয় আশার সঞ্চার হয়েছিল। সরকারের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা খালেদা জিয়ার পরবর্তী পদক্ষেপের অপেক্ষা করছিলেন। গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন একাধিকবার জানান, তিনিও বিএনপির প্রস্তাবের অপেক্ষায় আছেন।

১৩ জুলাই বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট এবং ১৪ জুলাই বিশিষ্টজনদের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেন খালেদা জিয়া। জোটের বৈঠকে শরিক দলের নেতারা দ্রুত অন্য দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরুর আহ্বান জানান। পরের দিন বিশিষ্টজনদের নিয়ে বসলেও ওই বৈঠকে দ্রুত আলোচনা শুরুর দাবি ওঠে। কয়েকজন বুদ্ধিজীবী জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত বিষয়ে বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করার আহ্বান জানান। এমনকী বিএনপিন্থী বুদ্ধিজীবী ড. এমাজউদ্দীন আহমদ জানিয়েছিলেন, জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনে জামায়াত নিজে থেকেই সরে পড়বে।

ওই পরিস্থিতি ১৬ জুলাই শনিবার কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠক হয় এবং পরদিন ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানের উপস্থিতিতে বিএনপির জঙ্গিবাদবিরোধী ঐক্যে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াত।

বিএনপির পক্ষ থেকে জানা গেছে, দলের ভেতরে জঙ্গিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে আলসেমি থাকলেও সমর্থক-বুদ্ধিজীবী গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিজে থেকে দৌড়ঝাঁপ করেছেন। তিনি সিপিবি-বাসদ, কৃষক শ্রমিক জনতা পার্টিসহ কয়েকটি দলের সঙ্গে কথা বলেছেন। বিএনপির সিনিয়র এক নেতা জানান, ড. এমাজউদ্দীন, জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিজেদের জায়গা থেকে তাগিদ দেন। এটা উচিত, ওটা অনুচিত—এ ধরনের কথা তারা নিয়মিতই বলেন। কিন্তু রাজনীতি অন্য বিষয়।

বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া বন্ধ হচ্ছে না। মূলত তিনটি টিমে বিভক্ত হয়ে কাজ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। লন্ডন সফররত বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশে ফিরলেই তিনটি টিমের কাজ শুরু হবে। এই টিম তিনটি হচ্ছে, ১. রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে ঐক্য, ২. সাংবাদিক, শিক্ষক, লেখক, বুদ্ধিজীবীসহ বিশিষ্টজনদের নেতৃত্বে নাগরিক জোট ও ৩. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও ঢাকাস্থ কূটনীতিকদের সঙ্গে ঐক্যপ্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা। তিনটি টিমের লিডার থাকবেন খালেদা জিয়া। সমন্বয় করবেন মির্জা ফখরুল। প্রথম দুটি টিমে কাজ করবেন অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ও ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তৃতীয় টিমটির নেতৃত্বে থাকবেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান। তার সঙ্গে থাকবেন রিয়াজ রহমান, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, সাবিহ উদ্দীন আহমদ, শামা ওবায়েদসহ সিনিয়র কয়েকজন নেতা।

সূত্র আরও জানায়, জাতীয় ঐক্যের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কোনও সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ নির্দিষ্ট করা হয়নি। এরই মধ্যে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাজা হওয়ায় প্রক্রিয়ায় ছেদ ঘটেছে। যদিও এই তিনটি টিমের কাজে যুক্ত এক নেতার ভাষ্য, তারেককে সাজা দেওয়া হলেও এই মুহূর্তে রাজনৈতিক পলিসি থেকে সরছে না বিএনপি। যত সময় প্রয়োজন, একটি জাতীয় ঐক্য দাঁড় করাবেন খালেদা জিয়া। এই নেতার মত, যত টাইম লাগুক, মূল লক্ষ্য বৃহত্তর ঐক্য।

বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও কেন্দ্রীয়ভাবে কোনও নির্দেশনা দেননি খালেদা জিয়া। যদিও তার উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু দাবি করেন, জাতীয় ঐক্যের প্রক্রিয়া বন্ধ করতেই তারেক রহমানের মামলাটিকে সামনে এনেছে সরকার। এরপরও খালেদা জিয়া ঐক্যের পথ থেকে সরবেন না।

বৃহস্পতিবার তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সাজার রায়কে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকে সিনিয়র নেতাদের জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া চালানোর ব্যাপারে খালেদা জিয়া জোর দেন বলে বৈঠক সূত্র দাবি করে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, বিএনপি প্রধান তো ঐক্যের আহ্বান করেছেন। কিন্তু অন্য রাজনৈতিকদলগুলো সাড়া না দেওয়ায় ঐক্যের ডাক সফল হয়নি। তবে চেষ্টা চলছে, ম্যাডামের নেতৃত্বে ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

এ বিষয়ে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের ভাষ্য, আমরা ম্যাডামকে বলেছি, তিনি যেন দ্রুত একটি প্রক্রিয়া শুরু করেন। জাতি তার উদ্যোগের জন্য অপেক্ষা করছে।

বারবার জাতীয় ঐক্যের ডাক

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিগত দিনে খালেদা জিয়া একাধিকবার বিভিন্ন ইস্যুতে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। চলতি বছরের ২৬ মার্চ বিবৃতিতে তার বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশকে আজও তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করার এক গভীর চক্রান্ত চলছে। কেননা, আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করার অপ-তৎপরতায় দেশি-বিদেশি চিহ্নিত মহল লিপ্ত। এমন দাবি করে জাতীয় ঐক্যকে সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান খালেদা জিয়া।

২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে বড়দিন ও ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময়কালে খালেদা জিয়ার বক্তব্য ছিল, রাজনীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণের সেবা করা। যদি আমাদের লক্ষ্য এক থাকে তাহলে কে বিএনপি, কে আওয়ামী লীগ, কে জামায়াত ও কে জাতীয় পার্টি এটা কোনও বিষয় নয়। আমরা চাই জাতীয় ঐক্য। জনগণ ও দেশের উন্নয়নের জন্য সবার ঐক্য দরকার। মুসলিম-হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে আমরা সবাই বাংলাদেশি। এই দেশের মঙ্গল করাই আমাদের সবার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। ওই বক্তব্যে তার দাবি ছিল, খালেদা জিয়া আরও বলেন, ২০১৫ সাল গণতন্ত্র ও উন্নয়নের বছর এবং জাতীয় ঐক্য ও সম্প্রীতির বছর হিসেবে চিহ্নিত হবে।

কেন বারবার ব্যর্থ হয়েছেন জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে—এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, এটা সফল-বিফলের প্রশ্ন নয়। অপজিশন লিডারকে সব সময় এ ধরনের ডাক দিতে হয়। তাই খালেদা জিয়া প্রয়োজন সাপেক্ষে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। এ কারণে এটাকে ব্যর্থতা বলা যাবে না।

স্থবির কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন ও ‘ভিশন ২০৩০’ প্রক্রিয়া

এদিকে, ১৯ মার্চ কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হলেও অদ্যাবধি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিসহ বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ বডিগুলো তৈরি করতে পারেননি খালেদা জিয়া। কাউন্সিলে তিনি দ্রুত কমিটি তৈরির ঘোষণা দিলেও বারবার কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া পিছিয়েছে। গেল রমজানে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ একাধিক নেতা জানিয়েছিলেন, রমজানেই স্থায়ী কমিটি, কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষিত হবে।

বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র দাবি করে, রাজনৈতিকভাবে খালেদা জিয়ার দিকে বিএনপির মনোযোগ থাকলেও দলটির সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তারেক রহমানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন ও স্থায়ী কমিটিতে কাদের জায়গা হবে—এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে মা-ছেলের মধ্যে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটিসহ একাধিক পর্যায়ের নেতাকে কমিটি গঠনের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তারা অপারগতা জানান। তাদের বেশির ভাগ নেতার ভাষ্য, এ নিয়ে প্রচুর কথা হয়েছে।

একইভাবে কাউন্সিলে ঘোষিত ‘ভিশন ২০৩০’ পূর্ণাঙ্গকরণে উদ্যোগ নেই খালেদা জিয়ার। ১৯ মার্চ তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, সবার সুচিন্তিত পরামর্শের ভিত্তিতে সমৃদ্ধ দেশ এবং আলোকিত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে বিএনপি ইতোমধ্যেই ‘ভিশন ২০৩০’ শিরোনামে একটি বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা খসড়া প্রণয়ন করেছে। আমি আনন্দের সঙ্গে জানাতে চাই, অচিরেই ‘ভিশন ২০৩০’ চূড়ান্ত করা হবে।

বিএনপি সূত্র জানায়, ‘ভিশন ২০৩০’ নিয়ে আপাতত কোনও কার্যক্রম নেই বিএনপিতে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ভিশনকে নির্বাচনের ইশতেহারে পরিণত করবে দলটি।

‘ভিশন ২০৩০’ প্রসঙ্গে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন বলেন, এটা বন্ধ হয়নি। কাজ চলছে। কাউন্সিলের পর কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের কাজের পাশাপাশি এ কাজটিও শেষ হবে। এছাড়া গঠনতন্ত্রে সংশোধন এসেছে। এ কারণে একটু সময় লাগবে। আশা করা যায়, কমিটি গঠনের পরই ‘ভিশন ২০৩০’ প্রকাশ করা হবে

Related posts