November 14, 2018

আর্মার্ড কার আনতে চায় চারটি দেশ

ঢাকাঃ বিদেশি কূটনীতিক ও নাগরিকদের নিরাপত্তায় সরকারি তৎপরতা আরো জোরদার হচ্ছে। চারটি দেশ তাদের দূতাবাসের জন্য আর্মার্ড কার আমদানির যে প্রস্তাব করেছে তার যৌক্তিকতাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গুলশানে জঙ্গি হামলার প্রেক্ষিতে কূটনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্ট উদ্বেগ-আতঙ্ক নিরসন, কূটনীতিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান এবং নিরাপত্তায় যে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণসহ নিরাপত্তা সংক্রান্ত কূটনীতিকদের যাবতীয় আবেদন বিবেচনায় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনায় এবার ‘সমন্বিত টাস্কফোর্স’ গঠন করা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর নেতৃত্বে গঠিত ৮ সদস্যের ওই টাস্কফোর্সে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট সরকারের সব বিভাগ এবং সংস্থার প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে। আজ বিকাল তিনটায় রমনাস্থ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় নবপ্রতিষ্ঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হবে। সরকারের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রে এই তথ্য মিলেছে। সূত্র মতে, সরকারের তরফে বিদেশিদের নিরাপত্তায় নানামুখী উদ্যোগ চলমান রয়েছে। স্বল্প এবং দীর্ঘ মেয়াদি দু’ধরনের নিরাপত্তা পরিকল্পনা রয়েছে।

গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় জঙ্গি হামলায় দুজন পুলিশ কর্মকর্তাসহ দেশি-বিদেশি ২২ নাগরিক নিহত হওয়ার পর তাৎক্ষণিক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বিদেশিদের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। কূটনৈতিক জোনখ্যাত গুলশান-বনানী, বারিধারায় কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও বিদেশিদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিজেদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকারকে অনুরোধ জানিয়ে পৃথক চিঠি দিয়েছে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস। তারা নিজেরা সতর্ক হয়ে চলাফেরা করছেন। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, স্পেন, ফ্রান্স তাদের কূটনীতিক ও নাগরিকদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত বেসরকারি কর্মীদের অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছে। তারা এ নিয়ে প্রতিনিয়ত সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করে চলেছেন। সমপ্রতি কানাডা, জাপান, ইতালি ও নেদারল্যান্ডস তাদের দূতাবাসের জন্য বুলেটপ্রুফ ও বিস্ফোরক নিরোধক উন্নত প্রযুক্তি সমৃদ্ধ গাড়ি (আর্মার্ড কার) আমদানির অনুমতি চেয়েছে। গত বছরে গুলশানে ইতালির নাগরিক সিজার তাবেলা খুনের পর থেকে ঢাকাস্থ স্পেন দূতাবাস তাদের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র বহনকারী তিন স্প্যানিশ পুলিশ মোতায়েনের জন্য বাংলাদেশের অনুমতি চেয়ে আসছে।

হলি আর্টজানে জঙ্গি হামলার পর স্পেন তাদের আবেদনটি ফের সরকারের বিবেচনায় এনেছে। তারা এ নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিদেশিদের ওই সব আবেদন পর্যালোচনা হচ্ছে। দেশের বিদ্যমান আইন এবং বিদেশিদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ ও নির্দেশনার সঙ্গে ওই সব আবেদনের সঙ্গতি-অসঙ্গতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে আবেদনগুলোর বিষয়ে স্বরাষ্ট্র এবং আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতও চাওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষ করে ভিয়েনা কনভেনশন মতে, বিদেশি দূতাবাস, নিযুক্ত কূটনীতিক, স্টাফ ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তার দায়িত্ব তারা যে দেশে কর্মরত সেই দেশের। সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের বাড়তি নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে তাতে হোস্ট কান্ট্রির অনুমতি বাধ্যতামূলক। সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র মতে, বিদেশিদের অস্ত্র ও আর্মার্ড ভেহিকেলসহ নিরাপত্তায় ব্যবহারের যে সব সরঞ্জামাদি আনার যে আবেদন পড়েছে তা দেশের বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পর্যালোচনা করবে নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমন্বিত টাস্কফোর্স। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত ইতিবাচক উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কি হবে জানি না।

এ নিয়ে সরকারের অভ্যন্তরে ইতিবাচক আলোচনা রয়েছে। পুরো বিষয়টি টাস্কফোর্সের সভায় ওঠবে।

আসছে মার্কিন দল: এদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ দমনে সহযোগিতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে আগামী সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদ দমন বিশেষজ্ঞদের এক প্রতিনিধি দল ঢাকা আসছে। এ সময় তারা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যকে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেবে। হাতেকলমে ওই প্রশিক্ষণের জন্য কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে আসবে মার্কিন প্রতিনিধি দল।

বিদেশিদের নিরাপত্তায় গাইড লাইন প্রণয়নের তাগিদ: বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশিদের নিরাপত্তার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন প্রণয়নসহ ছয়দফা সুপারিশ করেছেন বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা। গুলশানে জঙ্গি হামলার পর নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এ সুপারিশ করেন তারা। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সমপ্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ১৪ই জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, গুলশানে বিদেশি নাগরিকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার পর বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের নিয়ে ৫ই জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় বাংলাদেশে অবস্থিত প্রায় সব দূতাবাস/মিশনের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। আলোচনাকালে বিদেশি কূটনীতিকরা কূটনীতিক পাড়া এবং তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন।

ওই বৈঠকে কূটনীতিকপাড়া ও তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তায় একটি গাইডলাইনসহ ছয়দফা সুপারিশ করেন কূটনীতিকরা। সুপারিশগুলো হচ্ছে- কূটনীতিকদের বাসভবনে অতিরিক্ত নিরাপত্তা দেয়া, তারা যেসব স্থাপনায় নিয়মিত যাতায়াত করেন সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা, যেমন- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গুলশান সুপার মার্কেট, মসজিদ ও হাসপাতাল, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, বিদেশি ক্লাব, রেস্টুরেন্ট ও বিভিন্ন ক্যাফে। পাশাপাশি বিমান বন্দরের ভিভিআইপি লাউঞ্জে স্বতন্ত্রভাবে চেক-ইন ও মালামাল স্ক্যানিং করা এবং কোনো অনাকাঙিক্ষত ঘটনার পর দূতাবাস ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোকে নিয়মিতভাবে অবহিত করা। এছাড়া, ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কর্মরত সাহায্য সংস্থার কর্মীদের নিরাপত্তা জোরদার করা। বিদেশিদের তাগিদ এবং সরকারের নিজস্ব মূল্যায়নে তাৎক্ষণিক কূটনীতিকপাড়া ও সারা দেশে থাকা বিদেশিদের নিরাপত্তায় অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়। কূটনীতিক ও বিদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করতে সরকারের তরফে দীর্ঘমেয়াদি বেশকিছু উদ্যোগ এখনও চলমান রয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়ে বিদেশিদের পুরোপুরি আশ্বস্ত করতে আর কি করা যায়- তা নিয়ে আজকের টাস্কফোর্সের বৈঠকে আলোচনা হবে।

জাপানের চিঠি, সরকারের উদ্যোগ: গুলশান হামলার পর জাপান প্রতিনিয়ত তাদের নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা সতর্কতা হালনাগাদ করে চলেছে। ঢাকাস্থ জাপান দূতাবাসের কর্মীদের ছুটির মেয়াদ দু’দফা বাড়ানো হয়েছে। আগামী ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত তারা ছুটিতে থাকছেন। এ অবস্থায় ঢাকায় জাইকা প্রেসিডেন্টের পূর্বনির্ধারিত সফর স্থগিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে থাকা জাপান দূতাবাসসহ দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করতে সরকারকে কয়েক দফা চিঠি দেয়া হয় দূতাবাসের তরফে। তাদের চিঠির প্রেক্ষিতে সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটির আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থার (জাইকা) ঢাকা কার্যালয়, সারা দেশের প্রকল্প, জাপানি স্কুলের ছাত্রছাত্রী, জাপান দূতাবাসের কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সমপ্রতি জাপান সরকার ঢাকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় থাকা জাপানি এইড ওয়ার্কারদের নিরাপত্তার জন্য বুলেটপ্রুফ গাড়ি এবং অন্যান্য উপকরণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাপানের সিনিয়র উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেইজি কিহারা বলেন, সন্ত্রাসীরা এখন জাপানের নাগরিকদের টার্গেট করছে। এ কারণেই নিরাপত্তার জন্য যে কোনো মূল্যে আমাদের চিন্তা-ভাবনা পরিবর্তন করতে হবে।

Related posts