September 21, 2018

আম্রনামা

আম্রনামা

প্রকৃতির এক সুন্দর, সুস্বাদু ও সুগন্ধময় ফল আম। এছাড়াও আম একটি পুষ্টিমান সমৃদ্ধ ফল। আর সুদর্শন, সুস্বাদু জনপ্রিয়তার কারণেই হয়তো এই ফলটি ভারত, পাকিস্তান ও ফিলিপাইনের জাতীয় ফল। দেশের ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে গিয়ে ইত্যাদি ধারণের ধারাবাহিকতায় আমরা গত ৮ এপ্রিল গিয়েছিলাম আমের রাজধানী বলে খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে ইত্যাদি ধারণ করতে। ভূমি গঠন ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী এই এলাকাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ভূ-ভাগ বলা হয়। এ জেলার বিভিন্ন স্থানে বিশাল বিশাল এলাকাজুড়ে চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন সব আম বাগান বা আম্রকানন। আর এই আম্রকাননেই ঘটেছে আমাদের ইতিহাসের নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননের যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে যেমন আমাদের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল তেমনি ১৯৭১ সালে বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার। মহান ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায়। শুধু তাই নয়, আমাদের অনেক আন্দোলন, সংগ্রামের সিদ্ধান্ত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলাতে। আরো গুরুত্বের বিষয় হলো—আম গাছকে দেওয়া হয়েছে জাতীয় বৃক্ষের মর্যাদা, আর আমকে বলা হয় ফলের রাজা। আর সেই আমের রাজধানী এই চাঁপাইনবাবগঞ্জ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ বরেন্দ্র অঞ্চল গৌড়ের, বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন ও প্রত্ন সম্পদে সমৃদ্ধ একটি জেলা, যা সুলতানী আমলে গৌরবের শিখরে উন্নীত হয়। নবাব মুর্শিদকুলী খানের শাসনামলে বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করা হলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গুরুত্ব অনেকাংশে বেড়ে যায় এবং তখন থেকেই বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন শুরু হয়। শুধু ঐতিহাসিক নিদর্শনেই সমৃদ্ধ নয়, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধেও এখানকার মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবময়।

যেহেতু আমের রাজধানীতে গিয়েছিলাম তাই অনুষ্ঠানের স্বার্থেই আমের ওপর একটি প্রতিবেদন করতে গিয়ে কথা বলেছিলাম বেশ ক’জন আম গবেষক, আম ব্যবসায়ী, বাগান মালিক, আম চাষী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ক’জন বিজ্ঞানীর সঙ্গে। তারা জানালেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে প্রতিবছর প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকার আম বিক্রি হয়। আমের মৌসুমে এখানে ৮ থেকে ১০ লক্ষ লোক আম গাছ পরিচর্যা, বাগান পরিষ্কার রাখা, আম সংগ্রহ, বিক্রি ও পরিবহন ইত্যাদি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন।

আমাদের দেশের প্রায় সব এলাকাতে কম বেশি আম জন্মালেও চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর ও পাবর্ত্য চট্টগ্রামে বাণিজ্যিকভাবে উন্নতমানের আম উত্পাদিত হয়। তবে আমাদের দেশে সিংহভাগ আম উত্পাদিত হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ও এর আশেপাশে। ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে আমাদের দেশে আমের মুকুল আসা শুরু হয়। এরইমধ্যে আমরা আমের মুকুলের মৌ মৌ গন্ধের সময়টা পার করে এসেছি।

পাকা আম সুস্বাদু হলেও কাঁচা আমও কম লোভনীয় নয়। এর মধ্যে কাঁচা-মিঠা আমসহ নানা ভালো জাতের আম কাঁচা অবস্থায় মশলা মাখিয়ে চাটনী করে মোরব্বা ও আচার তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। তবে রসালো আম মৌসুম শেষে আমসত্ব, আমচুর, জেলী, জ্যামের মাধ্যমে সারাবছর আমাদের কাছে সহজলভ্য হলেও পাকা আমের তাজা স্বাদ বছরে একবারই পাওয়া যায়।

আকার-আকৃতি, স্বাদ এবং স্থানভেদে বিভিন্ন ধরনের আম দেখা যায়। আমাদের দেশে জনপ্রিয় আমের প্রজাতিগুলো হলো—গোপালভোগ, খিরসাপাত বা হিমসাগর, হাড়িভাংগা, ল্যাংরা, রানীপসন্দ, লখনা, লোহাচূড়া, সূর্যপুরী, বোম্বাই, চোষা, সুরমা ফজলী, ফজলী, আশ্বিনা, আম্রপলি। এসব আম একসাথে নয়, বিভিন্ন সময়ে পরিপক্ক হয় এবং বাজারে আসে। প্রাকৃতিকভাবে পাকার পরেই আম সংগ্রহ করা উচিত। কারণ তাপমাত্রা, পরিবেশ, আমের জাত ও অবস্থানগত কারণে বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন সময় আম পাকে। তাই বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন জাতের আম সংগ্রহ করার সময়েরও তারতম্য ঘটে। বিশ্বে সবচেয়ে সুস্বাদু এবং মূল্যবান আম জন্মে ভারতের গোয়ায়, নাম ‘আল ফানসো’।

আম গাছের সুস্বাদু ফলের জন্য আঁটি বা বীজ থেকে নয়, বরং কলমের মাধ্যমে ভালো জাতের গাছ থেকে চারা তৈরি করতে হয়। গাছের মুকুলকে স্বাগত জানিয়ে এই সময় থেকেই আম গাছের কিছু নিয়মতান্ত্রিক পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। আম গবেষক অথবা কৃষি কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে এবং তাদের অনুমোদিত পদ্ধতিতে ঝুঁকি মুক্ত ও রপ্তানি যোগ্য আম উত্পাদন সম্ভব। কেউ কেউ মনে করেন ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরাপদ বিষমুক্ত ও রপ্তানি যোগ্য আম উত্পাদন সম্ভব। তাদের মতে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে পোকার আক্রমণ ও শতভাগ রোগবালাই থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

তবে বেশি ফলনের আশায় গাছের গোড়ায় কালটার বা লবন দেওয়া যেমন বন্ধ করতে হবে তেমনি বেশি মুনাফার জন্য ক্যালসিয়াম কার্বাইড প্রয়োগ করে অসময়ে আম পাকানো এবং ফরমালিন ব্যবহার করে বেশিদিন সংরক্ষণ করার পদ্ধতিও পরিহার করতে হবে। এসব পদ্ধতি আম শিল্পের জন্য যেমন বিপজ্জনক, জনস্বাস্থ্যের জন্যও তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই আম সংগ্রহের মৌসুমে আমে বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল প্রয়োগ ঠেকাতে আম সংরক্ষণাগার বা বিভিন্ন আড়তে প্রশাসনিক নজরদারী বাড়ানোর পাশাপাশি মিডিয়াতে আমের বিষয়ে সর্তক মন্তব্য এবং সঠিক তথ্য প্রচার করা উচিত বলে মনে করেন কৃষি বিজ্ঞানীরা। না হলে আম চাষী ও আম ব্যবসায়ীরা তথ্য বিভ্রান্তির স্বীকার হন। উল্লেখ্য, অন্যান্য ফসলের চেয়ে আম চাষে ৪/৫ গুণ বেশি লাভ হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি আম গাছ থেকে তার জীবদ্দশায় ফল বিক্রি এবং পরিশেষে গাছ বিক্রি করে যে মূল্য পাওয়া যায় তা জাত ভেদে ৫ থেকে ৮ লক্ষ টাকা। আম গাছ একটি পরিবার, দেশ ও জাতির জন্য হতে পারে একটি মূল্যবান সম্পদ। তাই আম গাছের বৃদ্ধি এবং নিরাপদ আম উত্পাদনের জন্য সবারই সচেষ্ট থাকা প্রয়োজন।

এবার একটি ব্যতিক্রমী আম সুসংবাদ—আমরা যখন এই অনুষ্ঠান ধারণ করছি তখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গাছে গাছে লক্ষ লক্ষ ছোট ছোট আম দেখা গেলেও আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্বের গবেষণা কেন্দ্রের অভ্যন্তরের কয়েকটি গাছে দেখা গেছে বেশ বড় বড় আম। এগুলোকে বলা যায়, অমৌসুমি আম। যেগুলো শীতকালেও পাওয়া যায়। এই আমের বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে-এগুলো ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত পাওয়া যাবে। দেখতে আকর্ষণীয়, খেতে সুস্বাদু এই আমটি গাছেই হলুদ রঙ ধারণ করে। ২০০২ সাল থেকে এই কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জমির উদ্দীন এই অমৌসুমি আম নিয়ে গবেষণা করছেন। আর এই প্রচেষ্টা সার্থক হলে আম ভক্ত মানুষদের জন্য সুসংবাদ বয়ে নিয়ে আসবে।

লেখক :গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, পরিবেশ ও সমাজ উন্নয়ন কর্মী।

Related posts