November 19, 2018

”আমি কি করবো? আমার কিইবা করার আছে”

499

একমাত্র ছেলে হত্যার পর ৩০ দিন পার হতে চললেও এ ঘটনার তদন্তে তেমন কোন অগ্রগতি না হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন নিহত প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক।

মামলার অগ্রগতি জানতে যোগাযোগ করলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, “এ নিয়ে কি বলবো? পুলিশ কোনো অগ্রগতি হয়েছে বলে জানায়নি। আমি কি করবো? আমার কিইবা করার রয়েছে।”

গত ৩১শে অক্টোবর দুপুরে রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ে এর সত্ত্বাধিকারী দীপনকে জবাই করে হত্যার পর শার্টার লাগিয়ে চলে যায় দুর্বৃত্তরা।

দীপন খুন হয়ে যাওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেছিলেন, “আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয় পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পক্ষের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। এটুকুই আমার কামনা। জেল-ফাঁসি দিয়ে কী হবে।”

একমাত্র ছেলেকে হারানোর পরও অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক এক এমন বক্তব্য দেওয়ায় সারা দেশের মানুষ প্রচণ্ড আলোড়িত হন। গত কয়েক মাস ধরে একের পর টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনায় সরকারি ব্যর্থতা নিয়ে সরব হয় জনগণ। দেশের সুধীজনরাও আওয়াজ তোলেন ‘বিচার চাই না, শুভবুদ্ধির উদয় হোক’।

কিন্তু ঘটনার পর ৩০ দিন পার হতে চললেও দীপন হত্যার তেমন কোন অগ্রগতি যেমন হয়নি, তেমনি শুভবুদ্ধিরও উদয় হয়নি। বরং শাসক শ্রেণীর মধ্যে বিবাদমান প্রধান দুই গোষ্ঠীর বিরোধ আরো তীব্রতর হয়েছে।

এরই মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিরোধী পক্ষ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এই ফাঁসির ঘটনায় সরকারি পক্ষ আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র বামপন্থীরা প্রকাশ্যে মিষ্টি খেয়েছে ও আনন্দ মিছিল করেছে।

এই ঘটনার পর বাংলাদেশ থেমে থাকেনি। বরং গণতন্ত্রহীনতার সুযোগে বেড়ে ওঠা সন্ত্রাসবাদীরা দীপন হত্যার পরও সক্রিয়ভাবে অস্তিত্বের জানান দিয়ে যাচ্ছে।

সর্বশেষ ২৬ নভেম্বর সন্ধ্যার পর বগুড়া শিবগঞ্জ উপজেলার হরিপুর-চককানু গ্রামে শিয়া সম্প্রদায়ের আল-মোস্তফা জামে মসজিদে মুসল্লিদের উপর গুলি চালালে মোয়াজ্জিন মোয়াজ্জেম হোসেন (৬০) নিহত হন।

একের পর এক সন্ত্রাসী হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ঘটনার নানা ক্লু দেওয়া হলেও তারা হামলা রহস্য উদ্ঘাটন ও প্রকৃত অপরাধীদের ধরতে পারছে না।

উল্লেখ্য, দীপনকে হত্যার পর আজিজ মার্কেটের ব্যবসায়ীরা সিসিটিভির ফুটেজ দেখে ছয়জন তরুণকে হত্যায় জড়িত বলে শনাক্ত করেছেন। তারা ছয়জনের ছবি পুলিশকেও দেখিয়ে ছিলেন।

আজিজ মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সভাপতি নাজমুল আহসান জানান, সিসিটিভিতে দেখা গেছে ঘটনার দিন শনিবার দুপুর ২টা ১০ মিনিটে মার্কেটের পূর্ব পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকারযুক্ত একটি প্রাইভেটকার থেকে নামেন দীপন। গাড়ি থেকে নেমে তিনি মার্কেটে প্রবেশ করেন। ওই সময় একজন যুবককে সন্দেহজনক ভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে।”

তিনি বলেন, “ওই যুবক দুপুর ২.১৫টায় গাড়ি পার্কিং সংলগ্ন গেট দিয়ে মার্কেট ভবনে ঢোকে এবং দুপুর ২.৫৪টায় পূব দিকের গেট দিয়ে মার্কেট থেকে বেরিয়ে যায়।”

বেরিয়ে যাওয়ার সময় ওই যুবকের সঙ্গে আরো পাঁচজন ছিল বলে জানান ব্যবসায়ী নাজমুল আহসান।

তিনি বলেন, “দীপনের প্রাইভেটকারের আশপাশে সন্দেহভাজন ছয়জনকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। তারা গাড়ির নম্বর লিখছিল এবং মোবাইলে কথা বলছিল। তাদের বয়স ২০-২৫ বছরের মধ্যে। তাদের পরনে ছিল জিন্সের প্যান্ট ও শার্ট।”

তিনি আরো বলেন, “ছয় যুবকের মধ্যে দুজনের কাঁধে সব সময় দুটি ভারি ব্যাগ ছিল। ”

আজিজ মার্কেট দোকান মালিক সমিতির এ সভাপতি বলেন, মার্কেটের ১৪টি প্রবেশ পথ রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি সিসিটিভির পর্যবেক্ষণে থাকলেও বাকি চার ফটকে নাই।

দীপনের সন্দেহভাজন খুনীদের চলাফেরার দৃশ্য মার্কেটের পূর্ব দিকের ও পার্কিং এলাকায় স্থাপিত সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে আজিজ সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী ও শ্রাবণ প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী রবিন আহসান জানান, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে বসে আজিজ সুপার মার্কেটের সামনের অংশ থেকে নেওয়া সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়।

রবিন বলেন, “ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হয়েছে সন্দেহভাজন ছয়জনকে। তাদের পরনে ছিল জিন্সের প্যান্ট ও শার্ট। কারও পায়ে ছিল স্যান্ডেল। কারও চুল ছোট করে কাটা।”

তিনি বলেন, “দীপন প্রাইভেটকার থেকে নামার পরপরই উঁকি দিয়ে গাড়ির ভেতরে কেউ দেখছিল। আবার কেউ গাড়ির নম্বর লিখে রাখে। একজনকে আজিজ সুপার মার্কেটের ভেতরে যেতে দেখা যায়। ভিন্ন ভিন্ন সময় তারা আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে গেলেও ৩টার দিকে ওই ছয়জনকে একসঙ্গে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে দেখা যায়।”

তিনি আরো বলেন, “যারা দীপন কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নিয়েছে, হয়তো তাদের সহযোগী টিমের সদস্য ছিল এই সন্দেহভাজন ছয়জন। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কিলিং মিশনের সদস্যদের তথ্য সরবরাহ করছিল।”

কিন্তু দীপন হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশের ডিসি (দক্ষিণ) মাশরুকুর রহমান খালেদ গণমাধ্যমকে বলেন, দীপনের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করার জোর প্রচেষ্টা চলছে। পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে মামলাটি তদন্ত করছে।”

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts