November 19, 2018

আমরা শিক্ষার্থী নাকি পরীক্ষার্থী?


রাজু আহমেদ
চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিয়মানুযায়ী, নতুন কোন মেডিসিন আবিষ্কার করার পর তার কার্যকারিতার পরীক্ষা চালানো হয় মানবেতর প্রাণীর দেহে প্রয়োগ করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত ওষুধ সঠিক হলে মানবেতর প্রাণী প্রাণে রক্ষায় পায় কিন্তু যদি সে ওষুধ তৈরির রাসয়নিক উপাদানের মিশ্রনে কোন ধরনের ত্রুটি হয় তবে প্রাণ দিতে হয় সেই সকল মানবেতর প্রাণীগুলোকে, যেগুলোর ওপর ওষুধের প্রাথমিক পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। কখনো কখনো পশুগুলো প্রাণে মারা না গেলেও পঙ্গুত্ববরণ করে সারা জীবনের জন্য। বাংলাদেশের শিক্ষা পদ্ধতিতে নব নব সংযোজিত পরীক্ষণমূলক ধারা শিক্ষার্থীদের যতটুকু উপকার সাধন করেছে, তার চেয়ে অপকার কম করেনি।  দু’পদ্ধতির(উচ্ছেদ-প্রবর্তন) শিক্ষা প্রণালীর মধ্যবর্তী প্রজন্ম খাঁদের কিনারায় ঠেকেছে বারবার। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন তথা ড. কুদরত-ই-ক্ষুদা শিক্ষা কমিশন থেকে শুরু করে সর্বশেষ অধ্যাপক কবির চৌধুরী শিক্ষা কমিশন পর্যন্ত-শিক্ষা ক্ষেত্রে সাধন করা হয়েছে বহুল পরিবর্তন। কিন্তু সবগুলোই ছিল কেবল পরীক্ষণের পর্যায়। শিক্ষানীতির ব্যাপারে রাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কোন স্থায়ী সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি বরং আবারও ড. কুদরত-ই-ক্ষুদা প্রণীত শিক্ষানীতিতে প্রত্যাবর্তনের চিন্তা চলছে এবং তার আংশিক বাস্তবায়নও হয়েছে।
….
বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে বারবার শিক্ষা নীতির সমূল পরিবর্তন করা হয়েছে। এটার দ্বারা রাষ্ট্রের দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার দারিদ্র্য ভাব প্রকাশ পেয়েছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে শত বছর পূর্বে যে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছিল, সেটাকে ঠিক রেখে তার সাথে নতুন কিছু সংযোজিত হয় বটে কিন্তু আমাদের দেশে বিয়োজন হয় বেশি। যার কারণে দেশের শিক্ষার পরিবেশে এখন পর্যন্ত কোন স্থির রূপ আমরা পাইনি। যে শিক্ষকদের কাছে আমরা উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করছি তাদের কাছে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়, তাদের উচ্চশিক্ষায় কত নম্বরের কোর্স ছিল? তখন তাদের উত্তরে যা পাওয়া যায় তাতে তাদের বেশিরভাগেই ১২০০-১৬০০ নম্বর অধ্যয়ণ করেছে। অথচ তাদের ছাত্রদের অধ্যয়ণ করতে হচ্ছে ৪০০০-৪৮০০ নম্বর। তাতেও আবার অপরিকল্পনার ছাপ স্পষ্ট। যে কারনে মাঝে মাঝে আমরা ভুলে যাই, আমরা আদতে শিক্ষার্থী নাকি পরীক্ষার্থী?
….
আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষার মূল উপাদান (শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষালয় ও পাঠ্যক্রম) এর ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা চর্চার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি পদ্ধতি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে রুশো, হার্বাট স্পেন্সার ও রবীদ্রনাথের প্রকৃতিবাদ, প্লেটো, কান্ট মহাত্মা গান্ধীর ভাববাদ, ইউরোপের রেঁনেসা প্রসূত বাস্তবাদ, উইলিয়াম জেমস, জন ডিউঈ এবং এফ সি শীলারের প্রয়োগবাদ, জ্যা পল সার্ত্রে এবং সি এস পার্সের অস্তিত্ববাদ অন্যতম । আমাদের দেশে যে এর কোন পদ্ধতির অনুসরণ করা হচ্ছে তার দিশা পাওয়াই মুশকিল। শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে ফ্রেডরিক ফ্রয়েবলের কিন্ডার গার্ডেন পদ্ধতি ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে । কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষা পদ্ধতি যে কখন, কিভাবে, কোন ধারায় পরিবর্তিত হচ্ছে তার খোঁজ খবর রাখাও কঠিন কাজ। শিক্ষাক্ষেত্রে রাষ্ট্র একেক পদ্ধতির আনয়ন করে, হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়, বই ছাপায়, সভা-সেমিনার-সিম্পোজিয়াম করে, জনগণকে চলমান শিক্ষা পদ্ধতির গুরুত্ব ও তাৎপর্য বোঝায়-কিছুদিন পরেই জানা যায় সে পদ্ধতি ফলপ্রসু নয় বলে ওটা থেকে রাষ্ট্র বিমুখ হয়েছে। অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক জন লক যে অর্থে শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘সুন্দর দেহে সুন্দর মন সৃষ্টিই শিক্ষার লক্ষ্য’ সে অর্থে আমাদের রাষ্ট্র শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারন করেনি । কিন্ডার গার্ডেনে কিংবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গমনকারী শিক্ষার্থীর কাঁধে যে পরিমান বইয়ের বোঝা চলমান শিক্ষানীতি চাপিয়েছে তাতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার প্রতি তুমুলভাবে ভীত হচ্ছে এবং তাদের প্রকৃতির অবাধ বিকাশ সাধন হচ্ছে না।
….
দেশের ভৌগলিক, আর্থ-সামাজিক এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের প্রতি সম্মান রেখেই বিশ্বের সকল দেশে শিক্ষানীতি প্রনয়ন করা হয়। কাজেই খ্রিষ্টান অধ্যুষিত দেশে বাইবেল প্রধান, হিন্দু অধ্যুষিত দেশে বেদ প্রধান, বৌদ্ধ অধ্যুষিত দেশে ত্রিপিটক প্রধান শিক্ষা নীতি প্রধান্য পায়। যেসকল রাষ্ট্র প্রগতিশীল সেখানে ধর্ম নিরপেক্ষ শিক্ষা পদ্ধতি প্রধান্য পাওয়াই স্বাভাবিক। বৃহৎ ধর্মগোষ্ঠীর ধর্ম বিশ্বাসকে উপেক্ষা করে কোন রাষ্ট্র যদি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে তবে সেখানে সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা অনিবার্য। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ধর্ম বিশ্বাসকে শিক্ষানীতিতে কেবল উপেক্ষা করেই ক্ষান্ত থাকা হয়নি বরং বিভিন্ন পাবলিক ও স্থানীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে এবং বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকে বারবার ধর্ম বিষয়ে কটূক্তি করা হচ্ছে। যা এ রাষ্ট্রের পথচলাকে মসৃণ করবে না বরং বিপত্তির জন্ম দেবে। শিক্ষার সাথে ধর্মের যে বহুমাত্রিক যোগাযোগ রয়েছে এটা কর্তৃপক্ষকে বুঝতে হবে। কেননা ধর্ম কেবল এক সম্প্রদায়ভূক্ত ব্যক্তির প্রতি নয়, বরং সমগ্র ধর্মের মানুষের প্রতি প্রীতি ও শুভেচ্ছার ভাব জাগ্রত করে। ধর্ম শিক্ষা মানুষের চরিত্রকে প্রভাবিত করে তার সামাজিক জীবনকে নিয়ন্ত্রন করে। ধর্ম শিক্ষা মানুষকে সামাজিক নিয়ম মেনে চলতে, অপরের চিন্তা ও অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে, সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে এবং চিন্তা ও কর্মে বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন হতে শিক্ষা দেয়।
…..
রাজু আহমেদ। কলামিষ্ট।

Related posts