September 20, 2018

আমদানি শুল্কমুক্ত হচ্ছে ২১২ পণ্য

Captureঢাকা::

২০১৫ সালের ৩০ জুন একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) আয়কে পাঁচ বছরের জন্য বিভিন্ন হারে আয়কর অব্যাহতি দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। গত ২১ জুন ওই প্রজ্ঞাপন বাতিল করে নতুন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সংস্থাটি। এর ফলে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিএসইসির কর অব্যাহতির সুযোগ বাতিল হচ্ছে। আগামীকাল ১ জুলাই থেকে শতভাগ আয়কর পরিশোধ করতে হবে সংস্থাটিকে।

এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, ২০১৫ সালের ৩০ জুন এনবিআরের জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বিএসইসি প্রথম বছর ১০০, দ্বিতীয় বছর ৮০, তৃতীয় বছর ৬০, চতুর্থ বছর ৪০ ও পঞ্চম বছর ২০ শতাংশ হারে আয়কর হতে অব্যাহতি পাবে। প্রজ্ঞাপনটি ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করা হয়েছে। এ সুবিধা ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল থাকার কথা ছিল।

গত ১ জুন সংসদে বাজেট প্রস্তাব ঘোষণার পর বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক মো. আনোয়ারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনূসুর রহমানের কাছে পাঠানো হয়েছে। তাতে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিএসইসির আয়কে শতভাগ কর অব্যাহতি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করে বলা হয়েছে, ‘ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন স্কিমের আওতায় স্টক এক্সচেঞ্জের যে সংস্কার কার্যক্রম চলছে তা চলমান রাখতে ও পুঁজিবাজারের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ সক্ষমতা বৃদ্ধির স্বার্থে ১০০ শতাংশ হারে কর অবকাশ ২০১৯ সাল পর্যন্ত অব্যাহত রাখা একান্তই প্রয়োজন। ’

বিএসইসির আবেদনে শতভাগ কর অব্যাহতি সুবিধা দেওয়া দূরের কথা, দুই বছর আগে দেওয়া পাঁচ বছরের সুবিধা প্রত্যাহার করে গত ২১ জুন প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর আগের সুবিধা বাতিল করে দিয়েছে।

১ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের খসড়া অর্থবিল উত্থাপনের পর তা পাস হয়েছে ২৮ জুন। এর আগেই এনবিআর আরো বিভিন্ন খাতে আয়কর, উেস কর ও আমদানি শুল্কে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে নতুন নতুন আদেশ জারি করছে, যেগুলো ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। তাতে নতুন করে বিভিন্ন পণ্য আমদানির ওপর শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে, কমানো হচ্ছে বিল পরিশোধে উেস করের হার। ২১২টি পণ্য নতুন অর্থবছর শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানির সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে আদেশগুলোতে। এর মধ্যে শিল্পের কিছু কাঁচামাল, তেল-চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য রয়েছে। এর বাইরে শুধু ভুটান থেকে ফলমূল, মসলাসহ ৩৩টি পণ্য আমদানি করলে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) আওতায় অবকাঠামো খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে। পিপিপির ভিত্তিতে বাস্তবায়ন হওয়া কোনো প্রকল্প বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালনার প্রথম ১০ বছরের আয়কে করমুক্ত সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকছে। এ ছাড়া এসব প্রকল্পে কর্মরত বিদেশি কারিগরের আয়কে প্রথম তিন বছর আয়করের ৫০ শতাংশ অব্যাহতি দেওয়া হবে। এ ছাড়া পিপিপি প্রকল্পের রয়্যালটি ও কারিগরি সহায়তা ফি ১০ বছরের জন্য কর অব্যাহতি দেওয়া হবে। এসব বিষয়ে আলাদা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে এনবিআর।

এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, জাতীয় সংসদে অর্থবিল পাসের আগেই শুল্ক করে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মূলত নতুন ভ্যাট আইন স্থগিত করার কারণে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ের পথ বের করতেই এ উদ্যোগ নিতে হচ্ছে এনবিআরকে।

গত ২১ জুন আলাদা একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর আয়কর অধ্যাদেশের বিধি-১৬-এর ৫২ ধারা প্রতিস্থাপন করেছে। বিদ্যমান ধারা অনুযায়ী প্রিন্টিং, প্যাকেজিং, বাইন্ডিংস, শিল্প পণ্য সরবরাহ ও প্রক্রিয়াকরণ এবং খাদ্য সরবরাহের যেকোনো বিল পরিশোধের সময় মোট বিলের ১০ শতাংশ উেস কর পরিশোধ করতে হচ্ছে। নতুন আদেশ জারি করে এনবিআর বলেছে, এসব বিলের পরিমাণ ১৫ লাখ পর্যন্ত হলে ২ শতাংশ, ১৫ লাখ থেকে ২৫ লাখ পর্যন্ত ৩ শতাংশ, ২৫ লাখ থেকে এক কোটি পর্যন্ত ৪ শতাংশ, এক কোটি থেকে পাঁচ কোটি পর্যন্ত ৫ শতাংশ, পাঁচ কোটি থেকে ১০ কোটি পর্যন্ত ৬ শতাংশ এবং ১০ কোটির বেশি হলে ৭ শতাংশ হারে উৎস কর আরোপ করতে বলা হয়েছে।

নতুন অর্থবছরে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও বিপণনকারী কম্পানির বিলের পরিমাণ দুই লাখ টাকার কম হলে কোনো উেস কর দিতে হবে না। তবে দুই লাখ টাকার বেশি হলে দশমিক ৬ শতাংশ হারে উেস কর পরিশোধ করতে হবে। পেট্রল পাম্প স্টেশনসহ তেল সরবরাহকারী ডিলার বা এজেন্টকে যেকোনো পরিমাণ বিলের বিপরীতে ১ শতাংশ হারে উেস কর দিতে হবে। অয়েল রিফাইনারি কম্পানির বিলের ওপর ৩ শতাংশ, গ্যাস ট্রান্সমিশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কম্পানির ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ ও গ্যাস সরবরাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত কম্পানির ক্ষেত্রেও ৩ শতাংশ হারে উেস কর প্রয়োগ হবে ১ জুলাই থেকে।

আগামী অর্থবছর থেকে পেট্রোলিয়াম তেল, মোটর স্পিরিট, হালকা ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, কাঁচা চামড়া, বার ও রড, এঙ্গেলস, মোবাইল ফোন ও তারবিহীন ফিক্সড সেলুলার সেট আমদানির ওপর ২ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক দিতে হবে। তবে লোহা, স্ক্র্যাপ, আয়রন ও নন-অ্যালয় স্টিল, আয়রন ও স্টিলের সেমি-ফিনিশনড পণ্য ও ভাঙার উদ্দেশ্যে জাহাজ আমদানি করলে প্রতিটনে ৮০০ টাকা করে শুল্ক দিতে হবে।

২২ জুন প্রজ্ঞাপন জারি করে নতুন অর্থবছরে ২১২টি পণ্য আমদানিতে শুল্ক থাকবে না বলে জানিয়েছে এনবিআর। এসবের মধ্যে রয়েছে—১৮৫ গ্রাম পর্যন্ত পোল্ট্রি, এক দিনের বাচ্চার প্যারেন্ট স্টক, জীবন্ত মাছ, ভোজ্যতেল, চিনি, আলু, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ভাঙা চাল, অয়েল কেকসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় রাসায়নিক ও শিল্পপণ্য। অন্য সব ধরনের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক দিতে হবে আগামী অর্থবছর থেকে। ভুটান থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ বাড়িয়েছে এনবিআর। আগামী অর্থবছর ভুটান থেকে ৩৩ রকমের পণ্য বিনা শুল্কে আমদানি করা যাবে। এর মধ্যে রয়েছে—বিভিন্ন রকমের সবজি, কমলা, আপেল, ক্যাপসিকাম, আদা, আঙুরসহ অন্যান্য ফলের জুস, সবজির জুস, বোল্ডার পাথর ও ক্যালসিয়াম কার্বোনেট।

পিপিপিভুক্ত প্রকল্পে কর অব্যাহতি সুবিধা দিয়ে গত ২২ জুন তিনটি আলাদা এসআরও জারি করেছে এনবিআর। একটিতে বলা হয়েছে, পিপিপি প্রকল্প পরিচালনায় সংগৃহীত শেয়ার মূলধন হস্তান্তর থেকে উদ্ভূত মূলধনী মুনাফার ওপর ওই কম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরম্ভের তারিখ থেকে পরবর্তী ১০ বছর এবং পিপিপি প্রকল্প পরিচালনার জন্য পরিশোধ করা রয়্যালটি ও ‘টেকনিক্যাল নো-হাউ ও টেকনিক্যাল অ্যাসিসট্যান্স’ ফির ওপর ওই কম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরম্ভের তারিখ থেকে পরবর্তী ১০ বছর পর্যন্ত কর অব্যাহতি সুবিধা থাকবে।

ন্যাশনাল হাইওয়ে বা এক্সপ্রেসওয়ে এবং প্রাসঙ্গিক সার্ভিস রোড, ফ্লাইওভার, এলিভেটেড অ্যান্ড ‘এট-গ্রেড এক্সপ্রেসওয়ে, নদীতে নির্মিত সেতু, টানেল, নদীবন্দর, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, সাবওয়ে, মনোরেল, রেলওয়ে, বাস টার্মিনাল, বাসডিপো ও বৃদ্ধাশ্রমের ক্ষেত্রে এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে।

পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর বলেছে, এই ১৪ ধরনের কম্পানিতে নিয়োগ করা বিদেশি টেকনিশিয়ান বা কারিগরদের নিয়োগের তারিখ থেকে পরবর্তী তিন বছরের জন্য ৫০ শতাংশ হারে কর অব্যাহতি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ২২ জুন জারি করা আরেকটি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পিপিপির ভিত্তিতে পরিচালিত এই ১৪ ধরনের কম্পানি পরিচালনা থেকে অর্জিত ব্যবসায় আয়ের ওপর দেওয়া আয়কর বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরম্ভের তারিখ থেকে পরবর্তী ১০ বছরের জন্য ১০০ ভাগ হারে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

Related posts