November 17, 2018

আব্রাহাম লিংকন যে ভাবে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন

আব্রাহাম লিংকন

আব্রাহাম লিংকন যিনি আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট, ১৮০৯ সালের ১২-ই ফেব্রুয়ারি, আমেরিকার কেনটাকি রাজ্যের হার্ডিন কাউন্টিতে অতি সাধারণ একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম থমাস লিংকন ও মায়ের নাম ন্যান্সী হ্যাঙ্কস লিংকন। লিংকনের বয়স যখন মাত্র ৯ বছর তখন তার মা মারা যান এবং এর কয়েক মাস পরে তার বাবা আবারও তিন সন্তানসহ একজন বিধবা মহিলা সারাহ বুশ জন্সটনকে বিয়ে করেন। তিনি আব্রাহামকে খুব ভালবাসতেন এবং তাকে লেখাপড়ার জন্য উৎসাহ দিতেন। আব্রাহাম লিংকনের ছিল বই পড়ার প্রতি অসম্ভব রকমের আগ্রহ। কিন্তু লিংকন সর্বসাকুল্যে মাত্র ১৮ মাস প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া করেছেন। লিংকন একজন স্বশিক্ষিত ব্যক্তি। বই পড়ার জন্য তিনি মাইলের পর মাইল পথ হেটে বই সংগ্রহ করেছেন। তিনি পারিবারিক বাইবেল এবং তখনকার বিখ্যাত বইসমূহ যেমন- রবিনসন ক্রুসো, তীর্থযাত্রীদের অগ্রগতি ও ইশপের গল্প পড়তে খুবই পছন্দ করতেন। জ্ঞান অন্বেষণে লিংকন ছিলেন একজন মনযোগী পাঠক।

পেশা:

খুব ছোট বেলা থেকেই লিংকন তার দরিদ্র বাবার পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কাঠ কাটার কাজ করেন। এরও আগে তিনি নৌকা চালিয়ে রোজগার করতেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি তার বন্ধুর সাথে যৌথভাবে একটি দোকান কিনে ব্যবসায় শুরু করেন। কিন্তু ব্যবসায় মন্দা থাকায় তিনি তার শেয়ার বিক্রি করে দেন। পরে তার বন্ধুর মৃত্যু হয় এবং তার বন্ধুর করা $১০০০ ঋণ তিনি ১৭ বছর ধরে পরিশোধ করেন। লিংকন তার জীবনে পোস্টমাস্টার, দোকানদার, এমনকি একজন সাধারণ মুদি দোকান মালিক হিসেবে কাজ করেছেন।

ব্লাক হ্যাক যুদ্ধের পর আব্রাহাম লিঙ্কন তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন এবং ১৮৩৪ সালে ইলিনয়ে Whig Party-র রাজ্য আইনসভার একজন সদস্য নির্বাচিত হন। এই সময়ে তিনি একজন আইনজীবী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং William Blackstone এর ‘Commentaries on the Laws of England’ বই নিজে নিজে পড়া শুরু করেন। ১৮৩৭ সালে বারে ভর্তি হওয়ার পরে ইলিনয়ের স্প্রিংফিল্ডে চলে যান এবং সেখানে জন টি স্টুয়ার্ট ল ফার্মে অনুশীলন শুরু করেন। ১৮৪৪ সালে আব্রাহাম লিঙ্কন William Herndon এর সাথে যৌথভাবে অনুশীলন শুরু করেন।

রাজনৈতিক জীবন:
আব্রাহাম লিংকন আমেরিকার ১৬ তম রাষ্ট্রপতি। তিনি ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং তার রাষ্ট্র পতিত্বের মেয়াদকাল ১৮৬১-১৮৬৫ পর্যন্ত। ১৮৬০ সালে তিনি রিপাবলিকান পার্টির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি ১৮৪৭-১৮৪৯ সাল পর্যন্ত মার্কিন হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে লিংকন সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দিয়ে স্টিফেন ডগলাসের বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন। এই সময় ‘লিংকন-ডগলাস বিতর্ক’ এবং ক্রীতদাস প্রথা সংক্রান্ত কানসাস-নেব্রাস্কা আইনের উপর বিতর্ক, অল্প সময়ের মধ্যেই লিংকনকে জাতীয় পর্যায়ে সুখ্যাতি এনে দেয়।

তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দাস প্রথার অবসান ঘটান। ১৮৬৩ সালে মুক্তি ঘোষণার মাধ্যমে তিনি দাসদের মুক্ত করে দেন। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে সংগঠিত মার্কিন গৃহযুদ্ধে তিনি ইউনিয়ন বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে দক্ষিণের কনফেডারেট জোটকে পরাজিত করেন। এতে ৩৫ লাখ ক্রীতদাস মুক্ত হয়। গৃহযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ১৮৬৩-এর নভেম্বর মাসে পেনসালভেনিয়া অঙ্গ রাজ্যের গেটিসবার্গে লিংকন একটি ভাষণ দেন। এই ভাষণই ইতিহাসে বিখ্যাত গেটিসবার্গ ভাষণ হিসেবে পরিচিত। এটিই পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম সেরা ভাষণ হিসেবে এখনও উদ্ধৃত হয় বিশ্বব্যাপী।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ১৫ এপ্রিল ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন। লিংকন ছিলেন মিষ্টভাষী এবং বিনয়ী। জনতাকে আকৃষ্ট করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। তিনি নিউ সালেমে ইলিনয়েস জেনারেল এসেম্বলি নির্বাচনে উইগ পার্টির পক্ষে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি পার্টির মনোনয়ন পান এবং আইন সভায় উইগ পার্টির হয়ে নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক সফলতার ক্ষেত্রে তাকে কখনও পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

লিংকন গণতন্ত্রের সংজ্ঞার অন্যতম প্রবক্তা। তার দেওয়া গণতন্ত্রের সংজ্ঞা ও নীতি আজও বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ও সর্বজন গৃহীত। গণতন্ত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, “The government is the people, for the people, by the people, shall not perish from the earth.” অর্থাৎ “সরকার হলো জনগণ, জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা, যা কখনোই ধ্বংস হবে না”।

আমেরিকার অখণ্ডতা বজায় রাখা,গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামো প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে লিংকন এখনও আমেরিকার আদর্শ হয়ে আছেন যা আমেরিকার মানুষের কাছে তথা বিশ্বব্যাপী মানুষ চিরকাল শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। লিংকন ১৮৬৪ সালে পুনরায় আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। লিংকন ১৮৬৫ সালের ১৫ এপ্রিল উইলকেস বুথ নামের এক আততায়ীর গুলিতে আহত হয়ে পরের দিন নিহত হন।

ব্যক্তিগত কিছু গুণাবলি ও ঘটনা:

আব্রাহাম লিংকন একজন সাধারণ রাজনীতিবিদ থেকে আমেরিকার সেরা রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। তার নিজেকে আমেরিকানদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি মহান হতে পেরেছেন।
একজন বক্তা, লেখক, বিতার্কিক, রসিক ও আলোচক হিসেবে তার কথাগুলো আজও আমাদের বিনোদন ও শিক্ষা দিয়ে থাকে।
ছোটবেলায় তিনি তার বন্ধুদের জড়ো করে উঁচু এক স্থানে উঠে বক্তব্য রাখতেন।
ইলিনয়ে আইনজীবী হিসেবে কাজ করার সময়, লিংকন প্রায়ই সন্ধ্যায় একটি পানশালায় তার বন্ধুদের সাথে গল্প বলা প্রতিযোগিতায় মেতে উঠতেন।
১৮৪০ সালে এক রাজনৈতিক সভায় তিনি তার প্রতিপক্ষ লেস থামাসকে নকল করে তাকে মজা করেছিলেন যা দর্শক তুমুলভাবে করতালি দিয়ে স্বাগত জানায়।
রাষ্ট্রপতি লিংকন আবেগপ্রবণ কোন রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তিনি প্রতিপক্ষের ঢালাওভাবে সমালোচনা করতেন না। তিনি শত্রু সহ অন্যদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং প্রতিকূল পরিবেশে তিনি তার এই শক্তিকেই কাজে লাগাতেন।
একবার এক রাজনৈতিক বিতর্কে স্টেফেন ডগলাস নামে এক ব্যক্তি তাকে দুই মুখো হিসেবে উল্লেখ করলে, এর জবাবে তিনি বলেছিলেন, “সেটা দর্শকরাই বিচার করবে। আমার যদি অন্য আরেকটি মুখ থাকত তাহলে আমার বর্তমান এই মুখ ধরে রাখার কি কোন দরকার আছে?”
একবার তার ভাষণে তিনি বলেন, “আমরা কারো শত্রু নই, আমরা সবাই বন্ধু। আন্তরিকতায় ব্যাঘাত ঘটলেও তা যেন সম্পর্কের বন্ধনকে ছিন্ন না করে।”
একবার তিনি জানতে পারলেন যে, সেক্রেটারি অফ ওয়ার এডউইন স্ট্যানটন তার আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছের এবং তাকে মূর্খ বলেছেন। লিংকন তাকে জিজ্ঞেস করেন সে তাকে মূর্খ বলেছে কিনা। জবাবে তাকে হ্যাঁ বলা হল, সে দুইবার তাকে মূর্খ বলেছে। এরপর লিংকন বলেন, “ঠিক আছে, স্ট্যানটন যা মনে করেছে তাই বলেছে, আমি এখন তার কাছে গিয়ে কথা বলে জানার চেষ্টা করব সে কেন এমনটা করেছে।”
রাষ্ট্রপতি হিসেবে লিংকনও মাঝে মাঝে রাগের বশবর্তী হতেন যা তিনি তার চিঠিগুলোর মধ্যে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতেন। কিন্তু তিনি তার এই রাগ মাখানো চিঠিগুলো কখনও পোস্ট করতেন না। অনেক পরে এই চিঠিগুলো আবিষ্কার করা হয় রাষ্ট্রপতির টেবিলের ড্রয়ারে অ-স্বাক্ষরিত অবস্থায়।
আব্রাহাম লিংকন কোন আনুষ্ঠানিক শিক্ষা না পেয়েও ছিলেন অসাধারণ জ্ঞান সম্পন্ন এক মহান ব্যক্তি। তার প্রমাণ মেলে তাঁর অসাধারণ প্রতিভার সাক্ষর রাখা বিভিন্ন ক্ষেত্রে। তিনি তাঁর সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক বরাবর একটি চিঠি লিখেছিলেন যা আজও শিক্ষকদের জন্য শিক্ষাদানের পথ-নির্দেশিকা হিসেবে প্রচলিত।
তার লেখা সেই চিঠিটি নিচে বাংলা ও ইংরেজিসহ উল্লেখ করা হল–

বাংলায়:

মাননীয় মহাশয়,
আমার পুত্রকে জ্ঞানার্জনের জন্য আপনার কাছে প্রেরণ করলাম। তাকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন এটাই আপনার কাছে আমার বিশেষ দাবি।
আমার পুত্রকে অবশ্যই শেখাবেন- সব মানুষই ন্যায়পরায়ণ নয়, সব মানুষই সত্যনিষ্ঠ নয়। তাকে এও শেখাবেন প্রত্যেক খারাপ লোকের মাঝেও একজন বীর থাকতে পারে, প্রত্যেক স্বার্থবান রাজনীতিকের মাঝেও একজন নিঃস্বার্থ নেতা থাকে। তাকে শেখাবেন পাঁচটি ডলার কুড়িয়ে পাওয়ার চেয়ে একটি উপার্জিত ডলার অধিক মূল্যবান। এও তাকে শেখাবেন, কিভাবে পরাজয়কে মেনে নিতে হয় এবং কিভাবে বিজয়োল্লাস উপভোগ করতে হয়। হিংসা থেকে দূরে থাকার শিক্ষাও তাকে দিবেন। যদি পারেন নীরব হাসির গোপন সৌন্দর্য তাকে শেখাবেন। সে যেন আগেভাগেই এ কথা বুঝতে পারে- যারা পীড়নকারী তাদেরই সহজে কাবু করা যায়। বইয়ের মাঝে কি রহস্য আছে তাও তাকে বুঝতে শেখাবেন। আমার পুত্রকে শেখাবেন – বিদ্যালয়ে নকল করার চেয়ে অকৃতকার্য হওয়া অনেক বেশী সম্মানজনক। নিজের উপর তার যেন সুমহান আস্থা থাকে। এমনকি সবাই যদি সেটাকে ভুলও মনে করে। তাকে শেখাবেন, ভদ্রলোকের প্রতি ভদ্র আচরণ করতে, কঠোরদের প্রতি কঠোর হতে। আমার পুত্র যেন এ শক্তি পায়- হুজুগে মাতাল জনতার পদাঙ্ক অনুসরণ না করার। সে যেন সবার কথা শোনে এবং তা সত্যের পর্দায় ছেঁকে যেন ভালোটাই শুধু গ্রহণ করে- এ শিক্ষাও তাকে দিবেন।
সে যেন শিখে দুঃখের মাঝে কীভাবে হাসতে হয়। আবার কান্নার মাঝে লজ্জা নেই একথা তাকে বুঝতে শেখাবেন। যারা নির্দয়, নির্মম তাদের সে যেন ঘৃণা করতে শেখে। আর অতিরিক্ত আরাম-আয়েশ থেকে সাবধান থাকে।

আমার পুত্রের প্রতি সদয় আচরণ করবেন কিন্তু সোহাগ করবেন না। কেননা আগুনে পুড়েই ইস্পাত খাঁটি হয়। আমার সন্তানের যেন অধৈর্য হওয়ার সাহস না থাকে, থাকে যেন সাহসী হওয়ার ধৈর্য। তাকে এ শিক্ষাও দিবেন- নিজের প্রতি তার যেন সুমহান আস্থা থাকে আর তখনই তার সুমহান আস্থা থাকবে মানবজাতির প্রতি।
আব্রাহামের কিছু বিখ্যাত উক্তি:

“প্রত্যেককে বিশ্বাস করা বিপদজনক, কিন্তু কাউকে বিশ্বাস না করা আরও বেশি বিপদজনক”।
“যার মা আছে সে কখনও গরীব নয়। আমি যা, বা যা হতে চাই না কেন আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী”।
“চরিত্র হচ্ছে গাছের মত, আর পরিচিতি হচ্ছে ছায়ার মত। ছায়া হচ্ছে আমরা যা ভাবি তাই, আর চরিত্র হল আসল গাছ”।
“যে মানুষ যতটা সুখী হতে চাই সে ততটাই পারে। সুখের কোন পরিসীমা নেই। ইচ্ছে করলেই সুখকে আমরা আকাশ সমান করে তুলতে পারি। অধিকাংশ জাতিই সুখী হতে পারে যদি তারা সেভাবে মানসিক প্রস্তুতি নেয়”।
“শাস্তির চেয়ে ক্ষমা মহৎ”।
“যারা অপেক্ষা করে তারাই পাই, আর তারাই হারায় যারা তাড়াহুড়া করে”।
“তুমি যা-ই হও না কেন ভাল কিছু হও”।
“যথাস্থানে পা রেখেছো কিনা তা আগে নিশ্চিত হও, এরপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়াও”।
“কোন মানুষেরই একজন সফল মিথ্যাবাদী হওয়ার মত যথেষ্ট স্মৃতিশক্তি নেই”।
“আমাকে একটি গাছ কাটতে ৬ ঘণ্টা সময় দাও এবং আমি ৪ ঘণ্টাই কুড়াল ধার দেব”।

Related posts