November 15, 2018

আটক সেই মেজর জিয়া আর তামিম!

ঢাকাঃ বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের মাস্টারমাইন্ড আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) প্রধান সেনাবাহিনীর বরখাস্তকৃত মেজর জিয়া ওরফে সৈয়দ জিয়াউল হক এবং বাংলাদেশে আইএসের কথিত প্রধান সমন্বয়কারী সিলেটী বংশদ্ভুদ কানাডীয় নাগরিক তামিম আহমেদ চৌধুরীসহ নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে।

আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী শীর্ষ কর্মকর্তাদের কথা বলে এমনটাই জানা গেছে। গত এক সপ্তাহে তাদেরকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে এবিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষনা দেয়া হয়নি। যেকোনো সময় তাদেরকে আটকের তথ্য সংবাদ মাধ্যমকে জানানো হতে পারে বলে জানা গেছে।

এর আগে গত ২ আগষ্ট পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহিদুল হক পুলিশ সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে তামিম চৌধুরী ও মেজর জিয়াকে গ্রেফতারে তথ্য দিলে এবং সহায়তা করলে ২০ লাখ করে ৪০ লাখ টাকা পুরষ্কার ঘোষনা করে।

আইজিপি আইজিপি বলেন, গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও উদ্বুদ্ধকারী বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরী এবং সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্তকৃত মেজর জিয়া। হামলার সময় তামিম চৌধুরী দেশে ছিল বলেও জানান তিনি। মেজর জিয়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের শীর্ষ নেতা। আর তামিম চৌধুরী নিউ জেএমবির নেতা। এখন তাদেরকে গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।

মেজর জিয়ার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা রয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর থেকেই মেজর জিয়া নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। বর্তমানে এবিটির প্রধানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মেজর জিয়া।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মেজর জিয়া ও তামিম চৌধুরীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে দেশের জঙ্গিবাদের নেপথ্য কারা তাদের সর্ম্পকে জানা চেষ্টা চলছে। মদদদাতা, আশ্রয়দাতা ও অর্থদদাতাদের সন্ধান এবং বিদেশী যোগসূত্র খোঁজার পাশাপাশি মাষ্টারমাইন্ড এই দুই জঙ্গিনেতা অনুসারীদের আটকের চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে তাদের অনুসারী অর্ধশতাধিক সদস্যকে আটক করা হয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সিন্ধান্তে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তাদের সবোর্চ্চ শক্তি এবং কৌশলে কাজ করছে। গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করে জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে চাচ্ছে।

কে এই মেজর জিয়া?

সৈয়দ মো. জিয়াউল হকের পিতার সৈয়দ মোঃ জিল্লুক হক, স্থায়ী ঠিকানাঃ গ্রাম-মোস্তফাপুর, থানা-জেলা মৌলভীবাজার। সর্বশেষ ব্যবহৃত বর্তমান ঠিকানাঃ পলাশ, ১২ তলা, মিরপুর সেনানিবাস, ঢাকা।

পিতার বর্তমান ঠিকানাঃ বাড়ি নম্বর-৫১২ (তলা), রোড নম্বর-০৯, বারিধারা, ডিওএইচএস, ঢাকা। পাসপোর্ট নম্বরঃ এক্স ০৬১৪৯২৩।

মেজর (বহিষ্কৃত) সৈয়দ মো. জিয়াউল হক ২০১১ সালের ডিসেম্বরে সেনা অভ্যুত্থানে প্ররোচনা চালিয়ে ব্যর্থ হন। এরপর থেকে তিনি পলাতক। তাকে সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি সেনা সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০১১ সালের ডিসেম্বরে সেনাবাহিনীর সাবেক ও তৎকালীন কিছু সদস্য দেশের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত এবং সেনাবাহিনীতে অভ্যুথানের চেষ্টা করে। অভ্যুথানের পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে মেজর জিয়া অন্যতম বলে জানা যায়। মেজর জিয়া জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলেও সেনা সদর দপ্তর জানিয়েছিল। এই অভ্যুথানচেষ্টার পেছনে ইশরাক আহমেদ নামে তার এক প্রবাসী বন্ধু যুক্ত ছিলেন।

মেজর জিয়া আগে থেকেই উগ্রগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুফতি জসীমুদ্দিন রাহমানী গ্রেপ্তার হওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, ধরা পড়ার আগে তিনি একাধিকবার ঢাকা ও চট্টগ্রামে মেজর জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ধারণা, জিয়া এই জঙ্গিগোষ্ঠীর সামরিক শাখার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৫ সালে সবচেয়ে বেশি ব্লগার হত্যা ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলা এত বেশি নিখুঁতভাবে হয় যে ঘাতকদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

গত তিন বছরে মেজর জিয়ার তত্ত্বাবধানে এবিটির অন্তত আটটি স্লিপার সেল তৈরি হয়েছে। প্রতিটি সেলের সদস্য সংখ্যা চার থেকে পাঁচজন। সেই হিসাবে অন্তত ৩০ জন দুর্র্ধষ ‘স্লিপার কিলার’ জঙ্গি তৈরি করেছেন মেজর জিয়া। তারাই ব্লগার, প্রকাশক, মুক্তমনা ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের হত্যা করেছে।

২০১৩-২০১৫ সালের মধ্যে পাঁচজন ব্লগার, একজন প্রকাশক ও সমকামীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা জুলহাস-তনয় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হত্যার পর এবিটি নাম সামনে চলে আসে। তদন্তে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে জিয়ার নাম উঠে এসেছে।

কে এই তামিম চৌধুরী?

ইসলামিক স্টেটের বাংলাদেশ প্রধান শেখ আবু ইব্রাহিমের অপর নাম আল-হানিফ৷ কানাডার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দাবি, ৩৫ বছর বয়সী আবু ইব্রাহিমের আসল নাম তামিম আহমেদ চৌধুরী। তিনি কানাডাবাসী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিক। কানাডার উইন্ডসর শহরে থাকতেন৷ সেখানে বসেই আইএসের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলেন। প্রায় তিন বছর আগে ২০১৩ সালে কানাডা ছেড়ে বাংলাদেশে চলে আসেন তামিম চৌধুরী।

সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার দুবাগ ইউনিয়নের বড়গ্রামের প্রয়াত আব্দুল মজিদ চৌধুরীর ছেলে শফি আহমদ চৌধুরীর পুত্র তামিম। তার বাবা মজিদ চৌধুরী ছিলেন একাত্তরে শান্তি কমিটির সদস্য। তবে তামিম কখনো বিয়ানীবাজারের বাড়িতে আসেনি৷ তার জন্ম কানাডায় জন্ম৷ সেখানেই বেড়ে ওঠা। তামিম বিবাহিত৷ তিন সন্তানের বাবা। আত্মীয়দের সাথে তেমন সম্পর্ক নেই।

তামিম অহমেদ চৌধুরীর পিতার নাম শফিক চৌধুরী, মায়ের নাম খালেদা শফি চৌধুরী, স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম- বড়গ্রাম সাদিমাপুর, ইউনিয়ন- দোবাক, থানা- বিয়ানি বাজার জেলা- সিলেট। পাসপোর্ট নম্বরঃ এএফ-২৮৩৭০৭৬, পুরাতন পাসপোর্ট নম্বরঃ এল-০৬৩৩৪৭৮, ন্যাশন্যাল আইডিঃ ১৯৮৬০০৯১২৪১০০১৩৪২, জন্ম তারিখঃ ২৭-০৭-১৮৯৬ ইং, সর্বশেষ বাংলাদেশে আগমনঃ ৫ অক্টোবর ২০১৩, দুবাই থেকে ইত্তেহাদ এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশে আগমন করে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, গুলশন ও কিশোরগঞ্জে হামলার পরই সীমান্ত পার করে ভারতের কোনও একটি অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়েছিলেন তামিম ওরফে আবু ইব্রাহিম৷ পরে তিনি আবার ফিরে আসেন বাংলাদেশে৷ কল্যাণপুর জঙ্গী আস্তানায় যে তামিম চৌধুরীর প্রায়শ যাতায়াত ছিল এবং জঙ্গীদের সঙ্গে গোপন বৈঠকে মিলিত হতেন, সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময়ে আহত অবস্থায় আটক রাকিবুল হাসান রিগ্যানকে জিজ্ঞাসাবাদে এই ধরনের তথ্যই পেয়েছে গোয়েন্দারা। তামিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে জঙ্গীদের উজ্জীবিত করা এবং তাদের আর্থিক সহায়তা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা কল্যাণপুর জঙ্গী আস্তানায় অভিযান শেষে মিরপুর থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারেও উল্লেখ করেছে পুলিশ। মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি তামিম চৌধুরীর খোঁজে চলছে বিশেষ অভিযান।

Related posts