September 24, 2018

আজ মুক্তির আনন্দে, সেই যোদ্ধা নিরানন্দে

zakir pic

তোফায়েল হোসেন জাকির, গাইবান্ধা থেকে ॥ আজ ২৬ মার্চ। বাঙালির শৃৃঙ্খল মুক্তির দিন। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। বিশ্বের বুকে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানোর দিন আজ। বাঙালি জাতীর আজকের এই আনন্দের দিনে নিরানন্দে দিন কাটছে সেই বীরযোদ্ধা মজনু মিয়ার। জীবন বাজী রেখে যুদ্ধে দেশ স্বাধীন করলেও, সেই যোদ্ধা মজনু মিয়া এখন অর্ধাহারে-অনাহারে গুচ্ছগ্রামে বসবাস করে আসছে।

একাত্বরে মজনু মিয়া ছিলেন টগবগে একজন যুবক। সেই সময় দেশটা ছিল উত্তাল, বাংলাকে নিজের রূপে রূপ দেওয়ার নেশায় কাপছিল পুরো দেশ। পাকিস্থানীদের শোষণ আর ব্যবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিলেন এদেশের আপামর জনগণ। ঠিক তখনই মজনু মিয়া জীবনে মায় ত্যাগ করে দেশকে রক্ষার্থে ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বাধীকার আদায়ের জন্য। তার অদম্য সাহস আর দেশপ্রেম তাকেও নিয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধে।

গাইবান্ধা জেলার সাদুল্যাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের জয়েনপুর গ্রামের মৃত খবির উদ্দিনের ছেলে মজনু মিয়া। তার বয়স প্রায় ৬৩ বছর। বসতভিটা হারিয়ে বর্তমানে তিনি জয়েনপুরস্থ একটি গুচ্ছগ্রামে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবেতর বসবাস করে আসছেন।

যুদ্ধকালীন ১১নং সেক্টরে মজনু মিয়ার সহযোদ্ধা হিসেবে ছিলেন-আবেদ আলী, সুলতান গিয়াস ও আলতাফ হোসেন। এই মহাবীরের এমন অনেক সফল সাহসী অভিযান হয়েছিল মুক্তি যুদ্ধকালীন সময়ে। দেশ হয়েছিল স্বাধীন। জনগণ পেয়েছে স্বাধীনতার সুখ। এক্ষেত্রে তৎকালীন সময়ের অধিনায়ক মহম্মদ আতাউল গনি ওসমানী স্বাক্ষরীত দেশ স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদপত্র প্রাপ্ত হয় মজনু মিয়া। যার সনদ নম্বর ১৬৫৮৮৫। অতি দুঃখের বিষয় যে, মজনু মিয়া দেশ স্বাধীনতার সংগ্রামের সনদ পেলেও, অদ্যবদিও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি। zakir pc

সেই সময়ে জীবন বাজী রেখে দেশ স্বাধীন করলেও, জীবন যুদ্ধে তিনি আজ পরাজিত সৈনিক। মজনু মিয়ার জায়গা জমি না থাকায় বর্তমানে তিনি সাদুল্যাপুর উপজেলার জয়েনপুরস্থ গুচ্ছগ্রামে ১০ বছর ধরে মানবেতর জীবনে বসবাস করে আসছেন। দেশ স্বাধীনের ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও কোন সরকারি সুযোগ-সুবিধা কিংবা মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পাননি বলে তার অভিযোগ।

তিনি জানান, ভারতের কাকড়ীপাড়া প্রশিক্ষণ শিবিরের আজিম মাহবুর এর নিকট প্রশিক্ষণ গ্রহন করে নিজ জেলা গাইবান্ধার কামারজানি, কঞ্চিবাড়ী ও দক্ষিণ দূর্গাপুর সহ বিভিন্ন এলাকায় ক্যাপ্টেন হামিদ উল্লার নেতৃত্বে ওইসব এলাকায় সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন মজনু মিয়া। তার অধিনায়ক ছিলেন আব্দুল হামিদ পালোয়ান।

এর পর ওই যুদ্ধে সফল ভাবে অংশ গ্রহন করার ফলে মজনু মিয়াকে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন- বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গাইবান্ধা জেলা ইউনিটিরে সাবেক কমান্ডার নাজমুল আরেফিন তারেক, সাদুল্যাপুর উপজেলা ইউনিটের কমান্ডার মেছের উদ্দিন সরকার ও ইউপি চেয়ারম্যান শাহীন সরকার।

সেই যুদ্ধে অংশ গ্রহনকারী মজনু মিয়া যুদ্ধের সকল প্রমানপত্রাদি দিয়ে গেজেটধারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেতে অনলাইন আবেদন সহ বিভিন্ন মাধ্যমে আবেদন করেন। এরই প্রেক্ষিতে সাদুল্যাপুর উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটি কর্তৃক মজনু মিয়াকে বাতিল করেন। ওই কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, মজনু মিয়ার সংগ্রামী সনদপত্র থাকলেও, ক্রমিক নম্বর নেই। এ কারণে তাকে বাতিল করা হয়েছে। অথচ ওই সনদপত্রের অপর পৃষ্ঠায় ক্রমিক নম্বর ছিল। যার নম্বর ১৬৫৮৮৫। তবুও মজনু মিয়াকে বাতিল করেছেন যাচাই-বাছাই কমিটিগণ। এরপর মজনু মিয়া জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে আপীল আবেদন করেন। যার আবেদন নম্বর ২২০০৮। তিনি আপীল আবেদন করলেও অদ্যবধিও কোনো ফলশ্রুতি পায়নি।

বর্তমানে এই মহা যোদ্ধা মজনু মিয়া স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গুচ্ছগ্রামে অসহায় জীবন জাপন করে আসছেন। এমনকি ৬ সন্তানের মধ্যে তার প্রাপ্ত বয়সের মেয়ে মোছা. মমতাজ খাতুনকে অর্থাভাবে পাত্রস্থ করাতে পারছেনা। বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়া মজনু মিয়া পেটের তাগিদে স্ত্রী লাইলী বেগমকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে শ্রম বিক্রি করে কোনোমতে দিনাতিপাত করছেন। যেন থমকে গেছে তার জীবন। মজনু মিয়া দেশ স্বাধীন করে শুধুই পেয়েছে একটি সাটিফিকেট। এটাই এখন স্মৃতি হয়ে আছে! শেষ বয়সে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পেয়ে মৃত্যুবরণ করতে চান, এটাই এখন মজনু মিয়ার আঁকুতি।

Related posts