September 19, 2018

আজ বাঙালির অগ্নিঝরা ৭ মার্চ

02-16

অগ্নিঝরা মার্চের প্রথম থেকেই ৭ মার্চকে ঘিরে বাঙালিরা টগবগে, প্রাণোচ্ছ্বল হতে থাকে আর অন্যদিকে পাকিস্তানিরা ভীত-উৎকণ্ঠিত ছিল। বিশ্ব মিডিয়ারও অন্যতম বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছিল ৭ মার্চ। ৬ মার্চ লন্ডনের দি টাইমস এর সম্পাদকীয় মন্তব্যে বলা হয়, ‘প্রতিবাদমুখর পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কচ্যুত হওয়ার দাবি ঘণ্টায় ঘণ্টায় তীব্রতর হচ্ছে।’ এবং দি সানডে টাইমস পত্রিকায় জানানো হয় যে, ‘পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। ৭ মার্চ তিনি একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারেন অথবা সংসদ ডেকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের যোগদানের আমন্ত্রণ জানাতে পারেন।’ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এই পরিস্থিতিতে কৌশলের আশ্রয় নেয়।

এই বিষয়ে পূর্ব পাকিস্তান সামরিক সরকারের তৎকালীন তথ্য কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক তার উইটনেস টু সারেন্ডার গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি ৭ মার্চের জনসভার আগে আওয়ামী লীগ নেতাদের স্পষ্টভাবে জানান যে, ‘পাকিস্তানের সংহতির বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা হলে তা শক্তভাবে মোকাবিলা করা হবে। বিশ্বাসঘাতকদের (বাঙালি) হত্যার জন্য ট্যাংক, কামান, মেশিনগান সবই প্রস্তুত রাখা হবে। প্রয়োজন হলে ঢাকাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হবে। শাসন করার জন্য কেউ থাকবে না কিংবা শাসিত হওয়ার জন্যও কিছু থাকবে না।’ এবং সেই অনুযায়ী ৭ মার্চ জনসভাকে কেন্দ্র করে কামান বসানো হয়। এমনকি আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়।

দিনটি ছিল রবিবার। পুরো ময়দান সকাল থেকেই পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে। জনসভায় যোগদানের জন্য দেশের বিভিন্নস্থান থেকে লাখ লাখ মানুষ জলোচ্ছ্বাসের গর্জনে বাস, লঞ্চ, স্টিমার, নৌকা ও পায়ে হেঁটে বিপুলবিক্রমে রাজধানী ঢাকার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। বাঁধভাঙা মানুষের স্রোতে দুপুরের আগেই ভরে যায় পুরো রেসকোর্সের ময়দান। দশ লাখেরও অধিক মানুষ জড়ো হয়েছিল সেদিন বঙ্গবন্ধুর অভূতপূর্ব বাণী শোনার জন্য। বাতাসে উড়ছিল বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত লাল সূর্যের পতাকা আর সঙ্গে সঙ্গে দুলে উঠছে বাঙালিদের সংগ্রামের প্রতীক লাখ লাখ বাঁশের লাঠি। সেইসঙ্গে ‘আপোস না সংগ্রামÑ সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘আমার দেশ তোমার দেশÑ বাংলাদেশ বাংলাদেশ’, ‘পরিষদ না রাজপথÑ রাজপথ রাজপথ’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরÑ বাংলদেশ স্বাধীন কর’, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়Ñ বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ ইত্যাদি মুহুর্মুহু সেøাগানে মুখরিত হয়েছিল পুরো এলাকা।

সোয়া তিনটার দিকে বঙ্গবন্ধু ধীরে ধীরে মঞ্চে উঠলেন। তারপর শুরু করলেন অগ্নিস্ফূলিঙ্গ ছড়ানো সেই মহাত্তর ভাষণ। ১১০৮টি শব্দ চয়নে উনিশ মিনিটের সেই ভাষণে তিনি যে অমর গাঁথা সৃষ্টি করেছিলেন, তার প্রজ্জ্বলিত শিখার আলোতেই অর্জিত হয়েছিল মহান স্বাধীনতা। এই ভাষণ ছিল বাহুল্যবর্জিত, শব্দ চয়নে ও বাক্যের বাঁধনে ছিল সহজবোধ্য, বাচনভঙ্গি ছিল সাবলীল। প্রয়োজনানুসারে বজ্র নিনাদের আওয়াজ ও জ্বালাময়ী সেই ভাষণের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর শরীরীভাষা ছিল অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বলেন, ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।’ এর মাধ্যেমে তিনি বাঙালির মাঝে জাগ্রত মুক্তি চেতনাকে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় তেইশ বৎসরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস।

২৩ বৎসরের ইতিহাস মুমূর্ষু নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। এর মাধ্যমে তিনি পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দী বাঙালির দুর্বিষহ জীবনচিত্রপটকে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই।’ এর মাধ্যমে নিজের ক্ষমতালাভের চেয়েও যে তার কাছে বাঙালির অধিকার আদায় মুখ্য, তিনি সেটারই প্রমাণ দিলেন। তিনি আরও বলেন, ‘তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছুÑ আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।’ এই লাইন দিয়ে তিনি বুঝিয়েছেন স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্য ইতোমধ্যে নির্ধারিত হয়ে গেছে এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের পাথেয়ও তিনি দেখিয়ে দিলেন। তিনি ওই ভাষণে দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, আরও রক্ত দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ।’ এখানে তিনি বাঙালিকে ত্যাগ-তিতিক্ষার জন্য প্রস্তুত করেছেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে আজাদ-হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক নেতাজী সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।

’ নেতাজী সফল হননি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তা বাস্তবায়ন করেছেন। ওই ভাষণে তিনি বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’ আর এর মধ্যে দিয়েই তিনি কৌশলে ঘোষণা করলেন বাংলার স্বাধীনতা। এই বিষয়ে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দাদের প্রধান সিরাজুল ইসলাম তার এক তারবার্তায় বলেছিলেন, ‘কৌশলী শেখ মুজিব তার ভাষণে কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে ফেলল, আর আমরা তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম’। পাকিস্তানি জেনারেল কামাল মতিনউদ্দীন তার দ্য ট্র্যাজেডি অফ এরর বইতে লিখেছেন, ‘যেকোনো দিক থেকেই ৭ মার্চ ছিল মুজিবের দিন। তার কণ্ঠে ছিল প্রচ- আবেগ। পুরো পরিস্থিতি ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। তার কণ্ঠের দৃঢ়তায় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া পাওয়া গিয়েছিল। তার পুরো বক্তব্যে এতটাই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল, মনে হয় সেদিন গাছ-পাথরও আন্দোলিত হয়েছিল। জনগণের প্রাণচাঞ্চল্য ছিল উদ্দীপনাময়। প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১-এর ৭ই মার্চেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়।’

ঐতিহাসিক সেই ভাষণের কারণেই নিউজউইক সাময়িকীর একাত্তরের পাঁচ এপ্রিল সংখ্যায় বঙ্গবন্ধুকে ‘পোয়েট অব পলিটিকস্’ হিসেবে অ্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল। কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছেন, ‘৭ মার্চে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুধুই ভাষণ নয়, এটি একটি অনন্য রণকৌশলের দলিল।’ দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন, ‘৭ মার্চের ভাষণ আসলে স্বাধীনতার মূল দলিল।’ মার্শাল টিটো বলেছেন, ‘৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ভাষণের মাধ্যমে শেখ মুজিব প্রমাণ করেছেন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানিদের কোনোরকম বৈধতা নেই। পূর্ব পাকিস্তান প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ।’ ওয়াশিংটন পোস্ট এ বলা হয়, ‘শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণই হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার মৌলিক ঘোষণা। পরবর্তীতে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছে ওই ভাষণেরই আলোকে।’ আর এএফপি তে বলা হয়েছে, ‘৭ মার্চের ভাষণের মধ্যদিয়ে শেখ মুজিব আসলে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি বাঙালিদের যুদ্ধের নির্দেশনাও দিয়ে যান। ওইদিনই আসলে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয় ঘটে।’ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মিডিয়া এভাবেই ৭ মার্চের ভাষণকে স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

ঐতিহাসিক সেই ভাষণে তিনি আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে স্বাধীনতার সংগ্রামের যে ডাক দিয়েছিলেন, সেই ডাকে সাড়া দিয়ে প্রাণবাজি রেখে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাংলার সাধারণ কিন্তু ভীষণ সাহসী সন্তানরা। তার নির্দেশে পাল্টে গিয়েছিল পুরো দেশের চিত্র। বিদ্রোহ-সংগ্রামের তরঙ্গ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের মাঝে মুক্তির আকাক্সক্ষা প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠেছিল। যার ফলশ্রুতিতে একাত্তরের ১৯ মার্চ অর্থাৎ স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র সাতদিন আগেই জয়দেবপুরের (গাজীপুর) মাটিতে শুরু হয় সংগ্রামী শ্রমিক-ছাত্র-জনতার প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধযুদ্ধ। তারপর থেকেই সারাদেশে সেøাগান ওঠে ‘জয়দেবপুরের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’ তারপর তো ছাব্বিশে মার্চে স্বাধীনতা অর্জন এবং দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা করে। এই অর্জন সম্ভব হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বগুণে। আর এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ কাজ করেছে মূল প্রেরণা হিসেবে। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণটি ইতোমধ্যে বিশ্বের চল্লিশটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। জ্যাকব এফ ফিল্ড সম্পাদিত লন্ডন থেকে প্রকাশিত ইংরেজিতে অনূদিত ভাষণের বই উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেস: দ্য স্পিচেস দ্যাট ইন্সপায়ার্ড হিস্টরি তে দ্য স্ট্রাগল দিস টাইম ইজ ট্য স্ট্রাগল ফর ইন্ডিপেন্ডেন্স শিরোনামে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ এবং বিশ্বের সেরা দশ ভাষণের একটি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। এই ভাষণটি জাতির মাঝে বেঁচে থাকবে রাজনীতির কবি রচিত রাজনৈতিক মহাকাব্য হিসেবে। আর এই মহাকাব্যের আবেদন কখনোই শেষ হয়ে যাবে না বাঙালির জীবনে। এই মহাকাব্যের ওপর ভর করে স্বাধীনতা এসেছে, বিজয় এসেছে। এগিয়ে যাচ্ছে দেশ সম্মুখপানে, যাবে আরও বহুদূর এই ভাষণের মূলমন্ত্রকে বুকে ধারণ করে। লেখক: সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Related posts