November 18, 2018

আজ পিলখানা ট্র্যাজেডি দিবস, ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়

2016_02_24_11_09_55_HxQ5uioA7iQqUP8IA4D1ybCDiMZ5ew_original

ইলিয়াছ মাহমুদ (ষ্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা): পিলখানা ট্র্যাজেডির সাত বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস-বিডিআর-এর (বর্তমানে বিজিবি- বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) বিপথগামী কতিপয় সদস্য দাবি-দাওয়ার নামে পরিকল্পিতভাবে পিলখানায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। ওই দু’দিনে তারা ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা, লুটপাট, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। বিদ্রোহী বিডিআর সশস্ত্র সদস্যদের হাতে বিডিআর মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদও নিহত হন। বিদ্রোহীদের হাত থেকে রেহাই পায়নি ডিজির স্ত্রী, বাসার কাজের মেয়ে ও বেড়াতে আসা আত্মীয়রাও।

বিদ্রোহ ও হত্যাযজ্ঞের মূল হোতা সিপাহী সেলিম রেজা, কাজল আলী, আবদুল বাছেত, শামীম আল মামুন জুয়েল ও ল্যান্স নায়েক ইকরামসহ ঘাতকদের হিংস্র তাণ্ডবে সেনা পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাজার হাজার সাধারণ বিডিআর সদস্যের পরিবার। বিদ্রোহীদের বিচার, সংশ্লিষ্টদের সাহায্য-সহযোগিতার পরও স্বজনহারাদের কান্না থামেনি আজও। তবে কলংকিত সেই ইতিহাস ও ক্ষত ভুলে ঘুরে দাঁড়ানোর নিরন্তর প্রচেষ্টা সবার মধ্যেই আজ বিদ্যমান।

বিদ্রোহের দু’ মামলার দু’ গতি : বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় দায়ের হওয়া দু’টি মামলা চলছে দু’ গতিতে। হত্যা মামলাটি চলছে দ্রুততার সঙ্গে। অন্যদিকে বিস্ফোরক মামলাটি চলছে খুবই ধীরগতিতে। যার কারণে বিচারপ্রার্থী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। অনেক আসামীই বছরের পর বছর কারাগারে আটক থেকে মারা যাচ্ছেন। যাদের অনেকেই হয়তো মামলায় খালাস পেয়ে যেতেন। এতে আসামীরা ন্যায় বিচার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। এমনই অভিযোগ মামলা দু’টির আসামী পক্ষের আইনজীবীদের। তবে আসামীপক্ষের এমন অভিযোগ করার কোনও অধিকার নেই বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।

তৎকালীন বিডিআরের সদর দফতর পিলখানায় দেশের ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞে বিপথগামী বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের হাতে ওই দু’দিনে বিজিবির তখনকার মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। এছাড়াও বেসামরিক ও বিডিআর সদস্যসহ আরও ১৭ জন নিহত হন। নিহত এই ১৭ জনের মধ্যে ডিজির স্ত্রীসহ সাতজন বেসামরিক ব্যক্তি, নয়জন বিডিআর সদস্য ও একজন সেনা সদস্য।

নির্মম ও নৃশংস এ হত্যাযজ্ঞ ও বর্বরতার পর প্রথমে লালবাগ থানায় ও পরে নিউমার্কেট থানায় সদর ব্যাটালিয়নের ডিএডি তৌহিদুল আলমসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা করে পুলিশ। এ মামলায় কয়েক হাজার বিডিআর সদস্যকে অজ্ঞাতনামা হিসেবে আসামী করা হয়। থানা পুলিশের হাতবদল হয়ে মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। ২০১০ সালের ১২ জুলাই পিলখানা হত্যা মামলায় ৮২৪ জনকে আসামী করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পরে সম্পূরক চার্জশিটে আরও ২৬ জনকে আসামী করা হয়। এছাড়াও বিস্ফোরক আইনে ৭৮৭ জনকে অভিযুক্ত করে আলাদা একটি অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। পরে বকশীবাজারে মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিশেষ এজলাস বসিয়ে ২০১১ সালের ৫ জানুয়ারি দু’টি মামলার একসঙ্গে বিচার কাজ শুরু করা হয়। একপর্যায়ে বিস্ফোরক মামলার কাজ স্থগিত রেখে হত্যা মামলার কাজ এগিয়ে নেয়া হয়।

দীর্ঘ দু’বছর বিচার কার্যক্রম শেষে ২০১৩ সালের ৫ নবেম্বর হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন আদালত। এ রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন ও ২৬২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। বেকসুর খালাস দেয়া হয় ২৭১ জনকে। এ মামলায় বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু এবং আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক বিডিআর সদস্য তোরাব আলীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু সর্বশেষ রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী ছিলেন। সেখানে থাকা অবস্থায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে গত বছরের ৩ মে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালে নেয়ার আগেই তিনি মারা গেছেন।

ঘটনার পর বাহিনীর নিজস্ব আইনেও পিলখানাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫৭টি বিদ্রোহ মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় ছয় হাজারেরও বেশি বিডিআর সদস্যকে আসামী করা হয়। ৫৭টি বিদ্রোহ মামলায় বিডিআরের নিজস্ব আইনে গঠিত বিশেষ আদালতে পাঁচ হাজার ৯২৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর সদর রাইফেল ব্যাটালিয়নের ৭২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়ার মধ্য দিয়ে ৫৭টি বিদ্রোহের মামলার নিষ্পত্তি করা হয়।

শতাধিক আসামীর আইনজীবী শামীম সরদার জানান, বিচারপতি মোঃ শওকত হোসেন, বিচারপতি মোঃ আবু জাফর সিদ্দিক ও বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদারের সমন্বয়ে গঠিত একটি বৃহত্তর বেঞ্চে ২০১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্সের (নং-৫৮/২০১৩) শুনানি চলছে। এরই মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের পেপারবুক পড়া ও ঘটনার ওপর শুনানি শেষ করেছে। বর্তমানে আসামীপক্ষের শুনানি চলছে। ১৫২ আসামীর মধ্যে এরই মধ্যে ১১০ জনের তথ্যগত শুনানি হয়ে গেছে। এরপর আইনগত শুনানি শুরু হবে। আসামীপক্ষের শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষ আবার এর জবাব দিবেন।

বকশীবাজারে মহানগর দায়রা জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাসে এখনও বিস্ফোরক মামলাটির বিচার কার্যক্রম চলছে। এ পর্যন্ত এ মামলায় ২৯ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের সিনিয়র আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, বিস্ফোরক মামলা নিয়ে আসামীপক্ষের আইনজীবীদের অভিযোগ করার কোনও অধিকার নেই। হত্যা মামলায় সাজা হওয়ার পর আসামীদের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আসামীদের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। সেই কারণেই বিস্ফোরক মামলার কার্যক্রম কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। হত্যা ও বিস্ফোরক মামলা দু’টোই এ বছরের শেষ নাগাদ শেষ করা যাবে বলে তিনি জানান।

বিদ্রোহের দু’দিনের চিত্র : মামলার অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, ঘটনার সময় পুরো পিলখানায় বিডিআরের সদস্য ছিলেন ছয় হাজার ৯০৩ জন। দরবার হলে ৯৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ বিডিআরের দু’ হাজার ৪৮৩ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। বিদ্রোহের সময় দু’ হাজার ৪১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র থেকে বিদ্রোহীরা গুলী করেছিল। এর মধ্যে এক হাজার ৮৪৫টি রাইফেল, ৫২৮টি সাব মেশিন গান, ২৩টি পিস্তল ও ১৮টি এলএমজি ছিল। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের হাতে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন।

কর্মসূচি : বেদনাবিধুর এ দিবসটি পালনে পিলখানায় নিহতদের জন্য দোয়া, মিলাদ মাহফিল, কবরে ফুল দেয়ার মতো কর্মসূচি নেয়া হয়েছে বিজিবির পক্ষ থেকে। বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনও নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহম্মদ মোহসিন রেজা জানান, আজ সকাল ৯টার সময় বনানী সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, (সম্মিলিতভাবে) এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও বিজিবি মহাপরিচালক (একত্রে) শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।

এছাড়া কাল ২৬ ফেব্রুয়ারি বাদ আসর পিলখানায় বীর উত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে শহীদ ব্যক্তিবর্গের মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল হবে। এতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, বিজিবি মহাপরিচালক ও শহীদ ব্যক্তিবর্গের নিকটাত্মীয়গণ, পিলখানায় কর্মরত সকল অফিসার, জেসিও, অন্যান্য পদবীর সৈনিক এবং বেসামরিক কর্মচারীগণ উপস্থিত থাকবেন।

Related posts