November 15, 2018

আগাম নির্বাচনের প্রশ্নই আসে না – হাসিনা

ঢাকাঃ দলীয় সংসদ সদস্যদের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দিয়েছেন। গত মঙ্গলবার বিকালে জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠকে এ নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা কি দেশে দ্রুত সময়ের মধ্যে আগাম বা মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইঙ্গিত বহন করে? মঙ্গলবারের পর থেকেই সাধারণের মাঝে এমনকি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে চলছে গুঞ্জন-আলোচনা। তবে আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের মেয়াদ আছে ২০১৯ সাল পর্যন্ত। নির্ধারিত মেয়াদের আগে দেশে নির্বাচন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। প্রধানমন্ত্রী আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখেই দলীয় সংসদ সদস্যদের বেশি করে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে দলের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে ওই নির্দেশনা দিয়েছেন।

গত মঙ্গলবার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দলীয় সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিন। আড়াই বছরেরও বেশি চলে গেছে। হাতে আছে মাত্র দুই বছর তিন মাস। ছয় মাস যাবে বলতে বলতেই। সেজন্য আপনারা (এমপি) নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে বর্তমান সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড তুলে ধরুন। শেখ হাসিনা বলেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বিশ্বজুড়েই এখন তা ঘটছে। তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশ তা দমন করতে না পারলেও আমরা পারব। কারণ আমাদের দলীয় লোকজন আছে। আছে শক্তিশালী সংগঠন। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন, নির্বাচনে নিশ্চিত জয় পাওয়া যাবে, এমন একটি সুবিধাজনক সময় খুঁজছে সরকারের নীতিনির্ধারণী উচ্চ পর্যায়। বিষয়টি নিশ্চিত হলে সরকারের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার কিছুটা আগে হলেও একটি আগাম নির্বাচন দেয়া হতে পারে। কারণ প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বাইরে রেখে আরেকটি জাতীয় নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি কারও জন্যই ভালো ফল আনবে না।

তবে আগাম নির্বাচনের জন্য বিএনপিকে অবশ্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ছাড়তে হবে। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী দলীয় সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে সঠিক ইসলাম প্রচার করে জঙ্গিবাদ দমন ও জনসাধারণকে সচেতন করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইসলামকে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব উল্লেখ করে এমপিদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, নিজ নিজ এলাকায় যান। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের কথা জনগণের কাছে তুলে ধরুন। বিগত সরকারগুলোর সঙ্গে বর্তমান সরকারের তফাতটা তুলে ধরুন। একই সঙ্গে প্রকৃত ইসলাম তুলে ধরুন। এ ধরনের কর্মকান্ডের মাধ্যমে নির্বাচনের প্রস্তুতিও গ্রহণ করুন। তবে নির্ধারিত মেয়াদ ২০১৯ সালের আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা নেই বলেও জানান হাছান মাহমুদ।

সূত্র জানায়, দেশজুড়ে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস, আন্তর্জাতিক চাপ ও রাজনীতির গুমোট পরিস্থিতির অবসানে কিছুটা আগাম নির্বাচন দিতেও পারে সরকার। শিগগির না হলেও ২০১৯ সালে মেয়াদ পূরণের আগেই নির্বাচন দেয়ার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। এর মধ্যে সুবিধাজনক যেকোনো সময় নির্বাচন দিয়ে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পশ্চিমা আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীকে দেয়া প্রতিশ্রুতির কিছুটা রক্ষার কথা ভাবছে সরকার। নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন হবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য দিলেও আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় মেয়াদ পূর্তির আগেই যেকোনো সময় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে। সরকারের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের চাওয়াও এ রকমই। আওয়ামী লীগ ও সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা-মন্ত্রী নাম না প্রকাশের শর্তে এমনটা জানিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্পাদকম-লীর একজন সদস্য বলেন, আগাম নির্বাচনের জন্য কিছু আন্তর্জাতিক চাপ সরকারের ওপর রয়েছে।

কারণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ বিষয়ে একটি কমিটমেন্ট করা হয়েছিল। তবে সে নির্বাচন কখন হবে তা এখনও নির্দিষ্ট হয়নি। তিনি বলেন, প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সরকারকে একটি আগাম নির্বাচনের দিকে যেতে হতে পারে। সেটি মেয়াদ পূরণের ছয় মাস আগে হলেও। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতাই আগাম নির্বাচনের বিরুদ্ধে। কিন্তু একটি গুমোট পরিস্থিতি দূর করে ইতিবাচক রাজনীতির প্রয়োজনে গণতন্ত্রের স্বার্থে সরকার আগাম নির্বাচনের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। দলীয় সূত্রগুলো জানায়, সম্প্রতি দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া বিএনপি তাদের রাজনৈতিক দুর্দশা কাটিয়ে উঠতে মিত্র দুই-তিনটি দেশকে বড় ধরনের চাপ দিয়েছে। ফলে ওই দেশগুলো আগাম নির্বাচনের বিষয়ে বেশ কিছুদিন চুপ থাকলেও এখন আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন লবি রক্ষা করে চলেন, আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ এমন নেতাদের ওপর ওই দেশগুলো নানাভাবে চাপ তৈরি করছে।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর কয়েকজন নেতা জানান, আগাম নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জামায়াতকে রাজনীতি থেকে একঘরে করে ফেলা হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এখন চায় জামায়াতকে ছেড়ে বিএনপি জাতীয় সংসদে ভূমিকা রাখুক। বিএনপির বেশির ভাগ নেতাই জামায়াতকে ছাড়ার পক্ষে। বিএনপি জামায়াতকে ত্যাগ করার পরই নির্বাচনের ঘোষণা আসতে পারে। দলীয় সূত্রগুলো জানায়, আগামী নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই দল গোছাচ্ছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি সম্প্রতি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ও এর অধীন থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটি ঘোষণা করেছেন। কমিটিতে পদ দেয়ার ক্ষেত্রে ভোটের রাজনীতিতে প্রভাব রাখবেন এমন নেতাদের মূল্যায়ন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের আগামী কেন্দ্রীয় কাউন্সিলেও নেতৃত্ব নির্বাচনে জনপ্রিয়তা আছে এবং ভালো সংগঠক এমন নেতাদের গুরুত্ব দেয়া হবে। নানা কারণে বিতর্কিত হয়েছেন, এমন অনেক নেতাই কমিটি থেকে বাদ পড়বেন।

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করা হয়, নিয়ম রক্ষার ওই নির্বাচনের এক বছর পরে আরেকটি নির্বাচন দেয়া হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সে অবস্থান থেকে সরে যায় সরকার।

বিএনপি-জামায়াতের সরকার পতনের কর্মসূচি সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারা এবং প্রতিবেশী ভারতের জোরালো সমর্থন নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ সামলে উঠতে পারায় আর নির্বাচনমুখী হয়নি সরকার। আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ জানান, সরকার আগাম নির্বাচনের বিষয়ে ভাবছে না। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আগাম নির্বাচনের বিষয়ে আমাদের ওপর কোনো চাপ নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন আমাদের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী কর্মকান্ডে সন্তুষ্ট। এ ছাড়া বিশ্বমন্দার মধ্যেও আমাদের অর্থনৈতিক অর্জনকে তারা স্বীকৃতি দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা নেই।ইনকিলাব

Related posts